পরাণ ভাই । PART- 13 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART-13

 

———————–ঃ নাসের কামাল

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

এ এক গর্ভবতী রাত মনে হলো ।

কতো জীবন গল্পের কাতরানী এ গর্ভে বিলীন হলো । অকাতরে জীবন স্বপ্নের দুঃস্বপ্নে কতো জীবনের দূরত্ব রেখে সমাপ্তি টানলো ? না জানেনা কেউ । এ গর্ভবতী রাত তার স্বাক্ষী ।

ইচ্ছে ছিলো না শান্তনাকে দেখতে যাই ।
ইচ্ছে ছিলো না এখন তার মন ও মানুষিকতার অবস্থা কতোটা স্বাভাবিক জানতে ? কিন্তু বিবেক তা নাড়া দিলো না এমন একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে । যার জন্য যার সব হারিয়েছে । এবংকি পিতা মাতাকেও ছাড়তে হয়েছে অথচ তাঁর পরিচয়টুকু দিতে এখন তাঁরই বেশী আপত্তি । ঘৃণা ছাড়া তাঁর মুখে কিছুই দেখিনা । শান্তনা ঘুমাইনি । এখনো তাঁর রুমে লাইট জ্বলছে । কদিন থেকে তাঁর চোখে ঘুম নেই । কাঞ্চনের সাথে চ‍্যাট করতো । সেটাও আপাততঃ বন্ধ রেখেছে । শান্তনার মুখেই শুনেছি । কাঞ্চন চ‍্যাট করবার আগে অন্তত কল করে দু তিন মিনিট কথা বলতো । সেই ফাঁকে শুনিয়ে দিতো দু চারটা কবিতার লাইন । কাঞ্চনকে মনে পড়তেই খারাপ লেগে উঠলো পোড়া মনটাই । চোখে পানি ধরে কতো , সেটাই ভাবছিলাম । আর পরাণ ভাইয়ের দেয়া রেস্টুরেন্টের খাবারের কথা ভেবে চোখটা যেই মুছেছি এর মধ্যেই শান্তনার প্রবেশ । শান্তনাই প্রথমে বলল ,
– সিপু ভাই দেখেনতো , এদিকে আসেনতো ?
ওর সঙ্গে সঙ্গে গেলাম । দুটো রুমের ফাঁকা মাঝের মেঝেতে কতোগুলো কালো মোটা চুল দেখালো পড়ে আছে ।
চকচকে সাহান । তার উপর প্রাচীন পয়সা বসানো কটি আল্পনার নিপুণ কারুকাজ । ডের ইঞ্চির মতো লম্বা চুল হবে । ছড়ানো ছিটানো বেশ ভালোই পরিমাণ দেখলাম তার আশপাশ জুড়ে । সত‍্যি বলতে চৌমকেও গেলাম । ভৌতিক ব‍্যাপার ! অসম্ভব ? এ রুমে অন‍্য কারো প্রবেশের বুদ্ধি নেই । তাহলে এতো চুল এলো কি করে ? এ প্রশ্ন নিজেও নিজেকে করতে পারি । দারুণ সব ব‍্যাপার ! নিজেকেই আড়াল করে প্রশ্ন তুললাম , এই রহস‍্য উত্‍ঘাটন করলো কোন মুহুর্তে শান্তনা ? সে এই রহস্যের মধ্যে ডুবে তলিয়ে যায়নি বরং সাহসেই মোকাবিলা করেছে বুঝছি ।
ও যখন হাতটা ধরলো । চৌমকে লাফিয়ে উঠলাম ।
– ভয় পেয়েছেন ?
– না ! তুমি ?
– আমি দেখার পর আর লাইট নিভাতে পারিনি । কখন থেকে অপেক্ষা করছি আপনার জন্য ।
– কখন দেখলে ?
– সারে দশটা নাগাদ হবে । বাতরুম থেকে ফিরার সময় দেখেইতো হুশ ছিলোনা কি করবো ।
– তখন পরাণ ভাইকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে ছিলাম । ভাবছি সত‍্যি এই সময়ে তোমার কিছু একটা হলে কিযে হতো
আজ !
– সিপু ভাই ভুত !
– কৈ !
– আমি বলছি এই বাসায় ভুত আছে ।
– তাই বলো । এমন ভাবে বলছো যেন দেখেই বলছো ।
– দেখছি একটু একটু আপনিও ভয় করছেন এখন ?
– সত‍্যি করে বলোতো , ওটাকি তোমারই চুল ?
– আল্লাহ ! কিযে বলছেননা সিপু ভাই !
– হ‍্যা , মনে করে দেখো ? তোমারই মাথার চুল হবে হয়তো । তুমি কেটেছো মনে করো ?
– না সিপু ভাই ।
– মেয়েরা অনেক সময় চুলের আগা ছাটে । ভালো করে মনে করো ।
– আমি কাটলে বলবো না । কেনো মিথ‍্যে বলবো । আর এ চুল দেখেন স্বাভাবিক চুলের চেয়ে মোটা । আমার বোলে না । মেয়েদের কারোই এতো মোটা চুল হয়না ।
চুলগুলোকে হাতে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখছিলাম । একজন তদন্ত সিআইডি অফিসারের চোখ দিয়ে দেখছিলাম । সত‍্যি তাই ? ছেলেদেরও মাথার চুল এতো মোটা হয় না ! ভাবনার অথৈ সাগরে কতোক্ষণ ভেসে বেড়ালাম । কতোক্ষণ আশপাশের দিকে চোখ চালিয়ে বারবার দেখে নিলাম । কোথাও কোনো রহস‍্যের গন্ধ পেলামনা । কাল্পনিক ভুত কখনো পুষিনি অথচ সেই ভুতই ঘাড়ে এসে চাপছে । কল্পনা না করে যে ভুত সৃষ্টি করতে পারে সেই ভুতকি আসলে শান্তনা নিজেই । শান্তনার দিকে ফিরলাম অবশেষে । ওর চোখ । ওর মুখ । ওর সর্বাঙ্গ তন্নতন্ন করে দেখলাম । তছনছ করে দিলাম তাঁর দেহের সমস্ত । খুঁজে যা পেলাম , ওর অঢেল রুপ ! রুপের অন্ত নেই । চুঁইয়ে চুঁইয়ে গলেগলে লেপটে যাচ্ছিলো অফুরাণ সৌন্দর্য চোখের তাঁর মুখের লাবন‍্যে ।
আল্লাহ কাউকে ঢেলে দিলে যা হয় ?
– কি দেখছেন ?
– তোমাকে ।
– আমাকে কেনো ?
– তুমিই ভুত কিনা দেখছিলাম ।
– ও আল্লাহ ! দেখেন সিপু ভাই । রাত্রের মধ্যে এ ঘটনার রহস্য উদ্ধার না হলে আমার সঙ্গেই সার্বক্ষনিক থাকতে হবে আপনাকে ।
– রহস‍্য উদ্ধার হবে ।
– হবে ?
– হ‍্যা হবে ।
– এক্ষুনি বেড় করেণ ।
– এক্ষুণি ?
– হ‍্যা । এক্ষুণি ।
– ভাবতে দাও ।
– ভাবনার কিছু নেই । এই ভুত ।
– কৈ ভুত ?
– এই ভুতটাই আপনি বেড় করেণ ।
– আরে সেটাইতো ভাবছি । ভাবতে দাও ভাবতে দাও । আর এরি মধ্যে তুমি খেয়ে নাওতো । নিয়ে যাও দুটো প‍্যাকেট পরাণ ভাই তোমার জন্য দিয়েছেন ।
– আপনি ভাবেন ।
বলে খাবারের দুটো প‍্যাকেট শান্তনা তাঁর রুমে নিয়ে ঢুকলো । ও ঢুকার সঙ্গে সঙ্গে গা শিহরে উঠলো । ছমছম করে উঠলো ভিতরে । মনে হলো বিড়ালের মতো পা ফেলে দেখে আসি শান্তনাকে রুমে কি করছে ও ? সত‍্যি অদ্ভূত ব‍্যাপার স‍্যাপার । মাথায় ঢুকছেনা এ কি করে
সম্ভব ! সবার নিয়ন্ত্রিত চলাফেরা । বাইরের বিচরণ বলতে নেই । পরাণ ভাই একবার মাত্র এসেছেন সেও বাইরের রুমে । আর কারো প্রশ্নই উঠেনা ভিতরে প্রবেশের । তবে যাক এই ফাঁকে ড্রেস চেঞ্জ করে নিই দেখি কি করা যায় । কিন্তুক একটা কিছুতো আছেই ? ঘুরছিলো মাথার মধ্যে বোঁবোঁ করে । সকালে ড্রেস পড়েছি । শখ করে পড়েছিলাম সু । সুর কথা মনে পড়তেই ড্রেস খুলা বাদ দিয়ে ছুটে গেলাম শান্তনার রুমে । শান্তনা ততক্ষণে তাঁর খাওয়া দাওয়া সবে মাত্র শেষ করে উঠলো । ওকে বলতে যাবো এমন মুহুর্তে বিদ্যুৎ চলে গেলো । চারদিকের নিস্তব্ধতা ঘিরে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করলো নিজেও ভয় পেয়ে বসলাম । এমন সময় শুরু হলো ঘুঁঘঁরের শব্দ । কে জেনো ঘুঁঘঁরের শব্দ তুলে হাঁটছে । স্পষ্ট শুনছি । রুমের কাছাকাছি শব্দটা বাতাসে ভেসে ভেসে আসছে কানে । এরি মধ্যে শান্তনাও ব্যাপারটা টের পেয়ে গেছে । টের পেয়েই কাছে চলে এসেছে । বুকের কাছে । কানের কাছে তাঁর উষ্ণ ঠোঁট ভিড়ে ফিসফিস করে উঠলো শুনলাম ,
– সিপু ভাই । ঘুঁঘঁর পায়ে কে হাঁটছে । শুনছেন ঘুঁঘঁরের শব্দ ?
– তাই মনে হচ্ছে । চুপে যাও ।
– এই শুনেন ।
– চুপ কর । ভালো করে শুনতে দাও ।
– এখন স্পষ্ট ?
– হ‍্যা । তুমি ঠিক আছোতো ?
– ভীষণ ভয় করছে । এইযে এখন ভালো করে শুনেন ।
– হ‍্যা হ‍্যা অবিকল ঘুঁঘঁরের শব্দ ।
– এরপরও সিপু ভাই ?
– কেনো জানি সন্দেহ হচ্ছে শান্তনা ।
– কেনো সন্দেহ ?
– আগের চুলের ব‍্যাপারটা অনেকটাই পরিস্কার তাই ।
– শুনি । বলেন তাহলে ?
– এখনো না । যতোক্ষণনা নিজে সিওর হবো ।
– নিজে সিওর না হয়ে তবে বলছেন কেনো ?
– চুপো ! বিদ্যুৎ আসতে দাও !
শব্দটা ঘনিয়ে উঠলো । ধীরে ধীরে কানে আসছিলো । পায়ে পায়ে হেঁটে চলার ছন্দে ছন্দে তারই বারি খাচ্ছিলো দেয়ালে দেয়ালে । মনে হচ্ছিলো পরীর চলন । পরীর পায়ের মৃদু মিস্টি মিষ্টি শব্দ তুলে হেঁটে না বেড়িয়ে সহাবস্থানে থাকতে চাচ্ছিলো মনে হলো । খুব লক্ষ করলাম ঘুঁঘঁরের শব্দটা । এ শব্দের অনুরূপ ধ্বনি খুব অনুসন্ধান চালালাম মনে মনে কিছুতেই খুঁজে পেলামনা তার কুল কিনারা ।
মানুষ কল্পনা বিলাসী । মানুষ তার কল্পনায় সৃষ্টি করে থাকেন ভুত , পরী ; রাক্ষস , ডাইনি ; জুজু বুড়ি , পেতনী – যা মানুষ নিজের মধ্যে নিজেই গুরুত্ব দিয়ে এক একটি ভুতকে জীবন্ত করে তুলে । সত‍্যি সত‍্যি রুপ দিয়ে বসে এক একটি ভুতের । বাস্তব ক্ষেত্রে যুক্তি তর্কে কারো সঙ্গেই পেরে উঠিনি কোনোদিন । কেউ বলেছে ইটা চালিয়ে মেরেছে আমি নিজে দেখেছি ভুতটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে ঘোড়া দহা আম বাগানের ভিতর । আশেপাশে কেউ ছিলোনা ঐ ভুতটা ছাড়া । তাঁর সঙ্গে হেঁটে চলেছি কোনো একদিন সেখান দিয়ে । সত‍্যি সেদিনও একটা ইটা এসে পড়লো সম্মুখে । সে ভুত ভুত বলে চ‍্যাঁচালো । অথচ ওকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম । বোকা এই আম গাছেই আটকে ছিলো এই ইটাটা । একটু ঝড়ের বাতাসে এখনি পড়লো । সে দেখেছিলো নিজের চোখে সেহেতু সে বুঝবার পর ততক্ষণ নিরব ছিলো । অনেক দিন গড়িয়ে যাবার পর দেখেছি তারপরও ভুতের ভ্রান্তি কাটেনি তাঁর । জীবনে এমন কতো ভুতের গল্প শুনলাম । কতো ভুতের জন্ম দিলাম মনে ? রাত্রে ছায়ার মুর্তি দেখে নিজেও চৌমকে থমকে গেছি কখনো কখনো । পরে কাছে গিয়ে দেখেছি ও ভুতনা একটা বামন গাছ । কারণ তখন ভীষণ কল্পনা করতে ভালোবাসতাম । ভুতভুত মনে আনতে চাইলেই যেন চোখের সামনে ভাসতো এসে । গভীর রাতে যখন ট্রেন থেকে নেমে মুসা সরকারের গরোস্তানের সেই নির্জন ধুধু আঁধারের সামনে দিয়ে পাড়ি জমাতে হতো , নিজের মধ্যেও দেখেছি তার আগে থেকেই বুকটা ধুকপুক ধুকপুক শুরু করে দিয়েছে । যতো ভয় আছে পুঁঠি মাছের মতো খুদবুদ খুদবুদ করতো বুকটাই এবং সে নির্জন পেরিয়েই বুড়ি মার থান কালি মন্দির হয়ে বাধ‍্য মূলক যেতে হতো কখনো কখনো সঙ্গীহীন একা একা । কালি মন্দিরের সম্মুখ পথে বিশাল পাইকড় গাছের উপর সে কি বলবো , ইয়া বড় একটা মস্ত লম্বা তাল গাছ ! সেই তাল গাছের দিকে কোনো দৃষ্টি না রেখে যাওয়া কি মুস্কিল ছিলো সে সময় হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি । কারণ প্রাইমারী জীবনে স্কুল যেতে হতো ওখান দিয়েই । বড় বাজার সহ পুরাতন বাজার ও রেল ষ্টেশনের সমস্ত মানুষকে এই পথ দিয়েই যাওয়া আসা করতে হতো সেই দিনের সেই ব্যবস্থায় । স্কুল যাবার পথে রোজ দেখতাম এই পাইকড় গাছের চারদিক ঘিরে অসংখ্য কাঁচি পয়সা ও টাকা পড়ে থাকতে । গাছটির পাঁচ হাত দূর ঘিরে এক হাত মাটি তুলে উঁচু সমতল করা ছিলো । এক মাত্র শ্রী ভগোবতীয়া বাবুই এসব দেখভাল করতেন তখন । সবাই বলতো ওইসবে লোভ করতে নেইরে । কেউ লোভ করলে রাত্রের মধ্যেই অবধারিত মরবে সে । না হয় জুজু বুড়ী হাওয়া করে তুলে নিয়ে যাবে তাকে । তখনও জানতামনা একবার ওখান থেকে কুচ্চু অনেক কটা কাঁচি পয়সা নিয়ে স্কুলের সামনে সেই গোডাউনের চিপায় বসে জুয়া খেলল আর তার জেতা পয়সা দিয়ে সাবইকে দেখিয়ে দেখিয়ে সেদিন আচার কিনে খেলো । টিফিন টাইমে সে দৃশ্য স্কুল সহপাঠীদের নিয়ে দেখেছিলাম ! দেখেছি তার কিছুই হয়নি । এভাবে সে প্রতিদিন চুরি করে করে পাড় জুয়ারি হয়ে উঠলো কিছুদিনের মধ্যেই । একদিন ভগোবতিয়া বাবুর হাতে ধরা পড়বার পর , কান ধরে উঠবস করেছিলো । এরপর ওর ধারেকাছে আর ঘেঁষেনি কুচ্চু । কাউকে সেই ব্যাপারটা দীর্ঘদিন বলিনি । অনেক পরে বন্ধুদের বলেছিলাম । কাউকেই বিশ্বাস করাতে পারিনি শেষে । কালি মুন্দির পাইকড় গাছ পেরুলে তার পর প্রকান্ড ঝাকড়া বড় একটা তেঁতুল গাছ । পূণর্ভবার নদীর খেয়া পারাপারের এই বিশেষ যায়গাটিতে বেশ সে সময় নানান মুখে সত‍্যিকারের গল্প বুনা হতো । এই তেঁতুল গাছটা নদীর কুলের কিছু অংশ জুড়ে পানি ছুঁয়ে থাকতো । এই তেঁতুল গাছের উপর দিয়েই ঐ পাইকড় ও তাল গাছের একটা সংযোগের যোগসূত্র ছিলো সমস্ত ভুতের চলাচলের জন্য । ভুত , পরী , জুজু বড়ী এবং আরও যে সব ভুত ছিলো । তাদের আনন্দ উত্‍সব চলতো নিশী রাত আরো যতো গভীর হতো । যেহেতু কালি মন্দির বুড়ি মার থান বলে সকলেই এক নামে জানতো এই স্থানটিকে । সেহেতু অনেকের কাছেই জুজু বড়ীর নামটা ছিলো একটা আতঙ্ক । এ বুড়িকে এ রাস্তা ছেড়ে এখন যে
টি,এন,টি এক্সচেঞ্জ অফিসটা রয়েছে , তারই অপোজিটে যে লিচু বাগানটি নদীর মস্ত উপকুল জুড়ে কালো বর্ণে ঘিরে ছিলো ? সেই লিচু তলার নিচে বসে থাকতে দেখেছে অনেকেই । যারা সেই সাদা লম্বা জুজু বুড়িকে দেখেছে তাঁরাই গল্প করেছে পাড়ায় মহল্লায় এসে । এই পুরো রাস্তাটাই ছিলো একটা ভুতের সামরাজ‍্য । এই রাস্তা ও এই খেয়া পারাপার ছাড়া বিকল্প কোনো ব্যাবস্থাও ছিলোনা চলাচলের জন্য কারো । এখানে পারাপারের জন্য বড় রশি টানা একটিই মাত্র নৌকা । সে নৌকার মাঝ দিয়ে দু’টো মোটা রশি এবং দু’টি ঘাটের মাথায় শক্ত করে দুই খুঁটিতে দুই রশি সবসময় বাঁধা থাকতো । নিজেদের পাড়ে নৌকা না বাঁধা থাকলে সে সময় একটা রশি টেনে নিজেদের ঘাটে টেনে আনবার জন্য একটি পদ্ধতিতে একটা সহজ ব্যাবস্থা করে রাখা ছিলো । এই পদ্ধতি স্থানীয়দের জানাছিলো সবার । মাঝি ছাড়া এই পারাপারের ব্যাবস্থা কতোক্ষেত্রে মনে হতো নিরাপদ কতোক্ষেত্রে মনে হতো ঘাড়ের বোঝা । স্কুল টাইমে এপারে ওপারে নৌকাটিকে রেখে অনেক ছাত্র ছাত্রী দুষ্টুমিও করতো প্রচুর । এইখানে অনেক জীবনেরও মজার মজার গল্প আছে । স্বপ্নও আছে । দুঃস্বপ্নও আছে ! বর্ষার ভরা নদীতে একবার মনার চুয়ানি খে‍য়ে লেক্কো মাতাল ঐ মুরগী হাটির চুড়ায় চড়ে ইয়ালি বলে ঝাপ দিয়ে দেখিয়েছিলো তার শেষ বীরত্বটা । সেইদিন লেক্কোর লাশ ভেসে উঠেছিলো এই বুড়ি মা থানের ঘাটে । গাজী শিশু শিক্ষা নিকেতনের ক্লাশ থ্রির দুজন ছাত্রকে এক বর্ষায় এই ঘাটে ডুবিয়ে মেরে ফেলেছিলো । রাবেয়া বালিকা উচ্চ বিদ‍্যালয়ের এক ছাত্রী নৌকাতে চড়ে হাসি মজা করতে করতে ডুবেছিলো এখানেই । স্বপ্ন গড়া ও ভাঙ্গার গল্পই বেশী গাঁথা আছে এখানে । তবে ভুতের গল্প তারও চেয়ে শতভাগ বেশী । সাদা কালো ভুত । তাল গাছের সমান ভুত । গাল ফুলা ভুত । নেড়া ভুত । ল‍্যাংড়া ভুত । তবে জুজু বুড়ী ভুতটা ছিলো বেশী সবার মুখে মুখে । ঐ ভুতগুলোর মধ্যে কেউ কেউ তেঁতুল গাছে থেকে নেমে আসতো নিচে । অনেক সময় নৌকায় চড়ে স্ত্রী ভুতেরা চুল শুকাতো । না হয় নিত্য করতো ন‍্যাংটা হয়ে । একদিন রাত্রি তিনটা নাগাদ ট্রেন থেকে নেমে একাই ফিরছি । যেই মুসা সরকারের কবরস্থানের কাছে এসেছি দ্রুত হার্টবিট ওঠানামা শুরু করে দিয়েছে । খুব সাবধান ও সতর্কভাবে হেঁটে চলছিলাম । ভয়ে ঘাড় ঘুরাতেও ভয় পাচ্ছিলাম । জীবনে সেই প্রথম প‍্যানটে এতটু প্রসাব করে দিয়েছিলাম ।
হঠাত্‍ পিছন থেকে একটা সাদা ভুত ঘাড় স্পর্শ করে শুধু বলল ,
– ও সিপু !
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সত‍্যি সাদা ভুত । চুরুক করে খালি বুঝলাম প‍্যান্টের ভিতর একটু ভিজে গেছে । পিচকারির মতো ছুটতো আরেকটু হলে । ভুতটা আবারও বলল ,
– তোমাদের পাড়া ছেড়েই আমার বাড়ীগো । চলো ।
ভুতটাকে ভালো মনে হলো । অনেক ভালো ভালো ভুতের গল্প শুনা ছিলো । এই ভুতটাকে তাই মনে হলো দেখতে । কারণ সেই মুহূর্তের অবস্থা একটু উপলব্ধি করলেই বুঝবেন । কেনো অসহায় ও নিরুপায় হয়ে পড়েছিলাম । চোখ দু’টোই যেন সত‍্যি সেদিন ট‍্যারা দেখছিলাম । পা দু’টো ছোট-বড় মনে হচ্ছিলো হাঁটতে । ভীষণ টক্কর খাচ্ছিলো হাঁটুতে হাঁটুতে । নিজেকেও মাঝে মাঝে ভুত মনে হচ্ছিলো । নিজের গা হাত নেড়ে নেড়ে নিজে নিজে দেখছিলাম কখনো কখনো । সব ঠিকঠাক আছেকিনা ? তাকে অনুসরন না করলে বা তার অধিন না থাকলে নিজেরই অমঙ্গল হবে ভেবে নিয়েছিলাম । সেই রাত্রি কীভাবে কি কষ্টে কি ভয়ের মধ্যে ঘাট পেরিয়ে বাসায় ফিরেছি সে গল্প দীর্ঘ আর লম্বা না করে , না বলাই ভালো । তবে সেই সাদা ভুতটা এখনো জীবিত আছে । ধবধবে সাহেবের মতো সাদা । যে বাসায় এখনো বাস করছি সেখান থেকে বেশী দূর নয় । পৌর ভবনের সংলগ্ন উনার বাসা । সাহেব নামেই সকলে তাঁকে চিনে । সকলের কাছেই সে এক নামে সুপরিচিত । সুন্দর একটা চসমা পড়ে থাকে সবসময় । একসময়ের দূর্দান্ত ফটোগ্রাফার ছিলো সেই সাহেব ভাই ।
শান্তনা যখন হাত স্পর্শ করলো তখন চমকে তাকালাম ভুত বলে তাঁর দিকে !
– কোথায় ভুত ?
– তুমি ঠিক আছো শান্তনা ?
– আমি ঠিক আছি । আপনি এতোক্ষণ কোথায় হারিয়ে গেছিলেন বলেনতো ?
– কোথাও না ।
– নিশ্চয় এর কোনো সমাধান খুঁজে পাননি ? না হয় কিছু একটা বলে শান্তনা দিবেন !
– বিশ্বাস করো শান্তনা , পেয়ে গেছি সব । একটু অপেক্ষা করো । তুমিও দেখলে বিশ্বাস করবে । এমন সময় বিদ্যুৎ
এলো । শান্তনা ঘাম চুঁইয়ে ভিজে গেছে । শরীরের ভাজ ভিজে ওর শরীর ফুটে উঠছে । নিজেও ভিজে গেছি । কপাল ভিজে চুঁয়ে পড়ছিলো ফোটা ফোটা
ঘাম । ওকে নিয়ে এনে দেখালাম ,
– এই দেখো জুতা পরিস্কার করা ব্রাশ । এই ব্রাশটি আর চলবেনা । সকালেই বুঝেছিলাম । তখনিই ফেলে দিতাম । এই দেখো এই ভাবে ঝরে পরেছিলো
সকালে । দেখো , দেখো ?
জুতা ব্রাশ করতে করতে আবারও দেখালাম ।
– আর ঘুঁঘঁরের শব্দ ?
– সেটাও দেখাচ্ছি ।
এবার তাঁকে টেনে নিয়ে গেলাম জানালার উপরের ছোট একটা ভেন্টিলেসন দেখাতে । ওখানে দু’টো চড়ুই বাসা বেঁধে আছে । ওদের মধ্যে যে কেউ একজন এমনভাবে ডাকছে , যেটা
অবিকল ঘুঁঘুঁরের শব্দের মতো মনে
হচ্ছে । সত‍্যি খুবই অদ্ভূত ব্যাপারটি । নিরব নিস্তব্ধ হয়ে শান্তনাকে লাইট অন অফ করে বেশ দীর্ঘ সময় ধরে দেখালাম ও শুনালাম এবং বিশ্বাসও করালাম । কিন্তুক ওর ভিতরের শালোয়ার ভিজিয়েছে কিনা জানিনা । তবে সবকিছু বিশ্বাস করবার পর বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুধু বলতে শুনলাম ,
– দেখেন সিপু ভাই । আগেও বলতে পারতেন আপনি ! এরপরই দেখলাম শান্তনা বাতরুমে গেলো । এই ফাঁকে শুধু চড়ুইয়ের গল্পটা সহসা‍ মনে পড়ে গেলো । এই ঘুঁঘঁরের শব্দ উদ্ধার করতে গিয়ে প্রথমে এই বাড়ি ছেড়ে অনেকেই পালিয়েছিলো সে সময় । শেষ পর্যন্ত ঘুঁঘঁরের শব্দ বেড় করে ক্ষান্ত হয়েছিলাম নিজে । এ বাসার আরো কতো কি ঘটনা আছে সবাইকি তা জানে ? জানেনা । আজ দীর্ঘদিন হলো । সেদিনের সবকিছুই কেনো যেনো ভুলতে বসেছি । সত‍্যিই ভুলে গেছিলাম আজ অনেক – কটা ঘটনার ভীড়ে ! শান্তনা এতো ডিপে কখনোই ঢুকবেনা । কি ভেবে বারবার শুধু মনে হলো আর নিজেকে কেনো জানি শুধরে নিলাম – সরি শান্তনা , এন্ডলেস সরি !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *