পরাণ ভাই । PART- 10 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART-10

 

———————–ঃ নাসের কামাল

শ্রদ্ধেয় বড় বোন মিম খাঁনের বিশেষ একটি দিনের আলাপচারিতায় বুঝলাম আমার স্বরচিত –
” পরাণ ভাই ” গল্পটি পাঠক মনের অন্তরালে ব্যাপক একটি শুণ‍্যতায় প্রশ্ন বিদ্ধ হয়ে আছে । যা প্রায়ই অনেকের ফেসবুক বার্তায় নানা মন্তব্য পেয়েছি এবং তাঁর সন্তষ্টমূলক উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছি । প্রিয় ফেসবুক বন্ধুদের অনুপ্রেরণায় গল্পটি আবারও লিখতে শুরু করি
নতুন করে । আপনাদের সকলের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ , সকলেই ভালো থাকবেন ।
গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

এক ঝাক গিরিবাজ

পায়রাতে মাথার উপর বিকেলের আকাশটাকে জবদো করে রাখলো । উড়ে উড়ে ঘুরপাক খেলো দূরপ্রান্ত ঘুরে । ওদের মধ্যে তিনটে গিরিবাজ হঠাত্‍ হঠাত্‍‍ ডিগবাজি খেলে উঠলো । অসংখ্য চড়ই দল বেঁধে উড়ছিলো আকাশে । বাউরি বাতাসের মত বৃত্তাকারে ঘুরতে আছিলো মাথার উপর অনবরত তারা । অবশ্রান্ত মনটা সঞ্জীবনী হয়ে উঠলো হঠাত্‍ । বিকেলের অনিন্দ্য আকাশটাকে দেখে যেই কারণে খুব ভালো লাগলো । মুক্ত স্বাধীন মনে হলো , সব মিলে মুগ্ধ হয়ে গেলাম ।
তহশীল চত্বরে বসে আছি পরাণ ভাইয়ের মূল মিটিংয়ের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক ভোলাহাট , নাচোল ও গোমস্তাপুর থানার উল্লেখ যোগ্য আহ্বানকৃত কর্মীদের নিয়ে । নতুনত্বের চমক আজকের কর্মী মিটিং খুব উজ্জল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ মনে হলো দেখে । বেশ কিছু কঁচি উড়তি নবীন মুখ দেখে খুবই অবাক হলাম । আগামীতে এরাই মূলত সর্বক্ষেত্রে সর্বময় নেতৃত্বের নতুন রুপ নিয়ে উঠবে । পরাণ ভাইয়ের এমন উপযুক্ত সিদ্ধান্তকে অসংখ্যবার সাধুবাদ জানায় ।
ঘুরে ঘুরে চোখ চালিয়ে দেখছিলাম সবার উপস্থিতি । প্রত্যেকেই এসেছে শুধুমাত্র তমাল আর সবুজ বাদে । সবুজের আম্মা অসুখে পরে ভীষণ ভুগছে । সবুজ ডাক্তার নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত । ও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত মতে আমি প্রস্তুত আছি । তমাল শ‍্যমলের চায়ের স্টলে আড্ডা দিচ্ছে নিশ্চয় । ওর যা কাজ পরাণ ভাইয়ের সপক্ষে বিবৃতি দেয়া । সবাই অপেক্ষা করছি পরাণ ভাইয়ের জন্য । অধীর আগ্রহে অপেক্ষার সময় যাপিত করছি নিজেদের মধ্যে গল্প করে । পরাণ ভাই ঠিক ফরিদ এ্যাডভকেটের কথা মত মুক্তি পেয়ে ছুটে এসেছে । তাই বিশেষ করে আজকের মিটিং সবার কাছে বড় বেশী আনন্দের । হঠাত্‍ কেন জানি শান্তনার কথা অনাহূতের মত মনে হলো । মনে পড়ে খারাপ লাগতে লাগলো । পরাণ ভাই যেদিন ছুটে আসে সে দিনই শান্তনাকে নিতে আসার কথা ছিলো কাঞ্চনের । তার কথা মত চূড়ান্ত শেষ দিনটি ছিলো পাকাপাকি সেই দিনটিই । শান্তনার সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলে আবারও চুড়ান্ত করেছিলো কাঞ্চন । সবকিছুই জানি । সবকিছুই ঠিকঠাক ছিলো এর মধ্যে দুই দিন গত হয়ে গেছে সেই অপেক্ষার কাংখিত দিন বা সময় । সেই দিনের প্রহরও ফুরিয়ে গেছে । শান্তনাকে কোনো ভাবে শান্তনা দিয়ে সর্বশান্ত করা যাচ্ছেনা এখন আর । যাইহোক আজকে যে কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে । ফসিল অনুভূতি পুষে শান্তনাকে এভাবে ঝুলিয়ে রেখে বড় অন‍্যায় করছি । অন‍্যায়ের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে সমাজের সামাজিকতা প্রকৃতির নিয়মে ঠিক উন্মোচন হবে । প্রকৃতি তার নিয়মে চলতে অভ‍্যসত্ব বলেই মানুষকে বাধ‍্য করে ফেলে তার সময়ে । শান্তনাকে নিয়ে আজ রাত্রেই বসবো – বলবো বিস্তারিত ভাবে । এবং কি করবো সেটাও চুড়ান্ত করে ফেলবো । আরও বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আরও একটি কারনে পরাণ ভাই ইতিমধ্যে শান্তার ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে যা অবগত হয়েছেন । এবং তাঁর নির্দিষ্ট কিছু যা ধারনা দিয়েছেন তাতে শান্তনার বাবার ভাষ‍্য মতে আগামী কাল সকালে এই হতভাগাকে নিয়ে রুদ্ধ দ্বার বৈঠকে বসছেন পরাণ ভাই এবং কোথায় কখন বসবেন বলেননি আর নিজে থেকেও কিছু বলিনি । ও সব ভাবতেই সঞ্জীবনী মনটা হঠাত্‍ মলিন আবরনে ঢেকে যাচ্ছে । কোনো এক অজানা শক্তির কাছে পরাভূত হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই ।
তোহশীল চত্বরের সবুজ ঘাসে বসে আছি হঠাত্‍ ভোলাহাটের এক বয়স্ক কর্মী বলে উঠলো ,
– পরাণকে ফাঁসালো কারা , সামান‍্য আলামত উদ্ধার হতো – হলে , না জানা অনেক তথ্যই বেরিয়ে আসতো নিশ্চয় । আমরা খুবিই আশাবাদী এর যথার্থ সত‍্য উন্মোচন হবে একদিন । আর দিনের মত পরিস্কার হয়ে যাবে সবার কাছে পরাণের আসল ব‍্যাপারটা সেদিন ।
নাচোলের একজন বলল ,
– আমাদের নাচোলে একটা মুহুর্ত নাই পরাণ ভাই ছাড়া কোনো আলোচনা হচ্ছে কোথাও । টুয়েন্টি ফোর আওয়ার ক্রিকেট খেলার মত পরে আছে ভাইকে নিয়ে । অনেকের ধারনা গারদেই পোঁচতে হবে অন্তত পাঁচ বছর । কেউ ভাবেনি এভাবে ছাড়া পেয়ে ছুটে আসবে । বিভিন্ন মন্তব্য আর গল্পে , অপেক্ষার প্রহর ঘনীভূত হয়ে আসছিলো প্রাচীর ঘিরা সবুজ মাঠটায় । এমন সময় পকেট ও কুচ্চুর প্রবেশ । ওদের আসতে দেখে নতুনদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন শুরু হলো । ওদের না ডাকা শর্তেও এসেছে । ওরা দু’জন একটু অদূরে দাঁড়িয়ে গল্প করতে লাগলো । অগ্রে রাবেয়া গার্লস স্কুলের বড় পাকা রোড । যে পথচারী যাচ্ছে ঘুরে ফিরে চোখ চালিয়ে দেখে নিচ্ছে এদিকে এক পলক । খোলা বড় লহার গেট সার্বক্ষণিক খোলা থাকে । সকল মানুষের আসা যাওয়া লেগে থাকে এখানে । আজ ছুটির দিন – তাছাড়া পরাণ ভাইয়ের মিটিংকে কেন্দ্র করে কেউ ইচ্ছে করেই ভিতরে প্রবেশ করছেনা । মানুষের এমন সমাদর দেখে বেশ ভালো লাগলো ।
মধু চুপচাপ বসে আছে পূর্ব ধারে । রঞ্জু তার সামনে বসে বসে একাই বাদাম খাচ্ছে অভদ্রের মত । বিশেষ করে লক্ষ করলাম সবাই খুব স্বাভাবিক গল্পে মেতে থাকলেও সবার মধ্যে কেমন যেন একটা টান টান ভাব আর একটা উত্তেজনা বিরাজ করছে । নতুনদের মধ্যে থেকে বিরু উঠে এসে নিচু স্বরে বলল ,
– আমরা পথও নাটকের মাধ‍্যমে আরও ব‍্যাপক ছড়িয়ে দিতে পারবো এ ব‍্যাপারটাকে । আংকেল এ বিষয়ে পরাণ আংকেলকে আমরা বললে বেশী ভালো হবে না আপনি বলবেন আমাদের হয়ে ?
– তোমরাই বলবে ।
ফিরে সহ অবস্থানে গিয়ে বসলো বিরু তার দল বলের সঙ্গে । ওর কথা শুনে মনে পরলো নাট‍্যচক্রের মহেন্দ্রক্ষনের কিছু সমাদৃত ব্যক্তিবর্গের জীবন কথা , ভাইস প্রিন্সিপাল আত্তাব উদ্দীন টিপু , শ্রী গেনেশা বাবু ; শ্রী হরি করণ আঁচারী , জয়নাল আবেদীন ; সাইদুর রহমান ভদু , মহম্মদ আলী সরকার , পিন্টু সরকার , সাত্তার মাস্টার , জিল্লুর রহমান । মোঃ নুরু , ইউসুফ ; ইউনুস বিশেষ করে নাটকের কারনে রহণপুরের ভাবমূর্তি গৌরব উজ্জল হয়ে উঠেছিলো সেই দিন অমন সব সশ্রদ্ধেয় গুনি জন ব্যক্তিদের কারণে ।
উনাদের পর নিজেরায় উদ‍্যমি হয়ে শুরু করলাম একদিন জুনিয়র নাট‍্য গোষ্ঠি নাম দিয়ে । দুইবারে চার চারটি নাটক নামিয়ে ফেললাম । মুক্তাশা সিনেমা হলে প্রচুর লোক প্রচুর নাম ডাক আর মানুষের সমাগম । এর সব কিছুর পিছনে সমাদৃত সাইদুর রহমান প্রভাষক , জয়নাল আবেদিন ; শ্রী নিরঞ্জন কুমার প্রসাদ , মুসা সরকার , পিন্টু সরকার এবং ভাইস প্রিন্সীপাল আত্তাব উদ্দীন টিপু এই শ্রদ্ধেয় গুণি কজনের অমূল‍্য অবদান কখনো ভুলবার নয় ।
দীর্ঘদিন রহণপুরে নাটক দেখিনা । পার্শ্ববর্তী আলীনগর ইউনিয়ন শ্রদ্ধেয় জিন্নাউল আওয়াল স‍্যারের রচনায় জানি কিছু তাঁর নিজ উদ‍্যগে সেখানে নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে দুর্ভাগ্যক্রমে দেখা হয়নি । অনেক দিন হলো সবুজ সংঘের উদ‍্যগে সশ্রদ্ধেয় নাট‍্যকার জেম হক এর রচিত ও তাঁর পরিচালনায় অনেক কটি নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে সবুজ সংঘের ব্যানারে এর পর থেকে এখানে নাটকের অনুরাগী প্রান প্রায় হারিয়ে যাবার পথে । তখন রহণপুরের গাছে গাছে অসংখ্য বানর ছোটাছুটি করতো , গাছে গাছে পাখিদের মেলা বসতো ; আকাশে নানা বর্ণের ঘুরি উড়তো । সে সব দিন বিরুরা চাইছে ভেবে ভীষণ ভালো লাগলো ।
এই অফিসের বিগত প্রাচীন ভবনটি ধংস করে ফেলা হয়েছে বেশ কিছু বছর আগে । কেদার বাবুর আহম্মদীয়া ভবন , রায় বাবুর মোহাম্মদ ভবন ; মহন্ত দেবত্ত স্টেট ভবন এই ভবনগুলোর মত যথাযোগ্য সংরক্ষণ হলে এই জামনি বাবুর ভবনটিও আজও সংরক্ষিত থাকতো ।
এই ভবনে দীর্ঘদিন বসবাস করেছে টিপু , ভুট্টা ,লিটুরা ওদের আব্বা সিয়ো অফিসার থাকাকালিন ভবনটির খুব সমাদর ছিলো । ওরা এই ভবনের ছাদ থেকে ঘুড়ি উড়াতো । ঘুড়ি ওড়ানোর দিনগুলো মনে পড়ছে । রাবেয়া গার্লস স্কুলে বর্তমান কর্মরত আনেশ ভাই ও রিটায়ার্ড আর্মি সামির ভাই এ দুজনই বেশ গুড্ডি বাজ নামে সে সময় দারুণ খ‍্যাতি অর্জন করেছিলেন । বেশ নাম ডাক আর তাঁদের পরিচিতি চারদিকে ছড়িয়ে গিছিলো । উনাদের কাছেই এক মাত্র ঘুড়ি কিনে পাওয়া যেতো । লাইন দিয়ে ঘুড়ি ক্রয় করতে হতো অনেক সময় । দূর আকাশে ক্ষুদ্র বিন্দু হয়ে ঘুড়িকে কেমন নিশ্চিহ্ন হারিয়ে যেতে দেখেছি আবার সেই ঘুরিই আকাশের মধ‍্যে থেকে কেমন বেরিয়ে এসে মাটির বুকে নেমে আসে তাও দেখেছি । এরকম দেখে দেখে বুক ভরে আনন্দ উপভোগ করেছি বহুবার এবং এই গার্লস স্কুলটির মধ্যে প্রকান্ড একটি বট গাছ ছিলো মজার বিষয় সেই গাছে অনেকের ঘুড়ি আটকে যেতো । এই বিড়ম্বনা পোহানো দিনগুলো কেউকি কখনো ভুলে ? আকাশে ঘুড়ি কাটাকাটি ঘুড়ি খেলার দিনগুলো আজ আর নেই । এই ভবনের সামনে যেখানে বসে আছি এখানে টিপু ভুট্টা লিটুদের খাসিয়া করা মস্ত বড় বড় মুরগ আর ফার্মের মুরগ মুরগী চড়তো দেখে কতো মজা লাগতো । কতদিন নিজেই নিজের বড় রাগী রাগী মুরগ নিয়ে গিয়ে ওদের মুরগের সঙ্গে লড়িয়েছি । মুরগের যুদ্ধ দেখতে ভারি মজা – সেই দিনগুলো আর নেই ।
হঠাত্‍ কুচ্চুকে দেখলাম বিরুকে হাতের ইসারা করে ডাক দিলো । বিরুরা গুনে পাঁচ জন উঠে গেলো সংঘবদ্ধভাবে । সেখানে ওদের মধ্যে বেশ কথোপকথন হচ্ছে কিন্তু কি হচ্ছে বুঝছিনা । তবে বিরুদের মধ্যে বারবার অসম‍্যতির প্রকাশ পাচ্ছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারছি ।
কুচ্চু পকেটের সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা রহণপুরে দারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে আছে । এখন পর্যন্ত কেউ খুব সহজে মুখ খুলতে চাইছেনা । ঘটনার বিস্তারিত জানতে গিয়ে বিস্মিত হয়েছি বারংবার ।
বর্তমান হ‍্যাকিং পদ্ধতি অবলম্বন করে মনার মদের ডেরায় ওসির পোশাক পড়ে মনার কাছ থেকে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা কুচ্চু পকেট মিলে হাতিয়ে নিয়েছে । মনা এসপিকে রিং লাগিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলেছে ,
স‍্যার কুচ্চুকে ওসি মানতে পরছিনা স‍্যার । ও নাম্বার অন ফটকাবাজ । ও ক্লাস অন পড়েনি স‍্যার । ওর উচ্চতা আপনার বইয়ের চেয়েও কম স‍্যার । কোথাও কোনো একটা ভুল হচ্ছে স্যার ।
অপর প্রান্তের কথা শুনে মনা নির্বিকার বাধ্যতামূলক কুচ্চুকে তোলে দিয়েছে তার গচ্ছিত টাকা । এই ব্যাপারে
এ শহরের অনেকেই মনাকে সহযোগীতা করতে চেয়েছে বরং মনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে গোমস্তাপুর থানায় বারবার অভিযোগ জানিয়েছে এখানে কিছু ব্যাক্তি আমার মাথা খোল করে ফেলবে স‍্যার আমাকে বাঁচান । ওর এই অভিযোগের কারনে রহণপুরের বেশ কিছু চাটুকর সাংবাদিক এখনো পলাতক অবস্থায় আছে । আর মনার সাথে কুচ্চু ও পকেটের সম্পর্ক বর্তমানে এতো গভীর যে আসলে কোনটি সত‍্যি কেউ বুঝে উঠতে পারছেনা । সাংবাদিকদের ব‍্যাপারে মনাকে জিজ্ঞেস করলে সেটাও অস্বীকার করে । সে অত‍্যন্ত দৃঢ়তা নিয়ে বলে , থানায় তার কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই । থানায় তদন্ত নিয়ে দেখা গেছে মনার কথায় সত‍্য আসলে মনাকে ফাঁসানোর প্রচেষ্টা চলছে অনেকেই মনে মনে ধরে নিলো । যার কারনে মনার মদের ব‍্যাবসা আরও সম্প্রসারিত স্থায়ীত্ব ও একাধিক বড় ছোট মদের আখড়ায় রমরমা পাকাপোক্ত ভাবে রুপ নিয়ে বসলো রাতারাতি শহরের বিভিন্ন আনাচে কানাচে । যারা প্রকাশ্যে ওর বিরুদ্ধে রোল করে ছিলো তাদের মধ্যে বড় একটা অংশ ওর পক্ষে রাতের অন্ধকারে চলে গেলো । আর কুচ্চু ও পকেটের সঙ্গে রাতারাতি গভীর সুসম্পর্ক গড়ে উঠলো । ওদের গলায় গলায় ভাব দেখে সবার মাথা গুলিয়ে গেলো ।
হঠাত্‍ দেখি পকেট ও কুচ্চু ওদের সহ এদিকে আসছে । কাছে এসে কুচ্চু বলল ,
– বলতো সিপু ওদের ক্লাবে আমি নিজে থেকে তিনটা সিলিং ফ‍্যান দিতে চাচ্ছি ওরা নিবেনা । আরে বোকা এ দুনিয়ায় কে ডেকে দেয় , আমি দিচ্ছি । কারণ বুঝতো তোমাদের ভালো লাগে – তোমাদের যে কথা বললাম ও‌ই কথা মত ঠিকঠিক গোলা মাঠে চলে আসো আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবো ।
ওর মুখের উপর বলে দিলো বিরু
– না আংকেল মাফ করবেন আমাদের পড়া লিখা আছে ।
কুচ্চু মন্দ হলেও নিজের কাছে খারাপ লাগলো ও নিজে থেকে দিতে চাচ্ছে অথচ এখানে প্রত‍্যাখান করার মত কিছু নেই । আশ্চর্য হয়েই বললাম ,
বিরু তোমাদের সময় মত যাবে নিয়ে আসবে ।
– না আংকেল ।
কুচ্চু বলল ,
– আসবে আসবে আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবো – বলে পকেটকে নিয়ে হণহণ করে চলে গেলো কুচ্চু । ওরা চলে যাবার পর বিরু বলল ,
– জানেন না আংকেল আমাদের s.s.c পরীক্ষা চলাকালীন ওর কথা মত গোলা মাঠে রাত্রি বারটা পর্যন্ত সিলিং ফ‍্যান পাওয়ার আশায় বসে থেকেছি সেদিন ইংরেজী পরীক্ষা ছিলো ফ‍্যান পাইনি বরং বাসায় ফিরে যা পেয়েছিলাম খুব ভালো করে মনে আছে দিনটি আংকেল । অনেকেই বিরুর কথা শুনছিলো ওর কথার শেষে চাপা হাসির রোল প্রতিধ্বনিত হলো অনেকের মধ্যে ।
এমন সময় বয়স্ক চাচা বলে উঠলো ,
– ওরা চলে গেলো ?
সিপু উত্তর দিলো ছোট করে ,
– জি ।
ঠিক সেই মুহূর্তে পরাণ ভাইকে দেখলাম লম্বা লম্বা পায়ে ছুটে হেঁটে এলো । আকাশে হঠাত্‍ কালো কালো মেঘ জমতে দেখলাম । গুরুম গুরুম শব্দ শুনে একটু ঘাবড়েও গেলাম । সকালে প্রচুর মুষুল ধারে বৃষ্টি হয়েছে এখানে । ভেবে নিয়েছি এই বিকেল বেলাটা রক্ষে করলে তবেই হয় ।
পরাণ ভাই এসে প্রথমেই লম্বা করে সালাম দিয়ে হাস‍্যজ্জল মুখে উত্তরের উঁচু ঘাসের উপর বসতে বসতে বলল ,
– আপনারা সবাই ভালোতো , ভালো আছেন সবাই নিশ্চয় ?
সম্মিলিতভাবে মত প্রকাশ করলো প্রত‍্যেকে সশব্দে মুখ ও মাথা নেড়ে ।
– আপনারা এসেছেন খুব খুশী হয়েছি ।
সকালে এমন বৃষ্টি ঢাললো ভাবলাম যে গেলো সব ! ভোলাট নাচোল গোমস্তাপুর থানা থেকে আপনারা কষ্ট করে এসেছেন মিটিংয়ের কার্যক্রম শুরু করে দিব আকাশের অবস্থা দেখে ভালো লাগছেনা খুব ।
বয়স্ক চাচা সম‍্যতি দিলো তাঁর সঙ্গে অনেকেই সমর্থন জানালো । আবারও পরাণ ভাই বলল ,
– আজ নতুনদের মুখ থেকে শুনবো । খুব স্পষ্ট দুটো বিষয় ।
দুটো বিষয় হলো , প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়ন ও মরণপুর সম্পর্কে – বলো তোমরা , তোমাদের নিজের মত করে কি ভাবছো ?
বিরু নামের ছেলেটি প্রথম দাঁড়িয়ে কথা তুলল । বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে বেশ বলল । শেষের দিকে বলল ,
– আমাদের সাপোর্ট দিলে আমরা একটা নাইট স্কুলও চালাতে পারবো আংকেল । আমাদের মাথা হয়ে ছাতা হয়ে আমাদের পাশে শুধু একটু থাকবেন । ওর পাশ থেকে ওদের মধ্যে একজন বলল ,
– এখন গরীব ঘরে অনেক মেধাবীর সংখ্যা । ঠিক মত পড়াতে পারছেননা তখন বাধ‍্য হয়ে অন‍্যের কাজ কামে চলে যাচ্ছে । ইচ্ছে করলে ওদের পড়া লিখার খরচের সব ব্যবস্থা আমরা করে দিতে পারি । আমার মতে একটা উন্নয়ন তহবিল গঠন করলে সব চেয়ে উত্তম হবে । অন‍্যদিক থেকে মাঝ বয়সী একজন বলে উঠলো ,
– ওর কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলছি , অত‍্যন্ত ভালো প্রস্তাব দিয়েছে । আমার কিছু বলার নেই তবে আমরা সংক্ষেপে বললে বেশী ভালো হয় । দেখেন আকাশের আবস্থা ভালো লাগছেনা ।
আরও একজন বলল ,
– এখানে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কয়টি আমার অবশ্য জানা নেই তবে এর মোট পরিসংখ্যান হিসাব রাখতে হবে । এবং স্কুল প্রধান ও কমিটির মোবাইল নম্বর সংগ্রহে রাখতে হবে । যেন যে কোনো প্রয়োজনে আমরা সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষা করতে পারি । বিশেষ করে স্কুল টাইমে ক্লাসের ছাত্ররা অপকর্মে লিপ্ত হলে নিরব না থেকে স্কুল প্রধান , কমিটি ও অভিভাবকদের কাছে অবগত আমরা যেন সঙ্গে সঙ্গে করতে পারি সে ব্যাবস্থাও নিতে হবে ।
এ সব কিছুর মধ্যে অভিভাবকদের অবশ্যই অবশ্যই আমাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করতে হবে । সামাজিক দায়বদ্ধতা আমাদের মধ্যে গড়ে তুলতে পারলে অভিভাবকদেরও সেভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারবো আশাকরি । তাঁরা যতই কর্ম ব্যস্ত থাক আমরা গিয়ে বললে আমাদের কথা কখনো ফেলতে পারবেনা এও জানি ।
এভাবে চলতে থাকলো একের পর এক মতামত । যুক্তি তর্ক পরামর্শ মাঝে মাঝে থেমে থেমে হতে থাকলো । বড়দের মধ‍্য থেকে অনেকেই ভাবগম্ভীরতা রেখে কিছু কিছু অতি মুল‍্যবান কথা উত্থাপন করলো সত‍্যি মুগ্ধ হয়ে গেলাম । বড়দের বিশেষ করে অভিভাবকত্ব বটবৃক্ষ এ জন্যই সর্বময় প্রচলিত । অভিভাবকহীন সমাজের উত্তরণ ভাবাবেগ কখনোই ঠিকনা । ছোটরা বুঝে না বুঝে যা কিছু বলল সব যেন দিগন্ত খোলা হাওয়া মনে হলো শুনে । ওদের মধ্যে যে একজনই বলিষ্ঠতা নিয়ে যা বলে গেলো কখনো ভাবিনি এমন দুর্লভ কিছু বেড়িয়ে আসবে । যুগের কত কি পরিবর্তন ? হয়তো জানাই হতোনা আজকের মিটিংয়ে অংশগ্রহণ না করলে । পরাণ ভাইকে দেখলাম অত‍্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে সবার প্রতি লক্ষ রেখে বক্তব্য শ্রবণ করতে আর অবশেষে কে কি বলে তা শুনার জন্য প্রত‍্যেকেই আগ্রহ নিয়ে লক্ষ করে আছে দেখলাম । মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগছিলো যখন কেউ বলতে লাগছে থামছেনা । একজনই মরণপুর সম্পর্কে বলল , মরণপুর রম‍্য কাহিনীর মত সেই ছোট্টবেলা থেকে শুনে আসছি । পরাণ ভাইকে আমাদের পক্ষ থেকে এ জন্য অভিনন্দন । এমন একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য আমরা ভীষণ আনন্দ পাচ্ছি । আমরা আছি আপনার সঙ্গে যে কোনো সময় যে কোনো অবস্থায় আমাদের ডাক দিলেই পাবেন । তাঁর কথায় অনেকেই সাড়া দিয়ে সমর্থন জানালো স্বতস্ফূর্ত । বিরুদের দল গভীর উত্‍সাহ ভরে সমর্থন জানালো । এমন সময় এক বোদ্ধা বেশ নড়েচড়ে উঠে বলতে লাগলেন ,
– শিক্ষা নিয়ে সত‍্যি দারুণ এক সংকটের মুখে আমরা । গোটা জাতি হুমকির মধ্যে পড়ে আছি । আমার শিক্ষকতার পেশা দীর্ঘ পনেরো বছর বিগত হয়ে গেলো । বর্তমানে এই আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যদিও আমি যুক্ত না যদিও আধুনিক শিক্ষাকে আমি সমর্থন করি তার পরও শিক্ষা নিয়ে কিছু বলতে আমার ভয় ভয় করে ! একদিন আমারই এক ছাত্র আমাকে ধরে বসে প্রশ্ন করে বসলো ,
সৃজনশীল পদ্ধতির বিষয়টি পরিস্কার করে দিলে একটু ধারণা পেতাম স‍্যার ?
আমি প্রথমে হতভম্ব খেয়ে গেছিলাম তার পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছি ,
– সৃজনশীল পদ্ধতি বলতে মূলত মূল পাঠ্য বইয়ের যে বিষয় রয়েছে সেখান থেকে প্রশ্ন না করে তারই মুল ভাবের সম্পর্কের আলোকে জ্ঞানমূলক, অনুধাবন মুলক তথা প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা সহ মূলত ৪ টি ধাপে প্রশ্ন করাকে বোঝায় বলে ভাবতে পার তুমি ।
আমাদের দেশে যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু করবার লক্ষ্যে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছে তোমরা জানো ও তার মতবিরোধ সৃষ্টির কারণেই আজ তুমি আমাকে প্রশ্ন করেছো বুঝেছি
আমি । এও জানো এই সৃজনশীল পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যেও ব্যপক দ্বিমতের সৃষ্টি হয়েছে । ভীতিকর বিষয় হচ্ছে সৃজনশীল পদ্ধতির কারনে তোমাদের মতো শিক্ষার্থীদের গাইড বইয়ের নির্ভরশীলতা দিনদিন বেড়েই চলেছে । ফলে মূল পাঠ্য পুস্তক থেকে তোমরা দূরে সরে যাচ্ছো । এইযে তোমাদের মুখস্থ বিদ্যায় নিরুৎসাহিত করে ফেলছো , গাইড নির্ভরতা কমানো ও কোচিং দৌরাত্ব বন্ধের লক্ষ্যে সৃজনশীল পদ্ধতিকে চালু করবার ব্যাপারে এখনো প্রচেষ্টা পর প্রচেষ্টা অব‍্যাহত আছে , কিন্তু এর কোনটাইতো ঠেকানো আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছেনা । শিক্ষকরা যারা অনেকদিন ধরে একভাবে পড়িয়ে আসছে , আমাদের অনেকেই এই ব্যাবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন পদ্ধতি শিখতে আগ্রহী নই । সে ক্ষেত্রে সৃজনশীল প্রশ্ন প্রনয়নের জন্য সরাসরি গাইড বই থেকে আমরা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছি । আমরা এর চরম বিরোধী । উত্‍কন্ঠার শেষ নেই আমাদের । আমি সেই ছাত্রকে বলেছি বলে নই , আজকেও বলতে চাই আমাদের প্রশ্ন গাইড থেকে সরাসরি প্রশ্ন তুলে দিলে সেটি কিভাবে সৃজনশীল প্রশ্ন হলো ?
সব থেকে বড় সমস্যা যেটি সেটি হলো যে সমস্ত শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন প্রনয়ন করবেন তাদেরই সৃজনশীল সম্পর্কে তেমন কোনো ধারনা নেই । মাধমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তরের মাউশি একাডেমিক সুপেরভিশনের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে মাধ্যমিক পর্যায়ে মাত্র ৫৪ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে পারেন যার মধ্যে ২২ শতাংশ এর অবস্থা খুবই নাজুক । এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মেধার যাচাই তাহলে কি ভাবে হবে বা হচ্ছে আমি ভাবতেই পারছিনা !
সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে , যখন পরীক্ষার খাতা দেখা হচ্ছে তখন শিক্ষকদের বলা হচ্ছে যে সকল শিক্ষার্থী প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার মুল বিষয়টি সম্পূর্ণ লিখতে পারবে তাদেরকে পূর্ণ মার্কস দিতে হবে আবার অন্যদিকে যে প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার বিষয়টি কোনমতে বুঝতে পেরে লিখা শুরু করবে সে সম্পূর্ণ না লিখলেও তাকেও একই মার্কস দিতে হবে । আমার কাছে কেনো জানি সবকিছু পরিস্কার না ,
মেধার যাচাই তাহলে হল কি করে ? সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালুর দীর্ঘ সময় কেটে গেছে । এখন আমাদের ভাববার সময় হয়েছে , সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি কি আদৌ সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাচ্ছে না কি এই শিক্ষা ব্যাবস্থা ভবিষ্যতের জন্য ব্যপক হুমকির মুখে দাঁড়াবে আমাদের সামনে !
এই রকম অবস্থার সৃষ্টি হলে শুধু শিক্ষা ব্যবস্থা না মরণপুর নিয়ে পরাণ তুমি যা ভাবছো সেখানেও এমন একটা সংকটে পরবে যেখানে তোমাকে আমাকে ভালো মন্দ নিয়েই মেনে চলতে হবে ।
গা ছমছম শিহরিত করে উঠলো যেন সকলের মধ্যে । নিরব নির্বিকার হয়ে বোদ্ধা ভদ্রলোকটির দিকে সকলেই চেয়ে থাকলো । ঝমঝম আকাশ কালো অন্ধকার করে মুষলধারে বৃষ্টি নামতে লাগলো । তার পরও কারো কোনো প্রতিক্রিয়া নেই পরাণ সিংহের মত উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো ,
– আজ থেকেই
মানুষ মারার হুকুম দেয়া হলো
তোমাদের –
যে অমানুষ বাস করে তোমার মনের ভিতর তাকে ।
আমার উত্তোলীত উদ্ভাসিত চেতনার অবগ‍্যা করবে ,
নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের কন্ঠ স্বর
রুদ্ধ হবে ;
যার অর্থ নেই অনার্থকে
ধিক্কার দিবে ,
গন্য মানুষ থেকে বঞ্চিত হবে –
বিত্তহীন রিক্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আমিই না শুধু একা বলতে পারি ,
ভয় কি ভয় নেই –
আজ থেকেই মানুষ মারার
হুকুম দেয়া হলো তোমাদের !
যে অমানুষ বাস করে তোমার মনের ভিতর তাকে ।
চারিদিকে আগুন চারদিকে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন , এই বৃষ্টির সমস্ত পানি দিয়ে ধুয়ে দিলেও সে আগুন নিভবেনা । যতোদিন না আমাদের চেতনায় বোধগম্য হবে , যতোদিন না আমরা ঐক‍্যবদ্ধ হবো ; যতোদিন না আমারা বলিয়ান হবো , যতোদিন না স্বজাতি মিলে এইভাবে একত্রে ভিজবো ।
আপনারা সকলকেই আমার শ্রেনী মত সালাম নিবেন । তিন থানা থেকে আমার আহ্বানে অনেকেই সারা দিয়েছেন আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞ আরও কৃতজ্ঞ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে দেশের জন্য জাতির জন্য আজ আপনারা এই মিটিংয়ের পরিপূর্ণতা দিলেন । আজ শিক্ষা ও মরণপুর সম্পর্কে আপনারা যা কিছু বলেগেলেন সবকিছুই আগামী দিনের জন্য দেশ ও জাতির জন্য একটা গতিপথ ও দিক নির্দেশনামূলক সবার কাছে চির স্বরণীয় হয়ে থাকবে । এই দিন বদলের দিনে । প্রযুক্তির উন্নয়নে বিশ্বটাকে একেবারে বদলে দিয়েছেন আপনারা । হাতের মুঠোয় এখন পৃথিবীটাকে নিয়ে শিশুর মতো
খেলছেন । কিন্তু আর সবার মতো ভাবলে চলবেনা , সময় থাকতে ভালো মন্দর মধ্যে পার্থক্য করে নিতে হবে ।
খুব সত্য কথা । সৃজনশীল প্রশ্ন আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তেমন বুঝেনা । বিশেষ করে পাঠদানে শিক্ষকদের সৃজনশীলতা গড়ে তোলবার জন্যে আমাদের রহণপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ম্যানেজিং কমিটির মাধ‍্যমে একটা প্রয়াস চালাতে হবে এর সঙ্গে ভোলাহাট নাচোলেও তার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করে যেতে হবে সমান তালে । সদর থানাতে প্রভাব ফলতে পারলে আমার বিশ্বাস বাকি দুই থানায় তার প্রভাব পরবে কোনো ভুল নেই । আজ অনেক কিছুই অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে । পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় বক্তব্য আর দীর্ঘায়িত করতে চাইছিনা ।
অনেক কথা ছিলো অনেকের বক্তব্য শোনার ও বলার থেকে বিরত
থাকতে হলো আজ । বিশেষ করে দু’টো বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজকেই নিতে হতো । কিন্তু এমনি এক অবস্থা এই আবস্থায় কিচ্ছু করার নেই আমাদের । শিক্ষা ও মরণপুর সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ‍্য আশা করি আপনাদের আমারা পরবর্তিতে ওয়েব সাইটের মাধ‍্যমে জানিয়ে দিতে পারব এবং আপনাদের মতামতের ভিত্তিতে আমরা পরবর্তি সিদ্ধান্ত নিবো । শুধু মনে রাখবেন মরণপুর ও শিক্ষানীতির উপর আমরা যারা আজ আমাদের চিন্তাশক্তির প্রভাব বিস্তার করতে যাচ্ছি তার জন্যে আগামীতে এক কঠিন আঘাতের সম্মুখীন হতে হবে ।
এমন সময় প্রচন্ড জোরে জোরে বিজলী চমকাতে লাগলো আর বড় বড় এতো ঘন বৃষ্টির ফোটা নির্মিত হয়ে আছড়ে পড়তে লাগলো চারপাশে তখন কেউ আর কারো মুখ দর্শন করতে পারছিলামনা । দুনিয়া অন্ধকার করে আকাশ ভেঙে মনে হচ্ছিলো এ বৃষ্টি না এ যেন আঁধারের গহীন অচীন কোনো কালো ধংস রাত । ধংসের পূর্ব রাতের পূর্বাভাস ! আদিগন্ত থেকে ভেসে আসা ভৌতিক কালচে রঙে লেপে দেবার মতো জনশুণ‍্য এলাকায় রূপান্তরিত হতে দেখলাম । থৈ থৈ চারদিকে পানি আর পানি । পরাণ ভাই এক পর্যায়ে চিত্‍কার করে বলে উঠল ,
কেউ ভয় পাবেননা । এই অবস্থায় কেউ কোথাও যাবেননা আমরা যারা স্থানীয় আছি আপনাদের নিরাপদে না নেয়া পর্যন্ত আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারবোনা । আপনারা কোনো দিকে কোনোভাবে ভুল বসতো যাবেননা ।
পরাণ ভাইয়ের এই একই কথা স্থানীয়রা শোনার পর তাঁরাও তাঁদের নিজের মতো করে বিবৃতি দিতে থাকলো । এর মধ্যেই সিপু সিপু চিত্‍কার করে করে পরাণ ভাই অনেক কিছুর দায়িত্ব অর্পণ করলো তখন আরও গাঢ় হয়ে বৃষ্টির নিত্য দেখলাম থৈ থৈ করছে । কাউকে চোখে দেখছিনা দেখছি শুধু বৃষ্টি আর ঝড় । ঝড়ের মাতাল দমকা হাওয়ায় ছোট বড় কালো কালো মিছিল , ধ‍‍েঁয়ে ছুটেছুটে আসছে !
রাত্রি সবে মাত্র সাতটা । মিটিং পর্বের সকল দায়িত্ব সমাপ্ত করে এবং কি পরাণ ভাইয়ের নির্দেশক্রমে ভোলাহাট নাচোল এর সকল কর্মীকে নিরাপদ ও নিরাপত্তার অধীন নিশ্চিত করে বাসায় ফিরেছি । শরীরটা ভিজে ছোপছোপ করছে । মাথায় পানি বসে গেলে এক মাসের সর্দি জ্বরে ভুগতে হবে । এসব কিচ্ছু ভাববার সময় নেই এখন । গোপালের হোটেল থেকে আনা খাবারের প‍্যাকেটটা সযত্নে টেবিলের উপর রাখার পর সোজা গিয়ে বাথরুমে ঢুকে ফ্রেস হয়ে নিলাম । শান্তনার মেয়েলী সুগন্ধ বাথরুম থেকে বেড়িয়ে প্রথমেই নাকে লাগলো । ঘর থেকে সে বেড়িয়ে এসেছিলো তানাহলে আশপাশে এতো দ্রুত মিশতোনা তার শরীরের সুগন্ধী । আহা ! ওর জন্য বুকটা খচখচ করে উঠলো । বুকের টিকটিকিটাও বেপরোয়া মত ছিটপিট করতে লাগলো । হৃদপিণ্ড অসম্ভব রকম উঠানামা করতে লাগলো । হঠাত্‍ করেই মনে হলো পরাণ ভাই শান্তনার ব্যাপারে আলোচনা করবে কিন্তু কি কি বিষয়ে ? একটা বিষয় অবশ্য পরিস্কার বুঝে গেছি – ইতি মধ্যে শান্তনার বাবা শান্তনা সম্পর্কে পরাণ ভাইকে বিস্তারিত খুলে বলেছে । পরাণ ভাই এখন আসলে কি চাচ্ছে সেটাই মূল বিষয় ? কাঞ্চনের কথা মনে হলো । কাঞ্চন পরে কোনো ফোন বা ফেসবুকের মাধ‍্যমে যোগাযোগ করলোকিনা এটা এখনই শান্তনার কাছে জানতে হবে । ঠিক সে সময় শান্তনা বেড়িয়ে এলো । এসে বলল ,
– সিপু ভাই আসেন কথা আছে ।
সে অবস্থায় গেলাম । তাঁর রুমে ঢুকতেই অনেকটা অন্তরঙ্গ হয়ে হাতটা চেপে ধরলো শান্তনা । ভীতু মৃদু স্বরে দু একটা শব্দে ভাঙা ভাঙা বলল ,
– এ রুমে , সিপু ভাই ভূত আছে !
– কি বলছো তুমি ?
– পরীদের পাখার মত একটা শব্দ !
– এই দেখো এই সব ভূতটুত বিশ্বাস করিনা ।
– নানা সিপু ভাই । উড়িয়ে দিবার মতো আমি কিছু বলছিনা । আমি স্পষ্ট
শুনেছি ।
– ধ‍্যাত্‍ তোমার মাথা নষ্ট ।
– আপানার বিশ্বাস না হয় ল্যাম্পটার আলো দয়া করে নিভান ।
বিদূত্‍ অনেক্ষণ হলো নেই । ল‍্যাম্পের আলোতে শান্তনা দীর্ঘক্ষণ রুমে যাপিত করে হাঁপিয়ে উঠেছে । তার পরও তাঁর সন্দেহ মিটানোর দৃঢ়তা ভাঙতে ল‍্যাম্পের চুইচের বোতাম টিপে অফ করলাম । ভাবতেই পারিনি আলো নিভার সঙ্গে সঙ্গে সারা ঘর অন্ধকার কালোতে ভরে উঠবে । শান্তনা তখন গায়ে গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জরিয়ে ধরে বসলো । নিস্তব্ধ অন্ধকারে ডুবে সত‍্যি রুমের মধ্যে একটা অচেনা অজানা শব্দ কানে ভেসে ভেসে আসতে লাগলো । এক সময় শান্তনার গায়ের সুগন্ধে সে অচেনা পরীর পাখার শব্দ , মধুর মিষ্টির ঘনিষ্ঠতায় ভালো লাগতে লাগলো । শান্তনা জরিয়ে ধরেছিলো । মাথাটা ঝিমঝিম করছিলো । সর্বাঙ্গে বৈদ্যুতিক স্পন্দনে দুনিয়াটাকে মনে হচ্ছিলো একটা সুখ স্বর্গ রাজ‍্য । বাইরে ঝড় প্রায় থামবার পথে কিন্তু বুকের ঝড় বরং প্রকট প্রচন্ড ধংস লিলাই মত্ত । শরীরের উত্তাপ যেন উত্তাল হয়ে উঠলো । শান্তনা অনিচ্ছায় বারবার চেপে-চেপে ধরছিলো । নিজেকে আত্মরক্ষা করতে তাঁর ছিলোনা লজ্জা , ছিলোনা দ্বিধা ; ছিলোনা সম্রম হারাবার ভয় । ওর শরীরের নরম পরশে শব্দটা থেমে থেমে থেকে থেকে কানে এসে বারি খেয়ে অদৃশ্যে মিলিয়ে যাচ্ছিলো । ভয় ভয় কিছু একটা আভাষও পাচ্ছিলাম । দীর্ঘদিনের ভৌতিক লোকজ সংস্কৃতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো সহসা মাথার মধ্যে । এই প্রথম শান্তনা উপলব্ধি করালো ব্যাপারটা । আজ রুমটাকে কেনো জানি ভূত-ভূত মনে হতে লাগলো নিজের কাছেও ।
ল‍্যাম্পের সুইচ ওয়ান করলাম । শান্তনাকে দেখলাম ভীষণ ঘেমে আছে । মুখোমুখি তাঁর মুখোমন্ডলে ফোটা ফোটা বিন্দু বিন্দু পানির আবরণ লেগে আছে । নিজেকে ঠিকভাবে মুভমেন্ট করতে পারছেনা । অসহায় হয়ে পরেছে আজ সে । তাঁর রাক্ষুসী নেশাগ্রস্থ চোখ দেখে মনে হলোনা আগের সেই রাক্ষসী নেশা ভরা চোখ ? মনে হলো সত‍্যি আতঙ্কে ভীষণভাবে ভয়ে আছে
বেচারা !
শব্দটা এখন আর নেই । স্নায়ু তন্ত্রে বুঝাপড়া করে নিচ্ছিলো পোড়া মনটা । ফিলোসফি কি বলে জানিনা তবে সুন্দর রুপসী নারীর রুপান্তর সে কথায় বলে ,
সুন্দরীদের এমনভাবে বস করতে আসে কখনো কখনো ভৌতিক আবহাওয়া , কখনো কখনো সামাজিক অব‍্যবস্থা ; তখন কারোরই কিছু করার থাকেনা । এই জন্য মেয়ে মানুষকে খুব রুপসী ও সুন্দর হতে নেই । এই সমস্ত বর্ণহীন রুপসীদের অনেক কারণেই উত্‍বাস্থহারা হয়ে সমাজের চোখে ঘৃণ্য ও লাঞ্ছিত হতে হয় । শান্তনাকে দেখে মনে হচ্ছিলো সেই কথাই । ভুল ভুল সবই ভুল , নারী পুরুষ সকলেই সুন্দরের পূজারী । সুন্দর না হলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কখনো বদলাতোনা । সুন্দর সুন্দর আবাসন শহর নগর সেভাবে নির্মিত ও গড়ে
ওঠতোনা , ভালোবাসা , প্রেম ; স্নেহ , আদর ; শ্রদ্ধা , ভক্তি কোনো কিছুতেই কিছুরই সেভাবে আর কারো বুকে জমাট বাঁধতোনা ! মানব কুলে কেউ অসুন্দর নয় প্রত‍্যেকেই তাঁর নিজ নিজ বৈশিষ্ট নিয়ে অপরূপ সুন্দর অনবদ্য । এমনো দেখেছি মনের সৌন্দর্যের কাছে হেরে যেতে রুপের সৌন্দর্যেকে । এমনো দেখেছি রুপ সৌন্দর্যের কারণে সিংহাসন ছেড়ে গেছে কেউ কেউ । তবে এ কথাও সত‍্য মানবের দানবটা প্রকৃত দানবের চেয়েও ভয়ঙ্কর হিংস্র ও আরো নিষ্ঠুর হতে পারে । পেটের ক্ষুধা মিটাতে ভাষা বুঝে কিন্তু দেহের ক্ষুধা মিটাতে বুঝেনা কোনো ভাষা বুঝেনা কোনো নিয়ম নীতিমালা । এই হচ্ছে মানব কুলের একটা অমীমাংসীত অবস্থা । এই অবস্থার গোন্ডি ভেঙে যারা বেড়িয়ে আসতে পারে তাঁরাই প্রকৃত মানুষ ।
মাথাটা খুব ঠাণ্ডা ও খুব স্বাভাবিক করে ফেললাম । প্রচন্ড সাহসের সঙ্গে রহস্য উত্‍ঘাটোনের নেশায় মত্ত হয়ে গেলাম । একটা সাধারণ সূত্রের মধ্যে ফেলে বিষয়টিকে বারবার কর্ণপাত করলাম কর্ণে । মস্তিষ্ক , কর্ণ ; চোখ এক করে ফেললাম । এই সূত্রে অনেকটাই ব‍্যাপারটা পরিস্কার স্পষ্ট মনে হচ্ছিলো ।
আরো নিখুঁত ও সিয়োর হবার জন্য ল‍্যাম্পটি অফ করলাম । শব্দটা ভৌতিক ছিলো , খোলা শাল কাঠের জানালা দিয়ে হুহু করে ঝিরঝির ঝড়ো বাতাস মাঝে মাঝে থেমে থেমে ঢুকছিল । শব্দটা যে সূত্রেই আটকা পড়লো কানে সেই সূত্রেই দ্রুত ল‍্যাম্পটা জালিয়ে ছুটে গেলাম জানালার সামনের টেবিলে । বাতাসের মুখোমুখি খোলা ডাক্তারি প‍্যাডের মসৃণ পাতা ফরফর করে ফুলে ফেঁপে উঠা নামা করে করে পূনরায় সহ অবস্থানে নেমে যাচ্ছে দেখলাম । ঠিক সেই সময়ের মধ্যেই উদ্ভাবন হচ্ছে অদ্ভুত এক পরীর পাখার মৃদু শব্দের মুর্ছোনা বা সেইরকম আবহাওয়া ।
আলো নিভিয়ে জ্বলিয়ে একাধীকবার শান্তনাকে তার প্রমাণ দিলাম । শান্তনার অনুন্নত যুক্তি তর্কের বাঁধ ভেঙে দিয়ে কৃত্রিম শব্দের সূত্রে যখন সবটা তাঁর কানে পৌছে দিলাম যখন তাঁর বিশ্বাসের মিডিল স্টাম ভেঙে গুড়িয়ে দিলাম তখন সে একটা অন্ধকারের স্বর্গে । তখন সে টেবিলের কাছে যেখানে বসে কাঞ্চনের উপর রাগ করে কাঞ্চনকে একটা চিঠি লিখছিলো । ঠিক সেখান থেকেই কাঞ্চনকে লিখার এই শব্দেরা এই শব্দ ধ্বনিতে ডুবে মেতে উঠেছিলো এক অসত‍্যের নির্মিত ভৌতিকতায় । সেই প‍্যাডের উল্টোনো পাতায় কান পেতে শুনছিলো শান্তনা । সেই শব্দটা বারবার পরখ করে নিচ্ছিল সবকিছুই ঠিকঠাক কিনা ! শান্তনার মুখ থেকে এইবার কথা বেড় হলো ,
– তাইতো !
এবার আলো জ্বেলে শান্তনার কাছে গেলাম । শান্তনার চিঠিটা মনোযোগ ও যত্ন সহকারে পড়লাম । পড়ে শান্তনাকে বললাম ,
– কাঞ্চন তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কখনোই করবেনা । তাঁর সম্পর্কে তুমি ভুল ধারনা করে বসে আছো । হুটহাট কি যাতা ভবছো তুমি । আত্মহত্যা যারা করে তুমি জানো তার জীবনের জন্য সেটা তার কতো বড় পরাজয় ! সমাজ পিতা মাতা আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশী সবার কাছেই এই ধিক্কার গঞ্জনা তুমি শুনবেনা বেশ , কিন্তু শুনবে তোমার পিতা মাতা । তাতেকি তুমি লাভবান হবে , কক্ষণোনা , তাতেকি তুমি তোমার দিক থেকে তোমাকে ভালো নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবে ? পারবেনা বরং বেঁচে থাকলেই সেটা সম্ভব । বেঁচে থাকলে তোমার অনেক সুজোগ থাকবে , অনেককিছু প্রমাণ করতে পারবে । যারা আজ তোমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বা নিবে ! ভবিষ্যতে তাঁরাই তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে শান্তনা ।
পৃথিবীতে এইভাবে যারা একটিবার ঘুুরে দাঁড়িয়েছে , যারা জীবন মানে উপলব্ধি করে নিয়েছে ঘাতপ্রতিঘাত চড়াও উত্‍ড়াও এবং লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ‍্য করেই অবিচল এগিয়ে যেতে হবে , তাঁরাই মূলত সফল সার্থক শান্তনা । এইযে তোমার হাতে যে মোবাইল ফোনটি , এটি যারা তুলে দিয়েছেন তোমার আর সকলের হাতে তাঁরা কিন্তু কেউ নিখুঁত নির্দোষ নিরপরাধ নয় ? তাঁরাও দোষ গুনে একদিন তোমার মতোই একজন মানুষ ছিলেন । এমন ছোট ছোট সাকসেস টুকরো টুকরো সফলতা নিয়েই কেউ হয়েছেন রাজনীতিবিদ , কেউ ডাক্তার ; মাস্টার , বিজ্ঞানী ; ইঞ্জিনিয়ার ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি । আহা ! এটা কেনো বুঝোনা তোমাকে বাঁচতে হবে বেঁচে প্রমাণ করতে হবে তুমি নির্দোষ ।
শান্তনার দু’চোখই ভিজে গেছিলো । অবশেষে অনেক অশ্রুর মিলন সংঘটিত হয়ে ঝরঝর করে গড়িয়ে পরতে লাগলো অশ্রুফোটা তাঁর চিবুক বেয়ে । এক সময় বাচ্চা ছেলের মত হুহু করে কেঁদে উঠলো । তাঁর দন্ত ধ্বনির কান্না শুনতে শুনতেই বেজে উঠলো হাতের মোবাইল ফোনটা । অপরিচিত নম্বর । কাঞ্চন অনেক সময় অপরিচিত নম্বর থেকে কল করে থাকে । তাঁর কথা ভেবেই সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করলাম সালাম সম্ভাষণ করে এবং অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো ,
– আমি সিপুর সঙ্গে কথা বলতে চাই ।
আপনি সিপু হলে আমাকে একটু কনফার্ম করবেন অনুগ্রহ করে ।
– জি বলছি , আপনি বলুন ।
– একটা দুঃসংবাদ আছে ।
– বলুন কি বলতে চান ?
– কাঞ্চন হার্ট স্ট্রোকে আজ রাত্রি ৬ টা ৩০ মিনিটে সোহরাওয়ার্দী হাসপতালে মারা গেছে ।
-অসম্ভব মিথ‍্যে বলছেন আপনি । আপনি মিথ‍্যে বলছেন !
– তাঁর মোবাইলের কল লিস্টে আপনার প্রথম নম্বরটি পেয়ে আপনাকেই প্রথম সংবাদে বিষয়টি অবগত করছি । অনুগ্রহ করে উনার বাসায় সংবাদটা জানিয়ে দিবেন আপনি ।
– এক্সকিউজ মি ভাই , তাঁর কল লিস্টে অন‍্যদের নম্বরগুলো আমাকে একটু বলুন ?
– আপনি লাইনে থাকুন । সিরিয়ালে প্রত্যেকের নাম বলছি । আপনার নামের পর যার নাম রয়েছে শান্তনা নামের একটি মেয়ের নাম , পরাণ ভাই উল্লেখ করে একটি নাম আছে তারপর —
সে বলতেই থাকলো আর কিছুই কানে শুনতে পেলামনা । নিজেরও দু’টি চোখ মুহুর্তের মধ্যে ভরে গেলো । স্থবির হয়ে গেলো চারদিক । পৃথিবীকে জনশূণ‍্য মরুভূমি মনে হলো । তখনও শান্তনার চোখে চোখ রাখতে পারিণি । তখনও কাঞ্চনের মৃত্যুবরণের কান্না করা বোবা মলিন সর্বহারা মুখটা দেখাইনি তাঁকে । নিরুত্তর নির্বিকার নির্লিপ্ত কানের মধ্যে কাঞ্চনের দুঃসংবাদের শুধু কড়াঘাত্‍ একা নিভৃতে প্রতিহত করছিলাম !
কক্ষণোনা – এ হতে পারেনা , কাঞ্চন হঠাত্‍ করে এভাবে মরতে পারেনা । মিথ‍্যে সব । সব মিথ‍্যে বলছে । কুচক্র ! কোনো কুচক্রী মহলের কাজ এটা ?
ঠিক সে সময় বাইরের সদর দরজায় অনবরত ডাক ! সিপু সিপু করে পরাণ ভাই ডাকছে । এইভাবেই উচ্ছসিত উচ্চস্বরে ডাকতে অভ‍্যাসত্ব পরাণ ভাই । এবার কলিং বেলটা বেজে উঠলো ।
পরাণ ভাইকে দরজা খুলে নিজের ঘরে বসতে দিলাম ।
– সিপু তোর সাথে আমার অনেক কথা আছে আই বস ।
বসে পরলাম প্রতিউত্তর না করে ।
– কোনো খবর জানিস ?
– না !
নার পর যা মাত্রই এর বেশী না কারণ কোন খবর জানতে চাচ্ছে পরাণ ভাই !
কথা বেরুচ্ছিলোনা খুব স্বাভাবিক হতে ভিতর ভিতর চেস্টা ছিলো প্রচুর ।
– শান্তনাকেতো চিনিস ! ওকে পাওয়া যাচ্ছেনা । ওর আব্বা আম্মাকে জানিসতো পাগল হয়ে যাবার মতো অবস্থা —–
– মিথ‍্যে
– কি বলিস !
– জানি ওর আব্বা আম্মা দুজনেই অমানুষ ।
– কি বলিস ! জেনে না , না জেনে বলছিস পাগলের মতো । নানা কারো সম্পর্কে এভাবে বলতে নেই । শুন তোর কাছে যে জন্যে এলাম । কাঞ্চন তোর সঙ্গে অত‍্যাধিক ক্লোজ তুই চেস্টা করলে শান্তনার সম্পর্কে সবকিছুই উত্‍ঘাটোন করতে পারবি । ওর বাসার সবার ধারণা কাঞ্চনের কাছেই শান্তনা আছে । তুই চেস্টা করে দেখ । দেখ কাঞ্চন হয়তো ঢাকায় ওকে নিয়ে আছে ।
ঠিক সে সময় শান্তনা রুমে প্রবেশ করলো । তাঁর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে মুহুর্তের মধ্যে রুমের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে গেলো । চোখ কপালে করে দাঁড়িয়ে আছি পরাণ ভাই দুজনেরই চোখে চোখ রেখে ঘুরে ফিরে দেখতে
লাগলো । পায়ের নিচে মাটি ছিলোনা । মাথা ঘুরে পড়ে যাবার উপক্রম মনে হলো । শান্তনা রুমে প্রবেশ করে পরাণ ভাইয়ের স্বনির্ভরতায় দাঁড়িয়ে বলে ফেলল ,
– আমি অসহায় । আমাকে রক্ষা করেণ পরাণ ভাই । সবটুক সুসম্পূর্ণ করে বলে শেষ করতে পারিনি । তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে এই মুখের দিকে কটাক্ষে চেয়ে কোনো কার্পণ্য , কোনো প্রকার দিধাবোধ করলোনা কিছু বলতে পরাণ ভাই । কর্কশ কন্ঠে গর্জন করে বলে উঠলো ,
– তুই ২৪ ঘন্টার মধ্যে এর সমাধান করবি আমি না শুনি এর ব্যতিক্রম করেছিস কোনো তুই ।
এর পর আর থামেনি হণহণ করে হরিনের মত রুম ত‍্যাগ করে বেড়িয়ে গেলো । একটিবার ফিরেও দেখলোনা নিরপরাধ নিস্পাপ মুখের দিকে —-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *