পরাণ ভাই । PART- 14 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART-14

 

———————–ঃ নাসের কামাল

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

শান্তনাদের এই ড্রয়িংরুমে ইতি পূর্বে দুইবার এসেছি ।

আজকে নিয়ে তিনবার হলো । সুন্দর সৌখিন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ।বেশ বড়সড় ড্রয়িংরুম । একটি ড্রয়িংরুমের সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে সাজগুজে কোথাও কমতি নেই । শান্তনা ও শান্তনার বড় বোন অন্তনা এবং তার আম্মা বসে আছেন ব‍্যাতের চেয়ারে । শান্তনার পিতা সদর আলী মন্ডল । সে বসে আছেন সোফায় , পাশের সিংগেল সোফা সেটের চেয়ারে । পরাণ ভাইয়ের পাশে বসে শুনছিলাম সদর আলী মন্ডলের পারিবারিক আত্ম জীবনের কথা । ততক্ষণে অনেক কথা হয়ে গেছে । তাঁর পিতার কান্না জড়ানো নরম কন্ঠ স্বাভাবিক হতে বেশ যাপিত হয়ে গেলো সময় ।
অঢেল ফসিল অনুভূতি পুষে রেখেছিলো বুকে । জানতে পারলাম শান্তনার গৃহ ত‍্যাগের মর্মকথা ও তার ছোট্ট কাহিনীও শেষ করলো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে । এক প্রভাবশালী ব্যাক্তির চুড়ান্ত
ঘোষনা ছিলো সেই রাত্রের মধ্যেই শান্তনাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে সে । যার পৈশাচিক মনোরঞ্জনের স্বীকার হয়েছে ইতিপূর্বে অসংখ্য নারীর সম্ভ্রম । যে জন্য সদর আলী মন্ডল বাধ‍্য হয়ে শান্তনাকে বলেছিলো , মর তুই । বিষ খেয়ে মর । না হয় পূণর্ভবা নদীতে ঝাঁপ দে এই রাতের মধ্যে । না হয় আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যা তুই । কথাগুলো শুনছিলাম আর শান্তনাকে নিরবে বলছিলাম সাবাস – শান্তনা সাবাস । এমন সময় পরাণ ভাই বলে উঠলো ,
– আপনাদের সাথে এখানেই আমি এক মত হতে পারছিনা । সে সময় আপনি কারো সাহায্য সহযোগীতা নিলেননা কেনো ?
– সেই মুহুর্তে কেউ ছিলোনা পাশে পরাণ । তুমি তখন জেলখানায় –
– না সেটা ভালোনা । সেটা ভাববেন কেন আপনি । কেউতো নিষেধ করিনি আপনাকে । তখন আপনি সামাজিক সহযোগীতা ইচ্ছে করলেই নিতে পারতেন ? প্রশাসনের কাছে একটা অভিযোগতো দিলে দিতে পারতেনও ?
– তা হয়তো পারতাম পরাণ ।
– চড়ম অন‍্যায় করেছেন ?
সত‍্যি আমারই ভুল । মস্ত বড় ভুল হয়েগেছে পরাণ ।
– এখনতো এই সমাজ এই সব শুনবেনা । সমাজ এসে নোংরা কিছু বললে , আপনার বলবার কিচ্ছু নেই ? সমাজ এমনি হয় ? সময়ে ঘাড় ধাক্কা দিবে । অপমান করবে । সময়ে মাথায় তুলে নিয়ে নাচবে আপনাকে । শান্তনা ভালো মেয়ে বলেই এখনো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলিনি । ওর জন্য আমি পাত্র ঠিক করে রেখেছি । আপনি সম‍্যতি দিলে আমি এখনই বলতে পারি ।
– পরাণ তুমি যে সিদ্ধান্ত নিবে নাও । আমি তাতে দ্বিমত করবো না ।
– সিপুর সঙ্গে ওকে মানাবেও ভালো ।
তাছাড়া মানুষিক সামাজিক দু’টো দিক থেকে স্বীকৃতিও থাকবে । আমি এ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারছিনা ।
– আমাকে বাঁচালে পরাণ । কন‍্যা দায়ের হাত থেকে তুমি বাঁচালে । এসব শুনে মাথা হেট । কিছুই ভাবতে পারলামনা । ভাগ‍্যে কি হবে না ভেবেই বললাম ,
– পরাণ ভাই তুমি এ ভাবে ভেবেছো ?
– কিভাবে ভাবতে হবে বল ?
– ভেবেছিলাম তুমি শান্তনাকে তুলে দিবে । নিরাপদ করবে । তুমি এখন তার সম্পূর্ণ বিপরীত ভুমিকা নিচ্ছো । গলায় ফাঁস পড়িয়ে দিতে চাইছো ।
– তোর ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ।
– তুমি ভেবে দেখো , কাজটা ভালো করছোনা ?
– তুই ভাব , তুই ভেবে দেখ ? তোদের জন্য এই অবস্থায় এর চেয়ে উত্তম কোনো পথ খোলা থাকলে তুই আমাকে
দেখিয়ে দে ।
– না জানা নেই ।
– তোর জানা নেই ? কিন্তু তুই সবই বুঝছিস সিপু ? এই বয়সে এসে এই সব বললেকি কেউ শুনবে ?
– তুমি এখানে এনে এক প্রকার অপমানই করছো ।
– এটা অপমান ! সমাজ জানলে তোর গলা‍য় জুতার মালা ঝুলাবে ।
ঠিক তখন সিপু উঠে চলে যাচ্ছিলো । এমন সময় শান্তনার বড় বোন অন্তনা বলে উঠলো ।
– দাঁড়ান সিপু ভাই । একটা উত্তর দিয়ে যান । আপনি যা ভাবছেন কতোটা যুক্তিসঙ্গত একটু ভাবুন ? আমরা দু’জনের একজনকেও বিশ্বাস করিনা । এখন এই বিড়ম্বনার মধ্যে আমাদের ফেলে যাচ্ছেন কেনো ? হঠাত্‍ অন্তনার আক্রমণাত্মক কথা শুনে সিপু নির্বিকার নিরুত্তর রইলো । এক পা এগিয়ে যেতে পারলোনা । আবারও অন্তনা শেষ আক্রমণ করে বলল ,
– আপনি শান্তনাকে কেনো মেনে নিচ্ছেননা , তার উপযুক্ত সমাধান দেন ; দিয়ে যান ?
এই বার শান্তনা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো । সিপুর পায়ের কাছে গিয়ে নতজানু হয়ে সিপুকে সালাম করলো । এরপর বলল ,
– যান সিপু ভাই । এতোদিন একটা পিতা যা শিক্ষা দিতে পারেননি । আপনি দিয়েছেন । আমার সামনে দু’টো মহান মানুষ আজ দাঁড়িয়ে আছেন । আমাকে কেউ বেছে নিতে বললে আমি আপনাকেই বেছে নিবো । সিপু অত‍্যন্ত দৃঢ় কন্ঠে শান্তনার প্রতি উত্তর সঙ্গে সঙ্গে ছুঁড়ে দিলো ,
– কারো উদ‍‍েশ‍্যে বলছিনা । একমাত্র তোমাকেই বলছি শান্তনা । কারো সবদিক ভালো হয়না । তোমার প্রতি যে অন‍্যায় আর অবিচার করে গেলাম । সেটাকে পারলে ক্ষমা করে দিয়ো । আর যে কারণে দুজনকে পার্থক্য করলে । এটা তুমি শুধরে নিও । তুমি একজনকে মহান করলে ? কিন্তু পরাণ ভাই হাজার লোকের কাছে মহান এবং কি এই হতভাগার কাছেও !
এরপর আর কারো উত্তরের অপেক্ষায় দাঁড়ায়নি । কাউকে কোনো প্রকার ভ্রুক্ষেপ না করেই বেড়িয়ে গেছি সেখান থেকে । সেখান থেকে বেড়িয়ে হঠাত্‍ মনে হলো আগামী কালের নিমন্ত্রণে শান্তনাদের বাসায় আর যাওয়া হবেনা । হয়তো কখনোই না ! মহন্ত ঠাকুর দেবত্ত স্টেট ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছি । এমন সময় পরাণ ভাই ছুটতে ছুটতে এসে সাথ ধরে হাঁটতে লাগলো । কিছুক্ষণ নিরব কাটলো । একসময় নিজে থেকেই বললাম ,
– তোমারা কালকের দাওয়াতে যেও পরাণ ভাই ।
– তোকে সঙ্গে নিতে শান্তনার মা বাবা দুজনই আমাকে বারবার বলে দিয়েছে । এরপর তুই না গেলে আমাকে লেনিন চৌধুরীর জন্য বাধ‍্য হয়েই যেতে হবে ।
– তোমরা যাবে ।
– হ‍্যা তোর কাছে যে জন্য ছুটে আসলাম সিপু । মরণপুরের ডেটটা কিন্তু পরিবর্তন করছিনা । ওটা কনফার্ম করেই সবকিছু ঠিক করে ফেলেছি ।
– তোমার কাছে কখনো কথা দিয়ে কথা দুই করিনি । আশাকরি হবেওনা । তোমাকে এগিয়ে দিই পরাণ ভাই । কতোক্ষণ হয়েগেলো লেনিন চৌধুরীকে বাসায় ফেলে রেখে এসে তুমি বাইরে আছো । বাইরে মোটেই দেরি করা ঠিক হচ্ছেনা তোমার । একটা কিছুও শুনছিলোনা মনে হলো । বাসার কাছে এসে যখন পৌঁছলাম তখন শুধু নিরবে বিদায় নিলো পরাণ ভাই । নিয়ে দেখলাম একা একা হেঁটে যাচ্ছেন তাঁর নিজ খেয়ালই । মনে হলো মানুষটাকে কেনো জানি আজ বড় একা । বড় অসহায় মনে হলো বারবার ?
কিন্তু কার জন্যে , কাদের জন্য মানুষটা নিজের কাছে বারবার একা হয়ে যায় ?
দাঁড়িয়ে থেকে থেকে দেখলাম । যতোক্ষণনা না চোখের সামনে থেকে তাঁর বিমূর্ত নিশ্চিত হলো !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *