পরাণ ভাই । PART- 12 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART-12

 

———————–ঃ নাসের কামাল

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

রনজুকে মুক্ত করতে ছুটে গেলাম ।

রনজু সম্পর্কে পিছনের দিনগুলোর কোনোকিছুই মনে স্থান পেলোনা । রনজু সম্পর্কে শুধু মনে পড়লো সে একসময় দূর্দান্ত ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করতো । আর মেয়েদের পিছনে লাগবার ইল্লতি বাজে একটা স্বভাবও ছিলো । অনেক কটা মেয়ের জীবনে গিয়ে ফুর্তি মেরে

ফিরেছে । প্রচুর চড়থাপ্পরও খেয়েছে । দুটো বিয়ের পর এখন সে বউ ছাড়াই রিলাক্সে আছে । ওর ভাষায় রিলাক্সেবুল জীবন মানেই বউ ছাড়ো , ছেড়ে বাঁচো ।
ওদের কাছাকাছি যাবার সঙ্গে সঙ্গেই আটক করার মতো মনে হলো । অনেকের হাতে ছোট বড় বাঁশের লাদনা । দেখলাম রনজু বাঁধা আছে একটা ছোট্ট নিম গাছের সঙ্গে । কতো ঘা মেরছে বুঝলামনা তবে মুখ দিয়ে এখনো ফেনা বেরুচ্ছে । রনজুর অ্যাকশন মুহুর্তের ওর একটা ডায়লগ খুব মনে পড়ছে ,
একশবার জুতা মারার পর এক গুন বেটা , এভাবে দশ জুতা লাগিয়ে দেখ কি হয় ! এ ডায়লগ জানতো কুচ্চু সম্ভবত । এ ডায়লগ রনজুর পিছনে আজ মনে হচ্ছে কাজে লাগিয়ে ফেলেছে । রাস্তায় চলতে চলতে রনজু শেষ ডায়লগ দিয়েছিলো , সিপু আমার জীবনের শেষ প্রেমটা চলছে এক হিন্দু বউয়ের সাথে । দোয়া করিস । এই শেষ গেমটা খেলতে পারলেই তোকে একটা সিনেমা দেখাবো বেটা জীবন তাক মনে রাখবি ।
লাদনা বাহেনীর উপদ্রব বেড়ে গেলো হঠাত্‍ । তেড়ে তেড়ে মারার জন্য রনজুকে চেস্টা করছিলো কিন্তু কেনো জানি কুচ্চু কি বুঝলো বারবার থামিয়ে দিতে চাইলো তার ইশারায় । লজ্জা লজ্জা ভাব প্রকাশ করলো । এবং শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগলো ,
– রনজুকে ছাড় । ছেড়ে দে । তোরা ওকে ধরেছিস কেন ?
এবার সকলের পরিবেশ গত অবস্থান বুঝতে পেরে বললাম ,
– কুচ্চু এটা তোমার কোনো সভ‍্যতা না । রনজুর অপরাধ থাকলে বলো ।
– রনজুর সাথে আমার কোনো
শত্রুতা নেই তুমি তো জানো সিপু ?
– তবে এমন আচরণতো তোমার কাছে আশা করিনি কুচ্চু । এতো চড়ম অন‍্যায় ভাই ।
ওদের উঠতি বয়সের একজন বলে
উঠলো ,
– আংকেল ও আমাদের সিগ‍্যারেটের আগুন চালিয়ে মেরেছে । ওকে ভর্তা বানাবো তারপর ছাড়বো ।
– কুচ্চু ভীষণ রেগে চটেমটে উত্তেজিত হয়ে বেশ উচ্চ স্বরে বলে উঠলো ,
– আমি যা বলছি কর । ছাড় ছেড়ে দে ।
হুকুম পেয়ে নিরুত্তর রনজুকে ছাড়ার জন্য ওরা চারজনে এগিয়ে গেলো । কুচ্চুর মোবাইলে এ সময় একটা কল এলো । ধরবার আগে এদিকে উদ্দেশ্য করে
বলল , মন্ত্রীর ফোন এই তোরা
সব চুপ কর ! দিয়ে সালাম সম্ভাষণ করে বলল ,
– লিডার মিটিং সাকশেস । পত্রিকার জন্য সব ব্যাবস্থা ঠিকঠাক । জি-জি লিডার । জি লিডার । জি-জি । ঐ আমাদের নির্বাচিত দুই গ্রাম থেকে লাঠিয়ালদের যে যে দলও নেতা ছিলো তাদের নিয়েই মিটিংটা করছি লিডার । এখনো চলছে লিডার । জি-জি লিডার । জি আচ্ছা । পত্রিকার ব‍্যাপারে মোটেও ভাববেননা । এখানে কুচ্চু আপনার তিন থানা একাই কাভার করবে লিডার । কি বললেন ডিফেন্স ? না লিডার কোনো ডিফেন্স টিফেন্সের কুচ্চু পড়ুয়া করেনা । না লিডার কারো উপর ডিপেন্ডও করতে হবেনা । কুচ্চুকে মনে করবেন আপনার ছোট ভাই লিডার । জি লিডার জি লিডার । ঠিক আছে লিডার । ঠিক আছে । আবারও সালাম সম্ভাষণ করে শেষ করলো কুচ্চু ।
কুচ্চু তেলুক এবং বিনয়ীয় বটে । মোবাইল ফোনটি নামিয়ে বলল ,
– সিপু জীবনে মনে হয় এটাই আমার বড় সাফল্য বুঝছো ? বিশ্বাস করো পত্রিকাটা একবার মাত করতে
পারলেই । আমিই চাঁপাই নবাবগঞ্জ ৪৪ দুই এর এমপি ।
– কি বলছো তুমি !
– দোয়া করো দোয়া করো । একটা বছর যেতে দাও দেখো কি করি ।
– এখন ছাড়ো , ছাড়ো কুচ্চু ;
যেতে দাও ।
– আরে দাঁড়াও । একটা ছোট্ট গেম । জীবনের শেষ গেম সিপু । ও হ‍্যা ! কোথায় যাচ্ছিলে চৌধুরী বাড়ি ?
– তাছাড়া এদিকে কোথায় আর যাবার আছে বলো ।
– এ সমস্ত ব্যাপারে পরাণ ভাইয়ের কানে না দেওয়ায় ভালো । সবিতো নিজ চোখে দেখলে । ছেলে পিলে একটা ভুল বসতো ভুল করে ভুল করে দিয়েছে ।
– নানা । এ নিজেদের জন্যও লজ্জা কুচ্চু । তুমি নিশ্চিত থাকো । বলবোনা ।
– আমার বিশ্বাস আছে তোমার
উপর সিপু । তুমি বরং পরাণ ভাইকে একটু ম‍্যানেজ করে নিও । ঐ মরণপুর না টরণপুর যাবো যাবো বলছো
তোমরা , ঐটা আপাততঃ বন্ধ রাখো । আমি এমপি হয়ে গেলে তারপর নাহয় যেও ভাই ।
– এই কুচ্চু । এটা মনে রেখো । পরাণ ভাই কারো কাছে মাথা বিক্রি করে রাখেনি । তুমি যে ইঙ্গিত দিচ্ছো , পরাণ ভাইয়ের কানে গেলে —
– ছি ! ছি ! আমি , না – আমি , না । মন্ত্রীদের ডায়লগ আমি ছাড়লাম মাত্র । আমি এমপি হয়ে গেলেতো পরাণ ভাইকে আমি মরণপুরে , একটা সিংহাসন করে দিবো । আর মরণপুরের আগে যে মরণ ডাঙ্গা আছে সেখানে বিশালাকারে বানিয়ে দিবো একটা বারামখানা । দোয়া করো । খালি দোয়া করো ।
– কুচ্চু ! তুমিনা ইদানিং উল্টা পাল্টা বকা শুরু করেছো । একটু মাপ যোগাযোগের মধ্যে থাকো বুঝলে ? এতে তোমারই বরং লাভ হবে ।
– শিক্ষার ব্যাপারও তোমারা মাথা ঘামাচ্ছো । যে কোনো স্কুলের গঠনতন্ত্র নিয়ে তোমরা কথা তুলে দিচ্ছো , তোজাম্মেল হোসেন একাডেমির , কিসের অডিট ফডিট নিয়ে তোমরা নাকি শিক্ষা মন্ত্রনালয় যাচ্ছো ? স্থানীয় প্রশাসন টিওনো শিক্ষা অফিস পড়ে থাকলো । একটু দম নিয়ে আবারও বলল কুচ্চু ,
– তোমরা শিক্ষক নিয়গের ব্যাপারেও মাথা ঘামাচ্ছো ? নিয়োগ নাকি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দিতে হবে ? কি সব শুরু করেছো বলোতো ? আরে তোমরাইতো তাহলে সের বোনে গেলে সিপু । স্কুলের দূর্নীতি তোমরাকি বন্ধ করতে পারবে বলো । দুদিনেই হাড্ডি গুড্ডি ভেঙে চুড় করে এক করে দিবে তোমাদের ।
– কুচ্চু । এ প্রসঙ্গে কিছু বলছিনা
তোমাকে । শুধু মনে রেখো এই দিনটির কথা ।
– শেষ পর্যন্ত সামান্য একটা কিন্ডার গার্টেনের পিছনে লাগলে তোমরা । ছিঃ ছিঃ সিপু ! ছিঃ !
– ছিঃ বলছো কেনো ?
– ছিঃ বলছি কেনো জানোনা , বুঝোনা ? ঐ স্কুলে গঠনতন্ত্র নেই কিন্তু আদর্শ আছে । অডিট নেই কিন্তু সুন্দর একটা কমিটি আছে । অথচ তোমরা তার বিরুদ্ধে এমন ভাবে উঠে পড়ে লেগেছো – দেখে এসো – দেখে এসো শৃঙ্খলা কাকে বলে । আমাদের ক্লাব , স্কুল আমাদের দল সবখানেই আমাদের এই একইরকম সব শৃঙ্খলা । কালকেই আসো দেখিয়ে দিবো তোমাকে ।
এমন সময় পশু হাসপাতালের এক বিল্ডিংয়ের চিপার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো প্রায় পঞ্চাশ জনেরও বেশী । ওদের মধ্যে কে একজন মোবাইলের টর্চ লাইট জ্বালিয়ে রেখেছিলো । সে আলোর কাছেই দেখলাম সাজুকে । সাজু গর্দান পরিস্কার করছে তার ছোট্ট রুমালটি দিয়ে । কানের গোড়ালি গুলো ভালো যত্ন করে ওরই আংগুলের ফাঁকে ফাঁকে রুমাল ঢুকিয়ে সযত্নে পরিস্কার করছিলো । দীর্ঘদিনের অভ‍্যেস ছাড়তে পারিনি বেচারা । ততক্ষণে রনজুকে ওরা ছেড়ে দিয়েছে । রনজু ল‍্যাংচে ল‍্যাংচে খুড়িয়ে খুড়িয়ে এলো কাছে । নিরুত্তর দাড়িয়ে গেলো সিনেমা কায়দায় । সাজুর মতো ঘাড় কুঁচকালো রনজুও । দুজনের মধ্যে অসাধারণ কিছু নির্ভুল মিল রয়েছে । আশ্চর্য হ‍য়ে আজকেও দেখতে হলো সেটা । রনজু আবারও ঘাড় কুঁচকালো । কুচ্চু ওর কাছে গিয়ে বিনম্র হয়ে শুধু বলল ,
– যা হয়েছে ভুলে যাস রনজু । আমি জানলে এমন অন‍্যায় আমি হতে দিতামনা । পারলে আমাকে মাফ করে দিস রনজু ।
নিজের চোখ অন্ধকারে ভিজে গেলো । ভেজা চোখ সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেললাম । রনজুর অনুতাপের কারণে চোখ ভিজবে এটা মেনে নিতেও কষ্ট হচ্ছিলো একপ্রকার । আর এক মুহূর্ত
দাঁড়ালামনা । একটা অবুঝ বালকের মতো পশু হাসপাতাল ত‍্যাগ করলাম । বেড়িয়ে যাবার মুহুর্তে বৈদ্যুতিক বাতি চারদিকে ঝলমল করে উঠলো । ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলাম রনজুকে নিয়ে । রনজু তখনও খুড়িয়ে খুড়িয়ে
হাঁটছিলো । ভালো লাগছিলো শুধু এই ভেবে কুচ্চুকে যথাযোগ্য একটা ধমক দিতে পারায় , ভালো লাগছিলো কুচ্চু দীর্ঘদিন পর্দার আড়ালে ছিলো । তার প্রকৃত রুপ এখন ধীরে ধীরে খুলছে । নিশ্চয় কোনো শক্তির গোড়া পেয়েছে । যেখান থেকে সে শক্তির গানগুলোর সুর গুনগুন করতেই থাকবে সে এখন । মনে মনে দেখলাম আকাশ ভেঙে যে কুচকুচে কালো অন্ধকারের আঁধারটা ছিলো সেটা স্বচ্ছ পরিস্কার হতে লেগেছে । মনে হচ্ছে সে আলোর পরই অবরুদ্ধ সত‍্যদের সেখানে দেখতে পাবো । এরি মধ্যে দেখলাম সাজু এসে সাথ ধরে এক সঙ্গে যাবার আহ্বান করে হাঁটতে লাগলো । এ সময় রনজু মুখ খুলল ,
– সাজু যা । তুই আমাদের সাথ ছাড় । এখন যা ।
– চৌধুরী বাড়ী যাচ্ছিস শুনেই ইচ্ছে করলাম তোদের সঙ্গে যাই ।
– না । এক্ষুনি চলে যা ।
– এই ! কেনো , বলবিতো ?
– তুই যেখান থেকে এলি সেখানে ফিরে যা সাজু । কোনো প্রসঙ্গ তুলবিনা ।
– এই ! তোর বারাবারি হচ্ছেনা ?
– না ! আমাদের কাছে ভালো সেজে লাভ কি তোর ? কি আসে যায় তোর ? তুই যা !
– এই আয়োজনে আমার থাকার ইচ্ছে ছিলোনা রনজু । তুই দিয়ে পাঠিয়েছিস বরং তোরই থাকার কথা ছিলো ! কুচ্চুর সঙ্গে কি করেছিস তুই জানিস । কুচ্চু তোর সম্পর্কে সব বলল আমাকে – তুই ভাবছিস আমি কিছু জানিনা ?
সাজুর শেষ কথাতে চুপসে গেলো
রনজু ! নিরুত্তর চলতে লাগলো । অনেকটা পথ অতিক্রান্ত করবার পর দেখলাম । রনজু আবারও মুখ খুললো ,
– পত্রিকা তাহলে বেরুচ্ছে , আর কমিটি ?
– কমিটি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে কুচ্চুই সব ঠিক করলো । প্রেসিডেন্ট করলো লাঠিয়ালদের ধরুনবাজকে । আরেক লাঠিয়াল দলের ধনুকে সম্পাদক করে সব দায়িত্ব বুঝি‍য়ে দিলো । আর সবকিছুই দেখলাম কুচ্চু পরিচালনা করছে নিজ থেকে । মন্ত্রী দায়িত্ব না দিলে কুচ্চর ক্ষমতা ছিলোনা রনজু ।
– সাজু তোর কথা বল , তোর জন্যে কি করলো ওরা ?
– আমাকে ! সাধারণ সদস্য ।
– বাহ্ তাওতো পেয়েছিস ।
– নাহঃ ডিগ্রী পাশ করে জীবনে কি করলাম তাহলে ।
– তোর আমার চরিত্রকি ভালো , ভালো না । লাঠিয়ালদের চরিত্র ভালো সাজু । দলের সভাপতি সেক্রেটারি ওরাই হচ্ছে
ওরাই হবে । এ জন‍্যই ওদেরকে ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান মেম্বার করছে জনগন । তোকে আমাকে না ।
– চরিত্র ! বল আমরা অযোগ্য ।
– ঐই হলো । জনগন নিরুপায় । জনগনের কিচ্ছু করবার নেই রনজু । দুদিকের দুই চোরের মধ্যে এক চোরকে আমাদেরকে বাধ‍্য হয়ে ভোট দিতে
হচ্ছে । সারা দেশ । দেশের সবাই আমরা বাধ‍্য জিম্মি হয়েগেছি ।
নিরুত্তর চলছিলাম শুনছিলাম দুজনেরই ক্ষোভ দুঃখের কথা । ভেবে দেখলাম সাজু ও রনজুর কথা ফেলার মতো না । ওরা অতি মূল্যবান বলছে । ধোঁকাবাজ বাটপারদের নৈতিক গল্প শোনার মজাই ছিলো অন‍্যরকম । চোরের মুখে ধর্মের কাহিনী ! কুচ্চু ক্লাস ওয়ান পড়েনি তার উপরেই এখন দলের বড় বড় ক্ষমতা আসতে লেগেছে । কিছুদিন পর তিন থানায় দলের সর্বময় ক্ষমতা সেই খাটাবে মনে হচ্ছে ।
হাঁটছিলাম আর ওদের গল্প শুমছিলাম ।
অনেক না জানা তথ‍্য পেলাম দুজনের মধ্যে থেকে । রনজুর সঙ্গে ক্ষমতা ও ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে গত দুই দিন থেকে চলছিলো তুমুল অন্তর্দন্দ কুচ্চুর । সে চেয়েছিলো এই কমিটির প্রেসিডেন্ট সেই হবে । কুচ্চু অবশেষে সাব জানিয়ে দিয়েছে , এই দলে থাকতে গেলে মূর্খদের নেত্রীত্ব মেনেই চলতে হবে । যেমন চলছে সবাই । তোকেও স্বীকার করে নিতে হবে সব মুখ বুজে । তুই এখন থাকলে থাক না হয় মানে মানে কেটে পর ।
অসংখ্য না জানা সামাজিক , রাজনৈতিক অন্তর্ধান ঘটনা অকপটে দুজনে যেন আত্মহারা হয়ে বাকবাকম পায়রার মতো বাকমবাকম করতে থাকলো । আর নিরুত্তর শুনে ওদের নিয়ে চলতে থাকলাম পাশাপাশি । অদূরে আলো ঝলমলে চৌধুরীদের সেই দ্বিতল বাড়ী । বক্সে হালকা ভলিউমে গান বাজছিলো মিলনের রাতগুলো এতো ছোট কেনো ? দেখে মনে হলো । এখনো বিয়ের উত্‍সব পুরোদমে চলছে । ছোটদের আতসবাজিতে আকাশ আলোকিত করে উঠছিলো মাঝেমধ্যে । বিয়ে বাড়ির যে নান্দনিক স্বতস্ফূর্ত ব্যস্ততা , পুরোদমে ছিলো দেখলাম সবার মধ্যে সেটা চলছে দেদারসে । বাসার সামনের ফাকা বড় একটা অংশ জুড়ে দেখলাম চেয়ার টেবিল সাজানো । এখানে ওরি পশ্চিমে বাগানবিলাসের নিচে পাঁচজন অল্প বয়সী মেয়ে বসে গল্পে মেতেছিলো । তিনজনকে দেখে কলেজ পড়ুয়া মনে হলো । একজনকে খুব হেসে উঠতে দেখলাম । ওতেই বুঝছি কাঞ্চনের মৃত্যুর খবর ওদের সবার কানে এখনো নেই । খবরটা না পৌছেছে সেই ভালো । এখন এই সমস্ত ব্যাপারগুলো একত্রে ভাবছি তখন মনে হচ্ছে । সঙ্গে এদের এনে ভুলই করলাম হয়তো । বাড়ীর একটু অদূরেই ছিলাম । পরাণ ভাইকে দেখলাম ছুটতে ছুটতে এদিকে এলো । এসেই নিষেধ করলো চল এখান থেকে আমরা সরে পরি । কেনো সরে পরলাম ফিরার পথে খুলে বলল পরাণ ভাই সব । ওরা চাইছেনা কেউ জানুক কাঞ্চন মারা গেছে । কাঞ্চনকে ওদের গ্রামের বাড়ীর রতন পুরে নিয়ে গিয়ে তুলবে । জানাজার নামাজ , কাফন দাফন ওখানেই হবে সব । চৌধুরী বাড়ীতে শুধু মাত্র বিয়ের ধুমধাম আর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়েই এক পক্ষ বলতে অভিভাবকদের কেউ কেউ থাকবে । বাকিরা রতনপুরে কাঞ্চনের দাফন কাফনের বিধি ব্যবস্থায় রত থেকে ঐদিকটা দেখবে ।
আতঙ্কের মধ্যে ওরা যে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন সংগৃহীত বা ধীরস্থীর করেছে , না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবেনা । কতো সাবধানতা কতো সতর্কতার মধ্যে ওরা পড়ে থেকে এই সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে ভাবাই যায়না । পরাণ ভাইয়ের কথা যতোই শুনছি বিস্মিত হয়ে পড়ছি । পরাণ ভাইই এক মাত্র ওদের এই ব‍্যাপরটিকে স্বাভাবিক ও ঠান্ডা পরিবেশে নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা প্রদানে সর্বোপরি নিবেদিত ছিলো । সবকিছু যদিও বলছেননা খোলাখুলি পরাণ ভাই । তবু উপলব্ধি করলাম বিশেষ কিছু শোকাহত দিক । সত‍্যি তাই একদিকে বিয়ের ধুমধাম আতসবাজি আর অন‍্যদিকে শোকাহত মুখের বিবর্ণ মলিনতা । একদিকে পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন জানবে কাঞ্চনের চাচাতো বোন শর্মার বিয়ে । অন‍্যদিকে দূরের গ্রামের রতনপুরের মাটির মানুষগুলো কাঞ্চনের মরা দেহে তুলে দিবে মাটি । বাহ্ ! বিধির দারুণ বিধি নিয়ম লীলাখেলা , প্রকৃতির বিধিমালায় পড়ে মানুষকে কোথায় না টেনে নিয়ে যায় । চৌধুরী পরিবারের এই প্রথম কাঞ্চনের মরা লাশ নিয়ে গিয়ে তুলবে ওদের পুরনো বসতভিটায় । সত‍্যিকার অর্থে চৌধুরী পরিবারের দুই পক্ষের মধ্যেই ছিলো একটা নিরব চাপা দুঃখ , কষ্ট ও যন্ত্রণা ।
মন দিয়ে বিভোর হয়ে শুনছিলাম । পরাণ ভাই মুক্তশা সিনেমা হলের সামনে এসে সাজু ও কাঞ্চনকে ইশারায় ডেকে বেশ সতর্কতার সঙ্গে কাছে নিয়ে দাঁড়িয়ে
বলতে লগলো । দাঁড়িয়ে নিরুত্তর শুধু শুনছিলাম ।
– সাজু তোদের এতোকিছু বলার উদ্দেশ্য হলো । বিষয়গুলি খুবই স্পর্শকাতরে । ওদের বাসায় অনেকেই চাইনা আগামী কাল বিয়েটা হোক , শুনলি তো সব ? কিন্তু বিয়েটা একবার পিছিয়ে গেলে শর্মার ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হচ্ছে । শুভ কাজে এমন বিঘ্নতা যদি শর্মার অমঙ্গল হয়ে যায় পরে । যদি বর পক্ষ বিগড়ে যায় , সবি ভেস্তে যাবে ভাবতে হচ্ছে ওদের দিকটাও । আমার বিশ্বাস তোরা ব্যাপারটা নিয়ে অন‍্যদের মতো মাতামাতি করবিনা । ওরা যা ভালো বুঝবে , করবে । আমরা সমর্থন ও সর্বাত্মক সহযোগীতা দিয়ে যাবো পিছন থেকে মাত্র । আগামীকাল আমরা রতনপুরে সবাই উপস্থিত থেকে ওদের সহযোগীতা করবো তোরা থাকবি । অন্তত কাঞ্চনের মুখের দিকে দেখে থাকবি ——
এই প্রথম পরাণ ভাই কেঁদে ফেলার উপক্রম মনে হলো ।
এই প্রথম দেখলাম খুব কাছ থেকে পরাণ ভাইকে শিশু বাচ্চাদের
মতো কাঞ্চনের নাম ধরে ভারাক্রান্ত হয়ে কন্ঠধ্বনী ধরে উঠলো মনে হলো । বারবার শুধু কাঞ্চন কাঞ্চন করে গেলো । কাঞ্চনের নাম আর এক মুহূর্ত মুখ থেকে সরলোনা । ঐ সময় দিলীপ দার বাঁশের বাঁশির করুণ সুর আশপাশের কোনোখান থেকে বেজে উঠলো । নিজেরই বুকটা হুঁহুঁ করে উঠলো তখন । দিলীপ দার বাঁশির সুর এর আগেও বহুবার শুনেছি । আজ যেন অন‍্য সুর অন‍‍্য সুরের মায়া কান্না । ভিতর বাহির যেন ভেঙে চুড়ে দিলো মুহুর্তে । রনজু সাজুকে দেখলাম পরাণ ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গোপালের হোটেল ছাড়িয়ে মা প্লাজার দিকে এগিয়ে
গেলো । ওদের দিকে দেখে শুধু একটাই কথা মনে হলো । ওদের দুই মন , দুই আত্মা ; দু’টো দেহ – অথচ তার পরও কতো মিল ! চরিত্রের পার্থক্য নেই কোনো কিছুতেই , কোথাও । আশ্চর্য হয়ে যাই !
দুজনের দিকে দেখছিলাম এমন সময় আলতো হাতের স্পর্শে পরাণ ভাই টেনে নিয়ে গেলো হাত ধরে ।
তখন রাত্রি প্রায় ১০ টা । রহণপুরের মধ্যে রেল স্টেশন এলাকার মধ্যে এটি খুব অভিজাত এলাকা । এখানেই যতো নামীদামী শপিং সেন্টার গুলো গড়ে উঠেছে । রহণপুরের আনন্দ বিলাসের প্রাণকেন্দ্র । একটু আনন্দ বিনোদনের জন্য অসংখ্য মানুষ ছুটে আসে এই বিলাসবহুল এলাকায় । এখানে খাঁন মোবাইল সেন্টার থেকে শান্তনার জন্য একটি টার্চ মোবাইল কিনেছিলাম মনে পড়লো । অনেক রংবেরঙের দামী আলোতে ঝলমল করছিলো পুরো এলাকা । এখানে পরাণ ভাই কেনো এলো সে প্রশ্ন করলাম না । স্টার ফুড রেস্টুরেন্টে গিয়ে একটি কেবিনের ভিতরে দুজনে বসে আছি । চিকেন সুপ আর চিকেন ফ্রাই এর অডার দিয়ে পরাণ ভাইকে নিয়ে বসে দুজনই নিরবে অপেক্ষায় আছি । এই অন্তরঙ্গ মুহুর্ত এর আগেও বেশ কয়েকবার হয়েছে । জীবনের চুড়ান্ত কিছু সময়ে আলোচনার কোনো প্রয়োজন হলেই এমন সব অভিনব কায়দায় নিয়ে এনে নিরিবিলি কোথাও সবকিছু মন খোলে উজাড় করবার অভ‍্যেস এমন আছে পরাণ ভাইয়ের । এই স্টার ফুডে আজ এই প্রথম অধিবেশন । অনেক বিষয় নিয়ে মনে হলো পরাণ ভাইয়ের আলোচনা । প্রথমে কোন বিষয়টি উত্থাপন করবেন সেটিই ভাবছিলাম । এমন সময় পাশের কেবিন থেকে চুড়ির মিস্টি শব্দ কানে ভেসে এলো । মিস্টি নরম ভলিউমে গান বাজছিলো ছোট ছোট আশা । মনটা অনেক দুঃখের মধ্যেও যে একটু প্রশান্তি আরাম বোধ করবে এটা উপলব্ধি করলেও কেনো জানি ভালো না লাগার অনুভূতিটাই ভিতরে বেশী জেগে উঠলো । আরেকটি কেবিনের ভিতর থেকে অল্প বয়সের যুগল কন্ঠ শুনতে পেলাম । ওরা ছেলে মেয়ে মিলে বেশ খুনসুটি করছে । এসময় পরাণ ভাই বলে উঠলো ,
– মনে হয় ভুল করলামরে । তোর বাসায় গেলেই পারতাম ।
ঠিক তখনি বেয়াড়া এসে খাবারের আইটেম গুলো একে একে নামিয়ে রাখলো টেবিলে । পরাণ ভাই একটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের অর্ডার দিলো সেই
মুহূর্তে । সুন্দর বাতাসে মিশে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছিলো পারফিউমের মিস্টি মিষ্টি সুঘ্রাণ । আর ঘর ময় গানের মূর্ছোনায় ভরিয়ে রেখেছিলো মন ভুলানো একটা আবহাওয়া । তারপরও মন উড়াল দিলো কোথাও । স্থির হতে পারছিলামনা কোনোভাবে । মনে পড়চ্ছিলো খুব শান্তনার কথা । ওর কথা মনে পড়ে ভীষণ খারাপ লাগছিলো । ওর কাছে আত্মগোপন করে নিজের কাছে নিজেই ফেরারী হয়ে যাচ্ছিলাম । নিজের কাছ থেকে নিজেই বেশী দূরে সরে যাচ্ছিলাম মনে হলো । এমন সময় পাশের কেবিন থেকে ওরা উঠে গেলো । দুজন নব‍্য বিবাহিত দেখে মনে হলো । নতুন কাঁচের চুড়ির আওয়াজ হলো আবারও । সে আওয়াজ থামার পর বেয়াড়া এসে ঠান্ডা কোক দিয়ে গেলো । ঠিক তখন পরাণ ভাই কথা তুলল ,
– সিপু খা শুরু কর ।
– তুমি নাও ।
– নিচ্ছি । নে তুই ।
খাচ্ছিলাম । পরাণ ভাইকেও খেতে দেখলাম । দীর্ঘক্ষণ কারো মুখে টুশব্দ নেই । দীর্ঘক্ষণ পর খুব সাবলীল খেতে খেতে বলল পরাণ ভাই ,
– আজ এমন কিছু করতে হবে সিপু সমাজ যেন তোর উপর কোনো দোষ চাপাতে না পারে । শান্তনার ব্যাপারে বলছিলাম । তুইকি কিছু ভেবেছিস ?
– এখন ওর আব্বা আম্মাকে বলতে হবে উপায়তো দেখছিনা তাছাড়া কোনো ? এছাড়া নিজের কাছে রাখাও রিস্ক । যার জন্য এতো বড় রিস্ক নিলাম সেও এখন নেই । পরাণ ভাই তুমি চিন্তা
করে দেখো ।
– শান্তনার বাড়ির দিকে আমি দেখবো । যদিও এখনো মুখ খুলিনি । আমি বললে আশা করি ওরা আমার কথা ফেলবেনা সিপু ।
– এও খুব জানি পরাণ ভাই । এমন অনেক পরিবার আছে তোমার কথার বাইরে যাবেনা ।
– তবে তোর অসুবিধেটা কোথায় ?
– সেটাইতো চাই । তুমি বলে কাজটা করে দাও পরাণ ভাই । তুমি দিনে কতো জনের কতো সমাধান করছো । এই রাত্রেই করো এবং এক্ষুনি করো –
– তোকে নিয়ে ভীষণ টেনশনে পড়ে গেছিলাম । যাক আর কিছু খাবি অর্ডার দিই ।
– না । পেট পুরেগেছে । ঢুকবেনা ।
– শান্তনার জন্যও নিয়ে নিই ।
এই বলে বেয়াড়াকে একটা পার্সেলের অর্ডার দিলো এবং পরক্ষণেই ডিনারের জন্য বিরানীরও একটা পার্সেল দিয়ে দিতে বলল । দিয়ে কাঞ্চনের ব‍্যাপারে আগামী কালের প্রস্তুতি সম্পর্কে রীতিমতো একটা সুন্দর পরিকল্পনা করে ফেলল । এরি মধ্যে বেয়াড়া ঢুকলো
খুবই অল্প সময়ের মধ্যেই বেয়াড়া দু’টো পার্সেল নিয়ে এসে বলল ,
– স‍্যার রেডি ।
পার্সেলের প‍্যাকেট হাতে ধরে নিলাম । পরাণ ভাই উঠে দাঁড়ালো । সেই সঙ্গে বেজে উঠলো কন্ঠ শিল্পী সেলিম মাহবুবের কন্ঠের একটি গান –
জানিনা কী পেয়েছি ! এই গান শোনার পর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো । ২৫ বছর আগে কাঞ্চনের সবচেয়ে প্রিয় গান ছিলো এই জানিনা কী পেয়েছি । ২৫ বছর আগের স্মৃতিচারণ পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে হুহু করে উঠলো বুকটা । সিঁড়ি বেয়ে নামছিলাম । চোখ দু’টো দেখলাম ভিজে গেছে । গানটা বাজছিলো বাহিরে । এতোক্ষণে বেজে উঠলো বুকের ভিতরে —-
—- জানিনা কী পেয়েছি !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *