পরাণ ভাই । PART- 15 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART-15

 

———————–ঃ নাসের কামাল

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

আজ কার্তিকের ২৫ ( পঁচিশ ) তারিখ ।

এই বাংলা মাসের এই তারিখে পরাণ ভাই পুঁঞ্জিকা দেখে পাকাপাকি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন । নিশ্চয় কোনো বিশেষ দিনের বৈশিষ্ট্য ছিলো বোধহয় । এই দিনে মরণপুর যাবার শুভপ্রসন্ন অভিমুখী অভিযত্রার সর্বপ্রকার সব সরঞ্জাম সহ সবকিছুই প্রস্তুত ছিলো । প্রস্তুত ছিলো দক্ষ ও বিশ্বস্ত গাড়িয়াল সহ একটা সুন্দর টাপর সহ সুসজ্জিত গরু গাড়ি । সেই সবের ব্যতিক্রম হয়নি কোনোই । সেই সুন্দর বৈচিত্র্যময় টাপর ওয়ালা গরু গাড়ির মধ্যে পরাণ ভাই ও মধুকে নিয়ে আছি । পরাণ ভাই ঘুমাচ্ছেন । মধুকে নিয়ে সামনে বসে আছি নিরব । দেখছি পৃথিবীর বৈচিত্র । পৃথিবী তার সুখকর কুয়াশায় তখন একটু একটু ভিজছে । কুয়াশা ডুবে আছে অন্ধকারে । খুব একটা কুয়াশা তখনো ভালো করে চোখে পড়েনা যদিও । তবে গরু দু’টোর শিং ভিজে আছে দেখে খুব অসুবিধে হলোনা বুঝতে । গাড়িয়াল মাথোল মাথায় দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে । ওর নাম আমির আলী । হাতের লাঠি মাঝে মাঝে সামনে তুলে ধরছে । ওতেই ছুটছে গরু দুটো খুব ।
পরাণ ভাইয়ের কথা মনে হলো ইলেক্টোকাল ভোটে হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প এর ব্যাপার নিয়ে বলছিলো কলম্বাসের ইতিহাস সম্পর্কে আজ । সে ব্যাপারে নিজের কাছেও মনে হলো সত‍্যি ১৪৯২ সালে কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার আগেই মুসলিমদের আমেরিকা আবিস্কারের সকল প্রমাণাদির ফলে এমন এটা অনুমান করা দোষের হবে না । কলম্বাস স্বয়ং জানতেন যে , তিনিই প্রথম ছিলেন না । স্পেনে মুসলিমদের শেষ রাজবংশের পতনের বছরেই কলম্বাস যাত্রা শুরু করেছিলেন । আইবেরিয়ার মানুষের মধ্যে তখনো অনেক মুসলিম ছিলেন এবং মুসলিম স্বর্ণযুগের জ্ঞানের সাক্ষ্য বহন করছিলেন খুবই সত‍্য । কলম্বাসের অভিযাত্রী দলের মধ্যে অসংখ্য মরিস্ক ( মরিস্ক বলতে ঐসব মুসলিমকে বোঝায় যারা স্পেন এবং পর্তুগাল ত্যাগ না করে বরং খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন । ঐ সময় মরিস্ক টার্মটি নিন্দাসূচক অর্থে ব্যবহৃত হতো । তবে জোড় করে ধর্মান্তরিত করা হলেও সবাই মনে করত এরা চুপিচুপি ইসলাম ধর্মই পালন করতো ভীষণ রকম । এদের আরেক নাম হলো মুর ) ছিলেন , যাদের কে জোড় করে ক্যাথলিক করা হয়েছিল অন্যথায় তারা মারা পরতেন । মুসলিমগণ ‘নতুন বিশ্ব’ আবিস্কার করেছিলেন এই কথা কলম্বাস অবশ্যই শুনে থাকবেন । এজন্যই তিনিও অভিযানের ব্যাপারে উৎসাহিত বোধ করেছিলেন ।
যখন তিনি আমেরিকা পৌঁছলেন তখন তিনি অনেক দৃষ্টান্তই দেখলেন যাতে বোঝা যায় মুসলিমগণ ইতিমধ্যে সেখানে অবস্থানগত । তিনি আদিবাসীদের কাছে রক্ষিত সোনা দেখে মন্তব্য করেছিলেন যে , এটা একই পদ্ধতিতে তৈরী , কিছু খাদ মেশানো ঠিক যেমনটি পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিমগণ করে থাকতো । উপরন্ত কলম্বাস উল্লেখ করেছিলেন যে , আদিবাসীদের কাছে সোনা পরিচিত ছিল গুয়ানিন নামে যেটি মানদিঙ্কা শব্দ গ‍্যানিন – র সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ । আর এই গ‍্যানিন শব্দটি খুব সম্ভবত আরবী শব্দ গিনা থেকে এসেছে । যার মানে দাঁড়াতো সম্পদ ।
১৪৯৪ সালে কলম্বাস রেকর্ড করেছিলেন যে , তিনি নানাপ্রকার দ্রব্যাদি বোঝাই একটি জাহাজ দেখেছিলেন যেটি আমেরিকা অভিমূখে যাচ্ছিলো , আফ্রিকার অধিবাসী দ্বারা সেটি পূর্ণ ছিলো , যারা সম্ভবত আদিবাসী আমেরিকানদের সাথে বাণিজ্য যাত্রার পথে ছিলো । কলম্বাস তার জার্নালে আরো লিখেছিলেন যে , আদিবাসী আমেরিকানরা তাকে আফ্রিকার কালো মানুষেদের কথা বলেছিলো যারা নিয়মিতভাবে বাণিজ্যিক কাজে আসতেন প্রায় ।
অতি সম্প্রতি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগান বলেছেন, কলম্বাস নয় , মুসলমানরাই আমেরিকা আবিস্কার করেছিলেন । কলম্বাসের একটি ডায়রির উদ্ধৃতি দিয়ে এরদোগান বলেন , ‘ইসলাম ও লাতিন আমেরিকার মধ্যে পরিচয় হয়েছে বারো শতাব্দি থেকে । ১১৭৮ সালে মুসলমানরা আমেরিকা আবিষ্কার করেছেন ; ক্রিস্টোফার কলম্বাস নন ।’
আমেরিকার আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের কর্ণধান ইতিহাসবেত্তা ড. ইউসেফ মরুই ১৯৯৬ সালে এক নিবন্ধে লিখেছেন , ‘কলম্বাস তার নিবন্ধে স্বীকার করেছেন যে ১৯৪২ সালের ২১ অক্টোবর সোমবার তার জাহাজ যখন কিউবার উত্তর-পূর্ব উপকূলের জিবারা অতিক্রম করছিল তখন একটি সুন্দর পাহাড়ের চূড়ায় তিনি একটি মসজিদ দেখতে পান ।’ যদিও অনেকেই বলে থাকেন কলম্বাস নাকি উপমা হিসেবে মসজিদের নাম ব্যবহার করেছেন ।
কাজেই দেখা যাচ্ছে যে , কলম্বাসও জানতেন আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়া প্রথম ব্যক্তি তিনি শুধু নন । তবে কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কারের ব্যাপারে নানান প্রশ্ন থাকলেও পরাণ ভাই জানতো তাঁর অবদান মনে রাখার মতো আমেরিকানদের কাছে স্বর্ণ যুগের মতো স্বর্ণালী । সেসব ভেবেইকি পরাণ ভাই মরণপুরে ঝাপ দিলেন ? যে কারণে বর্তমান ইলেক্টোকাল ভোটে হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প এর ব্যাপারে পরাণ ভাইয়ের সকাল থেকেই একটা অংশগ্রহণ ও উত্তেজনা বিরাজ করছিলো । ব‍্যাচারা ঘুম থেকে উঠেই প্রথম এ খবর নিয়ে মাতবে । এমন দুর্গম যাত্রাকালে কারো সাধ্য নেই আমেরিকার ইলোক্টকাল ভোটের পরবর্তী রেজাল্টের পর আর কি হলো সংগ্রহ করবে এই দজ্জাল ভুমিতে । তাছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী ঘোষণার পর আর কি আগ্রহ থাকে জানবার ? তারপরও পরাণ ভাই জানতে চাইবে । আমির আলীর গাড়ি ছুটে চলছিলো । গাড়ির চাকা দু’টো কচ্কচ্ করছে শুনছি । গাড়িতে চড়িনি দীর্ঘদিন কিন্তু এই শব্দ দারুণ পরিচিত কানে । এই নির্জনে নিঃশব্দে দারুণ লাগছে বিশেষ করে এই শব্দটা । ছোট্ট একটা আম বাগান পেরিয়ে যাচ্ছি । একটা তক্ষক ডেকে উঠলো । তক্ষকের ডাকও দীর্ঘদিন শোনা হয়নি । এই আম বাগান পেরোলেই ছোট্ট একটা সাঁকোর উপর দিয়ে পাড় হতে হবে । এরপর ছোট্ট একটা ফাঁকা মাঠ । তারপর একটা বৃহত্‍ গ্রাম । তার মাঝ দিয়ে গরু গাড়ির রাস্তা পড়ে আছে । সেই গ্রামের পর কোনোকিছুই পরিচিত না । তখন মধু বাকি রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে যাবে । ওর সব পরিচিত । মধুকে বললাম ,
– মধু তুমি ঘুমিয়ে নাও ?
– না গো দাদা । বড় রাস্তাটা চিনিয়ে দিয়েই তেবেক হামি ঘুমিয়ে লিবো ।
মধু একটু একটু ওদের ভাষায় প্রভাব ফেলছিলো বুঝলাম । ও আরো জানালো সামনে একটা দীঘল বাবলা বন আছে । বাবলা বনের পর মাঠের সীমানা শুরু । এরপর একটা তালপুকুরের সুন্দর সিঁড়ি বাঁধা ঘাট ফাঁকা মাঠের উপর । তারপর একটি ছোট্ট আমবাগান । এরপর ওর সঙ্গে আপাততঃ দীর্ঘক্ষণ নিরব কাটলো । গ্রামের পথে যেতে আরও সময় লাগবে । সাঁকোর কাছে এখনো পৌছতে পারিনি । একটু অদূরেই সাঁকোর নিশানা । কার্তিকের আকাশ দেখবো । সাঁকোটা পেরুলেই কার্তিকের খোলা আকাশ দৃশ্যমান হবে । সেই প্রতীক্ষা করতে করতেই সাঁকোর কাছে চলে আসলাম ।
সাঁকোর কাছে যেতেই প্রায় দশ থেকে বার জন সশস্ত্র লোক গাড়ির সম্মুখে এসে দাড়ালো । ঠিক সে সময় একটা ভুতূম প‍্যাচা ডাকছিলো কাছের কোনো খান থেকে । ওদের মধ্যে থেকে একজন তত্‍ক্ষনাত্‍ বলে উঠলো খেঁকিয়ে ,
– তোরা কোথা থেকে এলি । কোথা যাবি লা ?
মধু কথা বলল । ওর দায়িত্ব মতো উত্তর দিলো এবং তত্‍ক্ষনাত্‍ ওরা সরে দাঁড়ালো সামনে থেকে ।
– রহণপুরে রুগী রাখে এনুরে । কায়েলের ভাতিজা হামি লা ।
– ও কায়েলের ভাতিজা তু ?
– হাঁ । কুছু আর বালবি হামাদের ?
– আঃ তেবে কেনে ? যা । চালে যা ।
এদের প্রত‍্যেকটা কথায় কবিতা । শঙ্খচিলের মতো ঝাঁজ ! গাড়ি ছুটছিলো । অন্ধকার আর কুয়াশা মাখা জোছনা পথে ছুটে চলছিলো আমির আলীর গাড়ি । পরাণ ভাই তখনও কান মুড়ো দিয়ে ঘুমাচ্ছে । বাতাসে শুকছিলাম রহস্যের গন্ধ । বাতাস ভারি করা ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া বয়ছিলো । কোনো রহস্যের গন্ধ মনে হচ্ছিলোনা পাচ্ছি । কার্তিকের আকাশে আজ তারার জোনাক । আর পড়ে থাকা পথে গরু গাড়ির নকশা টানা লিকের ভাঁজে ভাঁজে দেখে যাওয়া চন্দ্রের জোছনা । আর মাঝে মাঝে দেখছিলাম গরু দু’টোকে , ওরা হেঁটে হেঁটে অবিরাম চলছে কেমন ? গরু ! এই না গরু ? অবলা অসহায় গরু । গরুর দম ভীষণ রকম । একবার ক্লাস সেভেনে গরুর রচনায় গরু সম্পর্কে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলাম । তাই জানি গরু আমাদের কতো উপকারী ? কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এই প‍য়েন্টটি তখন জানা থাকলে ভালো হতো । নিশ্চয় তুলে ধরতাম । তারপরও ভাবতেই বোকা – বোকা মনে হলো নিজেকে ।
পরাণ ভাইকে বারবার দেখছি । নিষ্পাপ শিশুর মতো পড়ে ঘুমাচ্ছে । কতো দিনের স্বপ্ন পুরোনের ভুমিতে চলছি । এখন দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে সেই স্বপ্নটা ? পরাণ ভাইয়ের আঁকা রং চিত্রে ডুবে ছিলাম এতোদিন । সুন্দর একটি চিত্র করে দেখিয়েছিলো দিগন্তহীন খোলা মাঠে পড়ে থাকা একটি বিবর্ণ জন বিচ্ছিন্ন গ্রাম । হঠাত্‍ মনে হলো দুঃসংবাদ কারীকে । ওর মোবাইল নম্বরটা কাঞ্চনের নামে সেভ করে রেখেছি । পরবর্তিতে জেনেছি ওর নাম সৈয়দ লেনিন চৌধুরী ।
কাঞ্চন চৌধুরীকে মাটি দিতে এসেছিলো এই লিনিন চৌধুরী । অনেক ধনী ঘরের সন্তান । ঢাকার প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে একজন । কাছের এবং খুব প্রিয় নামীদামী বন্ধু । ওর সঙ্গেই শান্তনার সমন্ধটা শেষ পর্যন্ত হয়ে গেলো । শান্তনা দেখতে শুনতে ভালো । ওর রুপ দেখে অপচ্ছন্দ করবেনা কেউ সবাই তা জোর দিয়ে বলতো । শেষ পর্যন্ত তাই হলো । ওর বন্ধুর পক্ষ থেকে আপত্তি উঠিনি কোনই । প্রথম সাক্ষাতেই শান্তনাকে পছন্দ করেছে । এরপর শুভ কাজ যতো তাড়াতাড়ি হয় তার জন্য ছেলে পক্ষই উঠে পড়ে লাগলো । ফেসবুকের মাধ‍্যমে ছেলে পক্ষের যোগাযোগ দ্রুত হয়ে গেলো । এক সপ্তাহের মধ্যে মেয়ে দেখাশোনা ও কথা পাকাপাকি এবংকি কলমা করে শান্তনাকেও সেই দিনই সঙ্গে নিয়ে চলে গেলো । ছেলে পক্ষ গুনে গুনে চৌদ্দটি মাইক্রো আর দামী কার নিয়ে এসেছিলো । তার মধ্যে আটটি কার ছিলো । ওর মধ্যে ওদের নিজেদেরই কার ছিলো পাঁচটি । সবকিছুই পরে শুনলাম । কাঞ্চনদের চেয়ে একশ গুন বড় লোক ওরা । অঢেল সম্পদের মালিক । গুলশানে দুইটা ফ্লাট বাড়ি । লাল মাটিয়া ও বনানীতে একটা করে বাড়ি । লাল মাটিয়ায় ওরা যে বাসায় থাকে সেটি দশ কাঠার উপর আয়তন । ওটার সবুজ গালিচায় চারিদিক বায়ুন্ডারি ঘিরা দশ তলা বাড়ি ! প্রথম শুনেই মাথা ঘুরছিলো । ওরা সবাই লন্ডনে থাকে । শান্তনাও লন্ডন যাবে ওর সঙ্গে শুনেছি । ঐশ্বর্যে , ধনে মানে কিছুই না কাঞ্চনেরা । শান্তনার বিয়ের দিন ওদের ওখানে যদিও যাবার কথা ছিলোনা । ইচ্ছে করেই গেছিলাম ।
চোখটা এতোক্ষণে কাঁদলো নিরবে অনেকটাই ! বুঝলাম ভিজে গেছে চোখের ভিতর । মনে মনে শুধু বললাম , নাহঃ এরপর দীর্ঘ সময় সব ভুলে যেতে অন‍্য কোনো চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন হতে চাইলাম । তারপরও গেলোনা যেন সব ভুলা । মনের ভিতরে শুধু বিড়বিড় করলাম , সিপু ওয়াজ নট ইন লাভ উইথ ইউ !
সেই মাঠ পেরিয়ে বড় গ্রাম পেরিয়ে অনেক্ষন হলো চলে এসেছি অনেক খানি পথ । এখন মাঠের পর মাঠ । শুধু সামনে পিছনে ধুধু প্রান্তর । কেউ কিচ্ছু চিনিনা । সেই থেকে মধুর দায়িত্ব পালা শুরু হয়েছে । ওর উপর ছেড়ে এখন খুব সহজ বুদ্ধি হলো নির্বুদ্ধিতায় চোখ বন্ধ করে রেখে চুপ থাকা । কারণ এই সারা মাঠে মানুষের রক্ত দিয়ে হলি খেলার উত্‍সব চলে । মানুষের রক্ত নিয়ে উল্লাস করে । মানুষকে মানুষ কেটে টুকরো টুকরো করে দেয় । সেই টুকরো গুলোকে ওদের পোষা কুকুরের মুখে ছুঁড়ে দেয় এরা । এটাই রেওয়াজ এই মাঠের । আর এটা পারে বিধায় মরণপুরে এখনো কারো আধিপত্য এ পর্যন্ত খাটেনি । এখন পর্যন্ত দখলে আছে প্রতাপশালী কোনো এক মন্ত্রীর হাতে । যার প্রভাবে হয়তো কুচ্চু মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে । ঠিক এ সময় মধু নড়েচড়ে বসলো । বুঝলাম ও কিছু বলতে চাইছে । একটু কাছে এসে আংগুল তুলে দেখালো ,
– ঔই সামনে তিনটে গাড়ির রাস্তা আছে লা । আকটুক ভুলভাল না হবেতো চালে যাবো । মধু বলেই চুপ করে গেলো । সত‍্যি এমনই এক ভয়ঙ্কর রাস্তার মোড় একবার রাস্তা ভুল করে দিলে প্রাণ রক্ষার আর কোনো বুদ্ধি থাকবেনা ।
মধু আবারও বলল ,
– না ঠিক লিয়ে যাবি তেবেক জান চালে যাবে সাবার আমির আলী ।
এইবার আমির আলী ওর উত্তর দিলো ,
– তুই দেখিয়ে দিবি বে অতো কি ? তুই যেদিক দিয়া লিয়া যাবি হামি দেখনা লিয়া য‍্যাতে পারছি কিনা ?
– ওদের কেউ থাকলে । ওই খানে চুপে যাবি তুরা ।
– আবে ছোড়া আর ফুটানি মারিসনা । কুন সমুন্দির বেটা আসবে সামনে আসুকনা । সমন্দির বেটাকে লিয়ায় বুক পাড়া দিয়া পইড়া যাবো । নিরবতা ভেঙে আমির আলীকে বললাম ,
– আমির ভাই । মধুর উপর ছেড়ে দাও ।
– তোমরা এতো ভয় করছো ভাই ? মাথায় খারাপ হয়ে য‍্যাবে মনে হোছে হামার ।
– আমির ভাই । এই এলাকাটা মধুর জানা শুনা আছে ? বরং ও যা বলছে তুমি শুনো ।
– চড়ম সিগারেটের নেশা লেগা গেছেতো ভাই । তোমরা সিগারেট টিগারেট খাওনা । আর তোমারা ফেদার যতো ভয় করছো । ওইন দ‍্যাখো যে ভয় করেনা ঘুমাইছে । পরাণ ভাইকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখালো । এরপর আমির আলী আর কথা বাড়ায়নি । আগের সুন্দর নিরবতা নিয়ে চলতে লাগলাম । আমির আলীর হঠাত্‍ করে ফুঁসে উঠা দেখে চৌমকেই গেছিলাম । শরীরে এখনো প্রচুর তাগদ । রাগে ফুঁলছিলো । ভীষণ রাগ দেখেই বুঝা গেলো । রিয়াল মাটির মানুষ । এদের মধ্যে প্রভু ভক্তি প্রচুর । পরাণ ভাই এই আমির আলীকে কবে থেকে নির্বাচন করে রেখেছিলো কে
জানে ?
অদূরেই মনে হলো সেই গাড়ির নির্দিষ্ট মোড় । দূর থেকে লাইটের আলো এসে পড়লো আমির আলীর চোখে । মধু নিচু স্বরে বলল ,
– তুরা কুছু বলবি না ।
ওরা চারজন সংঘবদ্ধ ভাবে এগিয়ে এলো । তার আগেই মধু চিত্‍কার করে উঠলো ,
– হামরা আছি লা ।
– তুরা কে ?
– কায়েলের ভাতিজা আছি লা । দ‍্যাকনা কায়েলের গরু গাড়িকিনা ?
– গাড়িতে দুটা লোক লিয়ে কেনে ? দু দুটা লোক লিয়ে যাবি তু ?
– কেনে যাবেকনা বুল ।
– আঁহ ! মাধু তুর দিমাক ঠিক আছেতো ?
– সাব ঠিক আছে লা । ডাক্তার না লিয়ে
গেলে । দ‍্যাখ গাল্ডেন তুর বাহু মুরবে ।
– হামার বাহু !
– হাঁ !
– কি বুলছিস তুরে ?
– হামি ঠিকি বুলছি লা ।
– ডাক্তারের নাম বুল ?
– ডাঃ শ্রী শীতেস চন্দ্র শীল । মালদহ রত বাড়ি ডাক্তারকা ঘার ।
– ঠিক বুলছিসতো তু
– হাঁ-হাঁ ঠিক বুলবোনাতো তুকে মিছা বুলবো কেনে ?
– তুরা থামেক তেবে ।
বলে সে দূরে গিয়ে মোবাইল লাগালো । ইন্ডিয়ার নেট ব‍্যাবহার করছে বুঝাই গেলো । ইন্ডিয়ার নেট এখানে চালু আছে পরাণ ভাইয়ের কাছে আগেই শুনেছি । পরাণ ভাই এ মুহূর্তে ঘুমিয়ে আছে কেনো বুঝছিনা । ওদের মধ্যে তিনজন ধারালো বড় লম্বা হাসুয়ার মতো একটা করে কাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে
আছে সামনে । ব্যতিক্রম হলে ওরা সেটা ব্যাবহার করবে ভেবেই নিয়েছি । আমির আলী বাঘের মতো ঘাপটি মেরে আছে । আমির আলী গাড়ির জুয়ালের দিকে চোখ করে কানকে সজাগ করে রেখেছে মনে হচ্ছে । ওকেই দেখছিলাম । ওর মতো রাগী মানুষটা সংযত সহনশীল ও সাহসীও মনে হলো দেখে এখন । ওর শরীরে স্পষ্ট দেখছিলাম চতুর্মাত্রিক চাতুর্যপূর্ণ ধ‍র্য‍্য ও নির্ভাবনার নির্ভরতা নিয়ে আছে ও । ওদের মধ্যেও ব‍্যাতিক্রম হলে সেও ঝাপিয়ে পড়বে । গাল্ডেন না কি নাম ফিরে এলো । খুব ঝটপট বলল ,
– যা মাধু । এই রাস্তা দেখিয়ে লিয়ে যা । তরিঘারি চ‍্যালে যা । হামার বাহুকে বাঁচালেরে তু ।
– তুর বাহুর লিগে যা কারবার কারছি । চিন্তা এ লিয়ে কুনুক না কারবি তু ।
– তরিঘারি যা মাধু যা ।
মধু রাস্তার নিশানা দেখিয়ে দিলো এক হাত তুলে । এরপর আমির আলীর গাড়ি বাতাসের বেগে ছুটলো মনে হলো । এতো চঞ্চল প্রকৃতির মতো হয়ে উঠলো । লাঠি তুলে তুলে গরু দু’টোকে হয়রান করে দিলো । গরু দু’টো কি বুঝলো ওরাও দৌড়ে গেলো যেন প্রভুর প্রাণ রক্ষার্থে । আমির আলীর লাঠি না তুলাতেও গরু দু’টো আরও অনেক অনেক দূর ছুটে গেলো । হিঁপছিলো । হিঁপতে হিঁপতে বহু দূরে গিয়ে স্বাভাবিক চলতে লাগলো আবারও গরু দু’টি ।
সুন্দর ফুট ফুটে পরিচ্ছন্ন একটি সকাল । অথচ বাতাসের গায়ে কেনো যেন লাগছিলোনা সকালের সেই মেলে ধরা হাত । মনে পড়লো কুচ্চুর ডায়ালগ , তাহলে পরাণ ভাইকে এখানেই একটা বারামখানা বানিয়ে দেয়ার কথা বলছিলো সেইদিন ? এখানে রুদ্রের অঢেল সীমানা । এখানের পর শেষ যতো বৃক্ষের উপস্থিতি । এরপর আর গাছপালার একটু চিহ্ন নেই । একটা ডাহুক ডেকে উঠলো । ততক্ষণে সবার নাস্তার পর্ব শেষ । ক্যামেরাটা ওপেন করে এই প্রথম ছবি তুললাম সবার । মরণ ডাঙ্গার চারিদিক ঘুরে ঘুরে অনেক কটা প্রথম চান্সেই নিয়ে নিলাম ছবি । মাস্টার শর্টে নিলাম একাধিক । এখানে জিগ্নি না জিয়ালার গাছ প্রচুর পরিমানে লেগে আছে । দশটা মতো মহুয়ার গাছ দেখলাম অসাধারণ লাগলো দেখতে । করবলীর গাছ উত্তর দক্ষিণ পশ্চিম মিলে অনেক কটা গাছ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম । এখান থেকে ইন্ডিয়ার সীমানা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে । ওদের বডারের টিলা গুলো আকাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে আছে দেখলাম । রাত্রি হলে আরো ভালো দেখতে লাগতো । দেখা যেতো ওদের গাড়ি বাস মটরসাইকেল এর আলো । এতোক্ষণে বুঝলাম পরাণ ভাই কেনো দু’টি ইন্ডিয়ান সীম কার্ড এ‍্যাডভান্স ম‍্যানেজ করেছিলো । মোবাইলটা ওয়ান করে দেখলাম হ‍্যা ? ইন্ডিয়ান নেট চালু হয়েছে । পরাণ ভাইয়ের ইন্ডিয়ান নম্বরে লাগালাম । পরাণ ভাই রিসিভ করে প্রথমেই বলল ,
– চলে আয় আর দেরি করা যাবেনা । এখনি রওনা দিবো আমরা । আর কিছু দরকারী কথা আছে । আয় পরামর্শ করে নিই । অল্প দূরত্বেই ছিলাম । গোল করে বসে আছে সবাই মাটিতে । শুধু আমির আলী তার লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পরাণ ভাইয়ের সামনের মাটিতে মেলে ধরে আছে একটা হাতের তৈরী কাগজের নকশা । গিয়ে মাটিতে বসে পড়লাম । পরাণ ভাই দেখালো এবং কথার মাধ‍্যমে সহজভাবে বুঝিয়ে
দিলো ,
– প্রত‍্যেকটা প্লান এই ম‍্যাপ দেখে করা হয়েছে । তোরা এখন সেটা বুঝে নে । হ‍্যা এই উত্তর পশ্চিম দুই দিকে ইন্ডিয়ানরা বসবাস করে । তবে ভয় নেই । তিলহাসন বন গাঁর আগে বেশ বড়সড় একটা জঙ্গল আছে । সেটা ছাড়িয়ে গেলে মাদারি ড‍্যাং ক‍্যাম্প । ওদের তার কাঁটার মজবুত বায়ুন্ডারী ক্রস করে ইন্ডিয়ানরা কখনোই কোনো কিছুতে হস্তক্ষেপ করেনা , করবেওনা । অথচ মাত্র ডের কিলো মিটার দুরত্বে ওদের বসবাস । মরণপুরটা এইখানে , এই যায়গায় । এইযে এইটা ?
ভালো করে দেখ , দেখে নে ? এই গ্রামের কোনো দিকে কোনো একটু দিগন্ত নেই । মাটির ছোট ছোট খুব সাধারণ চালা তোলা ঘর । গ্রামের ভিতর ভিতর রাস্তা । এই গ্রামের পশ্চিম দিকে , ঠিক এইখানে মড়লের বড় বড় আটটা গোলা ঘর আছে । গ্রামটির পূর্বদিকে খুব অসামান্য কিছু সংখ্যক তাল গাছ ছাড়া তেমন কোনো উঁচু গাছপালার বংশ চোখে পরবেনা দেখিস । একটা ছোট্ট ঢিবির উপর তাল বনটা । এই যায়গায় । এইযে এটা ? এটাই ওদের কবর স্থান !
মনে হলো বুকের মধ্যে কে একজন ছুটির ঘন্টা বাজালো । ঢং করে উঠলো । এরপর একটা একটা করে সবার দা‍য়িত্ব সম্পর্কে সবার আয়ত্বে বুঝিয়ে দিলো পরাণ ভাই । নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে একে একে মাথা , হাত ঝুকিয়ে সবার কাছে সেই মতামত সংগৃহীত করে সাবাস জানালো পরাণ ভাই বারংবার প্রত‍্যেকেই । ডাহুক টা আবারও ডেকে উঠলো । সূর্যটার দেখলাম সত‍্যিকার বীরত্ব ! সত‍্যি মনে হলো দেখে দত‍্যের মতো বিশালতা নিয়ে যেমন হাতের শূণ্যে তালুর উপর ধরে রাখে মানুষকে । যেমন হাতের তালুতে ছোট্ট ক্ষদ্র দেখায় ? ঠিক তেমন গল্প-উপন্যাসের মতো মনে হলো দেখে । মনে হলো সূর্যটা পৃথিবীকে হাতের তালুতে নিয়ে আছে ছোট্ট ক্ষুদ্র , পিঁপড়ের সামান ! এভাবে কখনো ভাবিনি । মরণডাঙ্গা না এলে হয়তো-বা এভাবে কখনো ভাবাই হতোনা । দেখাই হতোনা বিস্মিত হয়ে এমন দৃশ্য ! এর মধ্যে সকলেই যে যার মতো গাড়িতে গিয়ে উঠলাম । আমির আলী গেয়ে উঠলো হঠাত্‍ । আরে ঝুক্কুর ঝুক্কুর গরু গাড়ি চলে গরু গাড়ি চলে । আর সবুজ হলুদ পাতা , রোদে মেখে খেলেরে ; গাছের গাছের ডালে । ওর ভাঙা ভাঙা কন্ঠে ওর গানের সুর ছড়িয়ে যাচ্ছিলো চতুর্দিকের খোলা মাঠে । বাতাসে বাতাসে বারি খাচ্ছিলো মাঝে মাঝে তার ভাঙা কন্ঠের সুর । সম্পূর্ণ গানটি সকলে খুব আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করলাম । পরাণ ভাই আমির আলীর গানে মুগ্ধ হয়ে ভীষণভাবে প্রসংসা করে উঠলো প্রকাশ্যে । পিছনে সবেমাত্র ফেলে আসা মরণডাঙ্গার ডাহুকের ডাকটা যেন আবারও কানে শুনতে পেলাম । অনেক দূরত্বে তার ব্যবধান খুঁজছিলাম বিধায় অন্তরের অন্তরালে হয়তো ডেকে উঠেছে ? হয়তো এভাবে আরও কেউ ডাকছে — come back . I’m still waiting for you.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *