পরাণ ভাই । PART- 11 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART-11

 

———————–ঃ নাসের কামাল

 

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

 

না বলতে পারার মধ্যে

 

প্রশান্তি হচ্ছে যে অসত্‍ কর্মে গেলোনা । হ্যাঁ বলার মধ্যে যে আনন্দটা তা হচ্ছে সবার মঙ্গল হবে ভেবে সম্মতিগাপোন কললো । এই রকম জীবনের জন্য সব জীবনকি সুন্দর সুস্থ জীবন হতে পারে ? এরকম জীবনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে সে জীবেনের বলয় ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে অসাধু সামাজ চক্রের
কেউ কেউ ।
একজন তাঁর অর্ধেক জীবনেরও অধিক সময় সকলের সত্‍ কর্মে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে গেছে । তাঁরও ভালো সমর্থিত কাজগুলোর জন্য বর্ণহীন অপরাধ ও অপবাদের কালিমা মাখতে হয়েছে
গায়ে তার জন্যে । সমাজে অবশেষে প্রতিষ্ঠা পেলো কে ? যে আত্মত্যাগী পরউপকারী সে ,না যে অন‍্যায় করে উপকারীর সততাকে দোষী প্রমাণ করতে পারলো ? এমন অসংখ্য জীবনের ঘটনা অমীমাংসীত অবস্থায় সমাজের ভীড়ে হারিয়ে যাচ্ছে । কেউ সেটা বিচার বিশ্লেষন করে দেখেনা । তাছাড়া বিচার বিশ্লেষণের প্রয়োজনও পরেণা । এতো প্রশ্নের ভীড়ে ভাবছিলাম একাএকা রুমে বসে । বুকের ভিতর হালকা প্রশান্তির একটা পাখনা মেলে হাওয়া দিচ্ছিলো একটা গিরিবাজ পায়রা ঢুকে । ভালো লাগছিলো এই ভেবে যে নিজে কতোটুকু অপরাধী সেটা অন্তত নির্ণয় করতে পেরেছি । ভালো লাগছিলো এই ভেবে যে নিজের ভুলের সাথে কাউকে জড়াতে চাইনি । ভালো লাগছিলো বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি এখন পর্যন্ত । যে জন্য শান্তনাকে দোষারোপ করিনি ,
যে জন্য পরাণ ভাইকে ভুল বুঝিনি ; যে জন্য নিজের মানুষটার সঙ্গে এখনো বুঝাপড়া চলছে একটা শান্তি চুক্তির আওতায় কি করে নিয়ে আসা যায় ভিতর ভিতর দ্রুত নিজেকে , কি করে কাঞ্চনের ব‍্যাপারে শান্তনাকে প্রবোধ দেয়া যায় ; কি করে জানানো যায় কাঞ্চনের পরিবারকে ? শান্তনাকে আজকে কোনো কিছু বলা সম্ভব নয় এবং কি পরেও না । এই জানানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবে তাঁর পরিবার ও আর একমাত্র পরাণ ভাই । সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে রিং দিলাম দুঃসংবাদ কারীকে । রিং রিসিভ করেই সেই প্রথম বলল ,
– পরাণ ভাইয়ের সাথে আমার এই মাত্র কথা হলো । শান্তনাকে এ মুহুর্তে কিছু বলবেন না আপনি !
– সে জন্যেই দেয়া রিং আপনাক , ব‍্যাপারটা নিয়ে ভীষণ ভয়েই ছিলাম !
– পারাণ ভায়ের সাথে কথা না বললে ভুলটা হয়ে যেতে পারতো হয়তো । আপনি সেটা তখন নিষেধ করে দিলেই পারতেন । যাক ভাই দানটা শেষে আপনিই মারলেন । ভালো ভালো চালিয়ে যান । নিমন্ত্রণ টিমন্ত্রণ করিয়েন । না এটাও চেপে যাবেন ?
– আপনি কে ভাই , কাঞ্চনের সাথে আগে থেকে চেনা পরিচয় ছিলো নিশ্চয় ?
– সেসব পরে হবে !
এর পর ইচ্ছে করেই লাইনটা মনে হলো সে কেটে দিলো ।
অপ্রাসঙ্গিকতা যাক ভালোই হয়েছে । মনের ভিতর ব্যাস্ততা আছে । ধীরেসুস্থে সবকিছু গুছিয়ে ফেলি এর মধ্যে । শান্তনার বাসার পর্বের ঝামেলা রাত্রের মধ্যেই ইতি টেনে নিই । এই ক্ষেত্রে শান্তনাকে একটা টু কিছু আর বলছিনা । মেয়েটা ঘাগু ভেজা বেড়ালও আছে । পাড়ার মেয়ে বলে কথা ! তবে সব আগে কাঞ্চনের বাসায় গিয়ে সংবাদটা আগে জানাই তারপর অন‍্যকিছু ।
এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো । পরাণ ভাইয়ের কল নির্ভাবনায় ধরলাম ,
– সিপু । কাঞ্চনের খবর পেয়ে আর কিছু ভালো লাগছেনা । তোর কাছে শান্তনাকে কাঞ্চন আমানত রেখেছে শুনে আমার আরো খারাপ লাগছে বুঝছিস ।
তুই কি বলতো ?
– এখন এসব থাক পরাণ ভাই ।
– আরে ধূর থাকবে কেনো ! তুই , ও নিয়ে আর একটুও ভাববিনা এদিকটা আমি টেকাপ করছি । শান্তনা না জানে সেটা বরং তুই দ‍্যাখ ।
– ঠিক আছে । ও শুনলে বিপাকে পরে যাবো সত‍্যি !
– নানা অসম্ভব । তুই ওদিকটা সামলহা আমি দেখছি এদিক । এদিকে খবর দিলে তুই একটু কষ্ট করে শান্তনাদের বাসায় চলে আসবি ।
– কাঞ্চনের ব্যাপারে বের হচ্ছিলাম ভাই । ওর বাসায় খবরটা দিই ।
– আমি দিয়েছি । তবু তুই যা । তুই যা আমি আসছি ।
আর হয়নি কথা অল্পতেই উত্‍কর্ষতায় ভরিয়ে তুলে পরাণ ভাই । বুক ভরে যায় শুনে একটুতে । অনেক সময় দুঃসময়ের অনেক দুঃখ কষ্ট দায়িত্ব বুঝে হাঁটতে চাই । বুক পেতে দেয় বুকে । তাই হলো আজ । কান্নার সম্মানটুকু মনে মনে ছিলো বলে হাসি ভরা মুখ নিয়ে বারবার ফিরছি মনে । কেউ পারিনি পলাতক রৌদ্রের মতো তাড়তে অন্তত মনের ভূতটাকে ! তবে যা আজ সহ‍্য করতে পারবোনা তাই হলো । কাঞ্চনের জন্য মিথ‍্যের আশ্রয় নিয়ে যে প্রবোধ দিয়ে নিষ্ঠুর অভিনয় করতে
বাধ্য হচ্ছি ভাবতেই এমন সময় রুমে ঢুকে পড়লো শান্তনা । ঢুকেই বলে ,
– সিপু ভাই ।
– কেনো এলে ?
– ক্ষমার জন্যে !
– ক্ষমার যোগ্য কি তুমি ?
– না !
– তবে ?
– কোন সম্মানটুকুর জন্য কেনো আজ আমি অসহায় সেটাও কি বুঝবেননা ?
– না । এই তুমি বুঝলে কখনো ঘর ছাড়তেনা । এসব নাটক নভেলে হয় শান্তনা । এ সমাজ তোমাকে আর স্বীকৃতি দিবেনা । তুমি এই সমাজে দাঁড়িয়ে তুলতে পারবেনা সেই আগের তোমার মাথা ।
– আমাকে আপনিও তাই বলবেন ?
– সমাজ থেকে বের করে দিতে পারলে বলো , পারবো ।
– আপনিও সমাজের থাকলেন কৈ সিপু ভাই ?
– তর্কে জড়িয়ে ফেলছো নিজেকে । এই তর্ক করে কারো মুখ বন্ধ করতে পারবেনা তুমি ।
– পারবো ।
– সেটা কিভাবে সম্ভব বল ?
– এক বাসায় এক সাথে রাত কাটালে মেয়ে মানুষের কি থাকে সিপু ভাই ।
আমিতো আপনার সাথে রাত কাটালাম দিনের পর দিন । এর পর আমাকে স্বীকৃতি দিতে আপনার কেনো শংসয় । সমাজ থেকে আমি বেরিয়ে আসলে সেই অপরাধে আপনাকেও বেরিয়ে
যেতে হবে ।
– তুমি বাধ‍্য করলে হবে ।
– না বাধ‍্য করলেও হবে । সমাজের বিচার শালিস না দেখলেও বুঝি আপনাকেও এক দন্ডে দন্ডিত করবে এই সমাজ ।
– কাঞ্চনের প্রতি তোমার শ্রদ্ধাবোধ কমেছে দেখে ভীষণ খারাপ লাগছে শান্তনা ! ওকে তুমি হয়ে ভুল বুঝছো ?
এখানেই থমকে গেলাম । মিথ‍্যে অভিনয়ের তরবারী চলছেনা আর খুব বেশী । ওর সাথে পেড়ে উঠতে পারছিনা । ক্লান্ত ভীষণ হাঁপিয়ে উঠেছি আজ ।
– না কক্ষণোনা ওর জন্যে ঘর ছেড়েছি
ওকে ভাবতে ঘৃণা হয় ! ছিঃ ওর নাম মুখে তুলবেন না । যার মুখ দিয়ে মিথ‍্যে বের হয় । যে তার ভালোবাসার নিরিহ নিস্পাপ কুমারীকে তুলে দেয় একজন বন্ধুর হাতে । সেকি মানুষ , সেকি সুস্থ সজ্ঞানের সুন্দর মনের অধিকারী ? কাঞ্চনকে মনে জ্ঞানে ভীষণ ঘৃণা করি । ওকে কখনো ক্ষমা করতে পারবোনা । ওর জন্য কারো কোনো সুপারিশ শুনবোনা । যথেষ্ট ধৈর্য্য সহ‍্য করেছি । কাঞ্চনকে এ মুহুর্তে পেলে ওর কাপালে কি ছিলো আমি জানি ।
– শান্তনা তুমি ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছো । তোমার সমাধানের জন্যই হয়তো তোমাদের বাড়ী যেতে হতে পারে ভাবছিলাম ।
শান্তনা পাগল বিকারগ্রস্তর মতো ঝাঁপিয়ে পরলো শরীরের উপর । শার্টের কলার ধরে ছিঁড়ে ফেলল এক টানে শার্টের কয়েকটি বোতাম ঝরে পরলো ।
– কেনো আপনি ভালো হতে চান , কেনো আপনি সমাজ ভাবেন । কেনো বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতাকে এতো প্রশ্রয় দিচ্ছেন ; আমাকে সতি পবিত্র রাখতে চান কেনো ? বিশ্বাস করবেনা সমাজ , বিশ্বাস করবেনা কেউ । কেউ করবেনা ।
এরপর রুম থেকে বেরিয়ে গেলো শান্তনা । ওর বেরিয়ে যাবার দিকে একটি বারও লক্ষ হলোনা শুধু ফিরে ফিরে মনে হতে লাগলো শান্তনার শেয কটা কথা ।
লাঙলের ফলার মতো বুকের ভিতরে আজ গেঁথে দিলো এক মুহূর্তে । বিষিয়ে উঠলো ভিতরের ভিতর অন্তর । এতো যন্ত্রনা হচ্ছিলো ভিতরে , শান্তনার নখের খামচে বুকের রক্ত ঝরে পড়ছিল চুইয়ে সেদিকে একটুও হুঁশ ছিলোনা ।
হঠাত্‍ কলিংবেল বেঁজে উঠলো । গিয়ে দেখি অনুমান সম্পূর্ণ ভুল । রনজুকে মাথাতে নেইনি অথচ সেই দাঁড়িয়ে আছে মাথা পাগলার মতো । রনজু গো ধরে বলল ,
– চল চল ।
– কোথায় !
– চৌধুরী বংশের বিয়েতে ।
– চৌধুরী বংশ !
– এই দেখ আমার সঙ্গে ইয়ারকি মারিসনা ।
– আহ ! এখন রাখতো রনজু । আসল ব্যাপারটা কি সরাসরি বল ।
– যে বাড়িতে কাঞ্চনের কাল সকালে লাশ উঠবে । সে বাড়িতেই তো তাঁর চাচাতো বোনের বিবাহ অনুষ্ঠান চলছে , খুব ধুমধাম হচ্ছে ; কালকেই বিয়েটা । বর পক্ষ কালকেই আসছে । কতো ধুমধাম হবে ! তাই বলছিলাম –
নিরুত্তর বাইরে দরজা লাগিয়ে বেড়িয়ে পরলাম । শান্তনার জন্য বিপদজনক এরিয়া । ওর সঙ্গে থাকলে এখানে সমস্যা আছে । ইনিয়ে বিনিয়ে বলছিলো তারপরও বিতর্কে না জড়িয়ে রনজুকে বুঝতে না দিয়ে ওকে নিয়ে
সরে পরলাম ।
শহরটা ভূতেরের মতো সঙ্গে সঙ্গে
ছিলো । পাশাপাশি হেঁটে চলছি রনজুকে নিয়ে । তার পরও মনে হচ্ছিল রাস্তার অন্ধকার ঢাকছিলো আশপাশের বাড়ী ঘর । ঘুটঘুটে গ্রাম্যতার মাথা ছুঁয়ে হঠাত্‍ হঠাত্‍ নামছিলো উত্‍কর্ষ সাপুড়ে বেদের মতো কালো কালো গাল ফুলা মুর্তির ছাপ ! এই শহরের চতুর প্রান্ত ঘিরে গ্রাম‍্যের যে সবুজ ছায়া বিছানো । তার পশ্চাৎ বর্বরতায় এই কালোর সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে আছে । এক সময় লাঠিয়ালদের মহড়া চলতো শহরে । শহরে ঢুকে সহিংস তান্ডব চলাতো । নিরিহ মানুষ তাঁদের জানমাল নিয়ে নিরাপত্তা হীনতায় ভুগতো । সেই আতঙ্কে থাকার মানুষগুলো এখন অনেকটাই অভ‍্যাস্ত । এখানকার কৃষ্টিকালচার ধর্মকর্ম শিক্ষা সংস্কৃতি এই লাঠিয়ালদের কাছে জিম্মি থাকতে বাধ‍্য করে দেয় কোনো কোনো প্রভাবশালী মহলের দাপটে এখনো এখানে । তারপরও কোনোকিছুই থেমে নেই । এখনকার সভ‍্যতার বিকাশ ঘটেছে । শিক্ষা সংস্কৃতি শিল্প সবকিছুতেই দ্রুত ক্রমবিকাশের জন্য হতদরিদ্র সাধারণ মানুষগুলোর ছিলো কর্মমুখী প্রাণোচ্ছল ছুটে চলার অফুরাণ উদ‍্যম । ছিলো ভিতর মুখী ভিতর ভিতর অনুরাগের ছোঁয়া ভীষণরকম । যার বিষ্ফোরণে ঘটেছে রেলের উন্নয়ন । রেলের আরও উন্নয়নমুখী কর্মকান্ড হতে চলেছে । ভারত সরকার তাঁর নেক দৃষ্টি তুলে দেখেছেন এদেশের অন্তর্গত রহণপুরের ভৌগোলিক অবস্থার দিকে ও দেখেছে তাঁর দেশের জন্য কতোটা সংগতিপূর্ণ এ রহণপুর । শিক্ষার উন্নয়ন । মানব আত্মার শৈল্পিক বিপ্লব ঘটেছে ব‍্যপকভাবে । বিজ্ঞান দর্শনে মানুষের আগ্রহ ব‍্যপক বৃদ্ধি পেয়েছে । মানুষের চতুর্মাত্রিক কর্মসংস্থান হয়েছে চোখে পড়ার মতো ।
রনজু থামতে বলে দাঁড়িয়ে গেলো রাস্তার চিপায় । প‍্যান্টের চেন খুলে যা অভ‍্যেস , করলো । ভদকার মতো প্রসাবের ঝাঁজ বারুদ খেলে গেলো নাকের ভিতর । লাল কেন্নাটা মনে হলো শার্টের ভিতর দিয়ে দৌড়ালো । ঘিনঘিন করে উঠলো ভিতরটা । একটা লাথ‍্যি খেলেই অভ‍্যেটা চলে যেতো রনজুর । কিন্তু লাথ‍্যি কে দেবে ওকে । মুখের সিগ‍্যারেট ছুঁড়ে ফেলল দূরে চালিয়ে । ছুঁড়ে ফেলে যেই ঘুরে দাঁড়ালো । অমনি অদূরে কে বর্ণহীন গালি দিয়ে খ‍্যাঁকিয়ে উঠলো ,
কোন সালার বেটা সালারে ওর মাকক্কে — দিয়ে এর পর বোন টোন চৌদ্দ গুষ্টি তুলে কিচ্ছু রাখলোনা রনজুর । অন্ধকারে বুঝলাম । তিন জন এসে রনজুকে চ‍্যাংদৌলা করে নিয়ে গেলো !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *