পরাণ ভাই । PART- 16 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART-16

 

———————–ঃ নাসের কামাল

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

আজ ১৪ই নভেম্বর, ২০১৬ সালের এই চাঁদ

         পৃথিবীর খুব কাছে নেমে এসেছে , ১৯৪৮ সাল অব্দি যা আর ঘটেনি ৷ আজ এই সোমবারের চাঁদ পৃথিবী থেকে তার সাধারণ দূরত্বের প্রায় ৩০,০০০ কিলোমিটার বেশি কাছে নেমে এসেছে ৷
‘‘সুপারমুন” বলে যেটি ঘটে নিয়মিতভাবে প্রতি ১৪ মাস অন্তর ৷ কিন্তু আজ এই চাঁদটি হবে ‘‘এক্সট্রা-সুপারমুন”৷ চাঁদকে আবার এত কাছ থেকে দেখতে পাওয়া যাবে ২০৩৪ সালে ৷ নাসার হিসেব অনুযায়ী এই চাঁদ নেমে এসেছে পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৫৬,৫০৯ কিলোমিটার দূরে , যা কিনা রাতের আকাশ থেকে ভূপৃষ্ঠ অবধি চাঁদের সাধারণ দূরত্বের চেয়ে ২৭,৮৯১ কিলোমিটার কম ৷ সবকিছুই দেখলাম প্রত‍্যক্ষ‍ । সে সবই ভাবছিলাম গভীর ভাবে মনে-মনে । এমন সময় পরাণ ভাইও সে কথা বলতে বলতেই হাত বাড়িয়ে দেখালো অন্ধকার কুয়াশা মাখা আচ্ছন্ন অস্পষ্ট কালো সামীয়ানার মতো কি যেন ভেসে আছে দূরে । অল্প অল্প আলোর রেখায় ফর্সা হয়ে উঠছিলো দেখলাম । আজকের এই চাঁদটাকে হাতের নাগালে পেয়েছিলাম । সত‍্যি ফাঁকা মাঠে চাঁদের কৈশোর নেমে এসেছিলো । ঠিক রাত্রি একটার পর তার আলোতে স্নান করেছিলাম সকলেই । তাকে আজ ২০৩৮ সালের মতো শেষবার বিদায় জানালাম । আর ভাবলাম কতো কাছাকাছিই না তার সঙ্গে সঙ্গে ছিলাম । এই রাত কখনো ভুলবার নয় । কখনো ভুলতেও পারবোনা । আসতে আসতে একটি গ্রাম চোখের মধ্যে সুন্দর ফুটে উঠলো । তখন কেবলি মনে হলো । এই কাক ডাকা ভোরে একটিও কাক নেই এই তল্লাটে । তখনো কু‍য়াশায় ঢেকে আছে সারা গ্রামটা । ভিজে আছে গ্রামের পোড়া মাটি । সবুজের চিহ্ন মাত্র নেই । পাখির কোনো কলকাকলী শুনছিনা আশপাশের কোনখান থেকে । কেবলি নিরবতায় ঢাকছিলো দূর থেকে দূরে । সত‍্যি এখন আর দিগন্তের কোনো নিশানা নেই কোনো দিকে । গ্রামের পিছনে পূণর্ভবা নদীটাকে না দেখা গেলেও । নদীর উপকূলীয় উঁচু উচ্চতাটাকে বেশ চোখে পড়ে পরিস্কার । নদীটার পশ্চিম উপকুলে ইন্ডিয়ানদের বসবাস । মজার কারণ যেটি । নদীর পাড়ে গেলে দেখা যায় ওদের পাড়ের সব স্বাভাবিক চলাচল । কিন্তু মরণপুর থেকে ইন্ডিয়ানদের ও নদীটিকে চোখে পড়বার কোনো সুযোগ নেই । মরণপুরে ঢুকবার এই এক মাত্র প্রবেশের একটি দ্বার । খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে নিরেট কঙ্কালের মতো দেখছিলাম গ্রামটিকে । কঙ্কালষার তিনটা মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের দেয়ালের পাশে । একজন ঠাশ দিয়ে আছে দেয়ালে । একজন দেখেই দৌড় দিলো গ্রামের ভিতরে । একটু পরেই দেখলাম অনেক কটা পাংশু মুখ দৌড়ে এসে দেখে আছে এদিকে । যে দৌড়ে গেলো সেই এদেরকে ডেকে এনেছে বুঝলাম । অল্প একটু সময়ের ব্যবধানের মধ্যেই মরণপুরের কিছুটা চিত্র দেখে ফেললাম । মরণপুরে ঢুকবার প্লানিংয়ে মধুর ভূমিকায় ছিলো সবচেয়ে বেশী । যদিও সবকিছু প্লানের আগে পরে পরাণ ভাইয়ের ভুমিকা ছিলো খুবই সুপরিকল্পিত । জ্যামিতিক কাটা কম্পাসের মতো নির্ভুল আঁকা প্লান । বারবার দাগ কেটে । বারবার যোগ বিয়োগ গুন ভাগ করে হিসেব মিলানো হয়েছে । মধু , মরণপুরে আগে এসে সব তথ্য হিসেব মতো ঠিক ঠিক নিয়ে গেছে । মরণপুরের টোটাল জনসংখ্যার একটা পরিসংখ্যান লিস্ট এবং কার কি অবস্থা , কার কেমন চরিত্র ; কার কোন অবস্থান । অর্থাত্‍ প্রত‍্যেকটি পরিবারের পূর্ণ বৃত্তান্ত নিয়ে গেছিলো মধু ? এছাড়া আরও যে সব তথ্য মধুকে দিয়ে সংগ্রহ করিয়েছিলো যা মধু ছাড়া আর দ্বিতীয় কারো পক্ষে সম্ভব ছিলোনা । গাড়ি গ্রামের মধ্যে ঢুকবার আগেই দেখলাম কুয়াশায় ভিজছে সবকিছু । দেখলাম রাস্তার পূর্বে একটা উঁচু ঢিবির উপর অসংখ্য তাল গাছ সার বাঁধা , গোলাকার ; ও এলোমেলোভাবে লেগে আছে । বিশাল একটি তাল বন ঢিবির উপর । বুঝে গেলাম এটাই মরণপুরের কবর স্থান । এবং বেশ কটা নতুন নতুন কবরের নিশানাও দেখতে পেলাম । পিছনে দু’টো রাত ও দিনের কিছু কষ্টের কিছু ক্লান্তির স্মৃতি ফেলে এসে মনে পড়লো হঠাত্‍ । তারপর নিমিষেই ম্লান হয়ে গেলো নতুন স্বপ্নের ও পরিকল্পনার আগমনে । মরণপুরের আগমনী ছায়ায় ঢেকে দিলো যেন সব মুহুর্তে । এমন সময় অতি অল্প সময়ের মধ্যে নির্বিঘ্নে গ্রামে ঢুকে পরলাম । কঙ্কালের মতো মানুষগুলো দাঁড়িয়ে ছিলো দেখার জন‍্য । গাড়ি ছেড়ে যখন গাড়ি থেকে পরাণ ভাইকে নিয়ে নামছিলাম ঠিক তখন তাদের মধ্যে থেকে ভীড় ঢেলে একজন বয়স্ক লোক এগিয়ে এলো তাঁরই নাম হলো কায়েল । কায়েলদা এগিয়ে পরাণ ভাইয়ের হাত থেকে ডাক্তারি ব‍্যাগটি সযত্নে নিজের হাতে নিয়ে হাঁটছিলো সঙ্গে নিয়ে । মধুকে দেখলাম সেই পথ দেখিয়ে হন্যে হয়ে ছুঁটছিলো । সবাই মিলে দ্রুত হেঁটে গোল্ডেন বাবুর বাড়িতে গিয়ে উঠলাম । পিছন পিছন লোকজন ভীষণ ভীড় করে রাখলো । আমির আলী গরু গাড়ির নিকট থেকে সরলোনা সেখানেই থেকে গেলো আগের নির্দেশ মতো । গোন্ডেনের বাড়ি পৌঁছে । ফাঁকা আঙ্গিনা দিয়ে একটি মাটির ঘরে গিয়ে ঢুকলাম । গিয়েই পরাণ ভাই প্রথমে প্রেসার মাপার যন্ত্রে মেপে নিয়ে দেখলো প্রেসার স্বাভাবিক কিনা । পালস টিপে ঠিকঠাক আছে কিনা দেখলো । ষ্টেথিস্কোপ লাগিয়ে শ্বাস তন্ত্র পরীক্ষা করে নিলো । এরপর রোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিস্তারিত জানলো । যদিও পরাণ ভাই আগে থেকে সব জানে । রোগীর অবস্থা কাহিল দেখেই বুঝে গেলাম । তবে পরাণ ভাইয়ের কথাতে একটু আশ্চর্য হলাম । রোগীকে আশ্বস্ত করলো পূর্ণরুপে ,
– ঘাবড়াবার কিছু নেই । রোগী দুই ঘণ্টার মধ্যে সেরে উঠবে অনেকখানি ।
দিয়ে ব‍্যাগের ভিতর থেকে ওরস্যালাইন এর একটি প‍্যাকেট খুলে এক গ্লাস পানিতে গুলে খাইয়ে দিলো । এরপরই সিপ্রোফ্লোক্সিন দিলো একটি । এবং ওর পনেরো বছরের ছেলের হাতে দশটা
ওরস্যালাইন দিয়ে বলল ,
– মাঝে মাঝে , একটু পরপর এইভাবে খাওয়াতে থাকো । আমি পরে আবারও আসছি । পরবর্তী ডোজ আমি নিজে এসে খাওয়াবো ।
কায়েল আবারও হাতে ব্যাগ তোলে নিলো । রোগী কাতরে উঠে বলে
উঠলো ,
– হামি ভালো হোতে পারবো লা
ডাক্তার ?
– অবশ‍্যই । তুমি চিন্তা করোনা । আমি তোমার জন্যই এসেছি । তুমি দুই ঘণ্টার মধ্যে আশা করি আরাম পাবে ।
– তুর ভালা করুক ডাক্তার । ভাগবান তুর ভালা কারুকরে । পরাণ ভাইকে নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে দেখি বাইরে অসংখ্য মানুষ ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে । পরাণ ভাই কাউকে গুরুত্ব না দিয়ে কায়েলের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেলো । দেখছিলাম আশ্চর্য হয়ে কায়েলের সঙ্গে তবে পরাণ ভাইয়ের পূর্বের কি কোনো যোগাযোগ ছিলো ? থাকাটা খুব স্বাভাবিক । দেখছিলাম গ্রামের লোকেদের হাবভাব । এই গ্রামে সাধারণ ডায়রিয়াতে মানুষ মারা যায় ভাবতে খারাপ লাগে । বড় জটিল রোগে মানুষ বাঁচার কোনো প্রশ্নই উঠেনা । ছোটখাটো রোগে মানুষের মৃত্যু সত‍্যি বড় দুঃখজনক । এবং এই মরণপুরে এ যাবত একটি রোগীও মৃত্যুর কোল থেকে ফেরত আসেনি । বেঁচেছে এমন নজিরও নেই কেউ কেউ বলল মুখের উপর । চিকিৎসার অভাবে ছোটখাটো রোগে মারাগেছে কতো মানুষ শুনছিলাম । হয়তো গোল্ডোনের বউ তেমন জটিল কোনো বড় রোগে আক্রান্ত হয়নি । না হলে পরাণ ভাই এতোক্ষণে অস্থির হয়ে উঠতো । কিন্তু গ্রামের মানুষগুলোর মুখ দেখে মনে হলো তারা সকলেই অস্থির , ভীত বিস্মিত নয়নে বোবার মতো ফ্যালফ্যাল করে দেখে আছে । কেউ একজন বলল ,
– আগের ডাক্তার না বাঁচালো কাউকে । দেখবি তুরা গাল্ডেনের বাহুও না বাঁচবে ।
দেখে লিবি কি বুলে গেনু হামি —–
এরপর সে প্রস্থান অভিমুখে এগিয়ে গেলো । এবং শেষে চলে গেলো । এরপর ওদের মধ্যে থেকে একজন
বলল ,
– তুই তেবেক যা বাবু । ও মড়লের লোকবি আছে । ও বলেছে বলেছে কুচ্চু লিবিনা মনে ।
দেখলাম পরাণ ভাইদের তখনো হেঁটে যেতে । হাঁটতে লেগে সেও সঙ্গে এলো দিয়ে থেমে গেলো । কেনো আসছিলো আর কেনো থেমে গেলো জানিনা । শুধু ওর গতি বিধি অনুমান করেছি ওই টুকুই । তখন বেশ জোরেশোরে হেঁটে পরাণ ভাইদের সাথ ধরলাম । অল্পটুকু সময়ের মধ্যে অনেক রহস‍্যের গন্ধ নাকে লাগলো মনে হলো । গন্ধটার ভিতরে ডুবে গেলাম । আর মনে হতে লাগলো একেরপর এক মরণপুর সম্পর্কে নানান ঘটনার রহস্য চোখের সামনে ভেসে উঠছে । হঠাত্‍ পিছন থেকে মধু হাতের ইঙ্গিত দিয়ে বলল ,
– তুরা যা । হামার লিগা না চিন্তা কারবি । যা-যা তুরা যা ।
দিয়ে মধু চলে গেলো পিছন মুখে । পরাণ ভাইকে আর বললামনা মধু কেনো চলে গেলো ? নিশ্চয় নির্দেশনা পেয়েছে মধু । প্রতি মুহুর্তে তার ডিউটি সে পালন করছে । মধুর মগজে এখন অফুরাণ বুদ্ধি । ওর বুদ্ধি খুলে গেছে রহণপুরে গিয়ে ।
শৈত‍্য প্রবাহ হঠাত্‍ করেই বয়তে লেগেছে পুরো গ্রামে । হঠাত্‍ এমন আবহাওয়ার জন্য অবশ্য আগে থেকেই একটা প্রস্তুতি ছিলো । শীতের গরম পোশাক লাগেজ ভর্তি করে নিজ নিজ সবাই নিয়েছে । এবং প্রত‍্যেকের জন্য সেপারেট সেপারেট একটি করে কম্বল নেয়া হয়েছে । পরাণ ভাই জিনস পেন্টের উপর ব্লু কালারের সোয়েটার পড়ে আছে । লম্বা গড়নের মানুষটাকে মানিয়েছে খুব । দেখে মনে হচ্ছে ইন্ডিয়ান ডাক্তার । আমির আলীর পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়ানো এর মধ্যেই হয়েগেছে । ওর জন্য যেটা সবচেয়ে বড় খুশীর খবর ছিলো । ইন্ডিয়ান পাতার বিড়ি সংগ্রহ করে খাবে ও সেটা পেয়ে গেছে । ও মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে বাইরে বিড়ি ফুঁকছে । ওর প্রধান কাজ ছিলো জিনিস পত্র গুছিয়ে নিয়ে রাখা । সেগলো পালন করেছে নির্ভুলভাবে আমির আলী যথাযথ । কায়েলের মাটির একটি ঘরে অর্ধেক ঘর ফ্লোর করে বিছানো হয়েছে বিছানা । অর্ধেক ঘরে বেশ কটা লাগেজ রাখা হয়েছে । বেশ খোলামেলা ঘরখানা দেখে ভালোই মনে হলো । পরাণ ভাই পারফিউম স্প্রে করে দিলো বিছানো চাদরে । এরি মধ্যে কায়েল ও কায়েলের বউ কালাবতি রাণী এসে ঘরে ঢুকলো খাবার হাতে করে । ব্লাউজ ছাড়া ফিরোজা কালারের লাল পাইরের শাড়ী পড়ে আছে । গোবরে পদ্ম ফুল দেখে মনে হলো । খুব অল্প বয়স । খুব টেনেটুনে ত্রিশ বছর হবে হয়তো ? মাঝারি লম্বা গড়ন । রুপ যেন কবিতার কাব‍্য গাঁথা । চোখে মুখে ঝলসে ফুটে ছিলো রুপের অফুরন্ত সৌন্দর্য । ঢুকে ঢুকেই নতজানু হয়ে হাটু গেড়ে পা করে বসলো মাটিতে খাবারের পাত্র রেখে এবং সঙ্গে সঙ্গে পরাণ ভাইকে নমস্কার সম্ভাষণ করলো । দারুণ এই দৃশ‍্য দেখলাম । এমন সময় কায়েলের ছয় বছরের ছোট ছেলে লাডুয়া দৌড়ে ঢুকে । কায়েলের কাছে দাঁড়ালো । কালাবতি রাণী তার মিষ্টি কন্ঠে বলল ,
– লে তুরা খেয়ে লে ?
– তোমরা খেয়েছো ?
– না খাবেকনা । আগে তুরা খেয়ে লে ডাক্তার । হামাদের লিক ভাবছিস কিনে ? পরাণ ভাই কায়েলকে বলল এক প্রকার রঙ্গ করেই ,
– কায়েলদা , এতো কম বয়সী বউদি তুমি কোথায় জুটালে । প্রেম ট্রেম করে বিয়ে করেছো না দেখা শুনা করে বলোতো ?
– তুর বউদি কে বুল ডাক্তার । উকে লিয়ে প্রেম কারেছি না কি কারেছি ? আরে কালাবতি তু ডাক্তারকে সাব বুলে দেনারে , বুলে দে ।
কালাবতি রাণীর এক ঝলক মিষ্টি হাসি লটিয়ে পড়লো ।
– ওকে দাও ও আমাদের সাথে খাবে । কায়েল লাডুয়ার হাত ছেড়ে দাঁড়ালে লাডুয়াকে সঙ্গে করে নিয়ে নিজেই বসে পড়ি খেতে নিচের ছোট্ট মাদুরে । কালাবতি রাণী ত‍ত্‍ক্ষনাত বলে উঠে ,
– না খাবেক না । উকে লিয়ে না খাবি তু । উ খাবেক হামাকে লিয়ে । উ বুকের ধনযে হামাররে ডাক্তার !
কায়েলের ছেলেকে পরাণ ভাই পাশে টেনে বসিয়ে নিয়ে সবাইকে খাবার জন্য নির্দেশ দিলো ।
সকালের নাস্তা । প্রথমেই ছয়টা সিদ্ধ মুরগির ডিম চোখে পরলো । পরোটা । আলুর ভাজা । পায়েশ । দেখে মনে হলো প্রসিদ্ধ রুচি সম্মত সব খাবার । কালাবতি রাণীর চোখটা ভয়ঙ্কর সুন্দর । নাটোরের বনলতা সেনকে আগে না দেখলে হয়তো জীবনানন্দ দাস কলাবতি রাণীর চোখ দু’টোকেই তাঁর কবিতার পংতিতে তুলে ধরতো । মনে মনে জানালাম সুপ্রভাত টা বউদি তোমাকে দিয়েই শুরু করলাম । দেখি সারাটা দিন কেমন যায় ? খুব সুন্দর ও মিস্টি তুমি । তোমার মতো মিষ্টি ও সুন্দর হয়ে উঠুক মরণপুর । তোমার সুন্দর অঙ্গের মতো মরণপুরটা ফুলে ফলে ও সবুজ আস্তরণে ভরে উঠুক । সরষের মাঠ ভরা ঢেউয়ে ঢেউয়ে মরণপুরের সমস্ত মানুষ ভেসে যাক সেটাই যেন দেখি ভীষণভাবে কামনা করছিলাম । এমন সময় ফিরে দেখলো । চোখে চোখ পড়ে চোখ উল্টে নিলো । চোখ দু’টো গিলে খেলো মনে হলো সহসা । সত‍্যি ভীষণ সুন্দর চোখ দু’টো । মুহুর্তে খুন করে ফেললো ভিতরটা মনে হলো । এমনভাবে কেউতো কখনো আগে দেখেনি । আলুথালু চাহনি নয় যেন শহরে আভিজাত্য ফুটে আছে ওর মধ্যে । বনলতা সেন – এর সম্পূর্ণ বিরোধী চোখ । দু’টো চোখে কাব‍্যের হীরণ‍্য বসে , জীবনানন্দ দাস কে নিভৃতে ডেকে ডেকে ফিরে ফিরে শোনাতে চায় , এসো দেখে যাও মরণপুরে কেমন আছি ? নয় আমি বনলতা সেন , নয় সে সবুজ ঘাসের দেশের মতো , চোখে চোখে দারুচিনি – দ্বীপের দেশের মতো । আমি কালাবতি রাণী । মরণপুরের শ‍্যামলা বর্ণের কালাবতি রাণী ।
আমির আলীও খাচ্ছিলো । খেতে খেতে গলায় খাবার আটকে দিয়ে প্রচন্ড কাসি তুলে পানি খেলো ঢকঢক করে । এমন সময় মরলের ছেলেটি এলো । যে ছেলেটি গোল্ডেনের বাড়ির বাইরে যে উটকো বাক‍্য ব্যবহার করে গেছিলো । সে ঢুকেই বলল ,
– মড়ল তুদের দ‍্যাখা কারবার বলেছে । তুরা রাতে যাবি । দ‍্যাখা
কারবি । কায়েল ছোট করে উত্তর দিলো ,
– লিয়ে যাবেক হামি ।
– তু না কাকা । হামি লিয়ে যাবো । তু না যাবি সাব বুলে দিয়েছে মড়ল হামাকে ।
সে যেভাবে হঠাত্‍ এসেছিলো ঠিক সেভাবেই প্রস্থান করলো । সবার মুখের খাবার থমকে গেলো সহসা । বিশেষ করে আমির আলীর চোখের দিকে দেখে নিজেই চমকে গেলাম । ওর চোখ এখনি এমন কিছু বলছে যেন কি একটা ঘটে গেলো । ওর চোখ মুখ রক্তবর্ণ হয় আছে কাসতে কাসতে । ঢোঁক গিলে আবারও পানি খেলো । কিছুটা বিস্মিত পরাণ ভাইকেও দেখে একটু মনে হলো । কায়েল বলে উঠলো ,
– ভারকে গেলি না ডাক্তার ?
– মড়ল কি কিছু টের পেয়েছে কায়েলদা ?
– নারে ডাক্তার ।
– তবে ?
– না হামারো পাত্তা মিলছেনা কুনু । কুচ্চুতো ঠেকছে , খামাখা হুকুম জারি কারে দিলো কেনে মড়ল ? কুচ্চুতো আছে তেবেক !
– এখন উপায় কি বলো কায়েলদা ।
এমন সময় মধু এসে ঢুকেই বলে উঠলো , – গোল্ডেনের বাহু মেলাই অারাম লিয়েছে কাকা । এই লিয়ে সাবার মাথা খারাপ । কায়েল চরম ভাবে বলে
উঠলো ,
– তুর কাপালে রাতে কি আছে ডাক্তার । মড়ল তুকে কি মেরে ফেলবে এ রাতে ? বাছর বাছর তুর মতো ডাক্তার ছো – টা , জিন্দা জভাই কারে মেরেছে । তুকে , কি কারবে উরা কে জানে !
কালাবতি রাণী এক মুহুর্ত থামেনি । লাডুয়ার হাত ধরে টেনে উঠিয়ে দ্রুত তার স্থান ত‍্যাগ করে ঘর ছেড়ে গেলো । আমির আলী জড়সড় হয়ে বসলো পরাণ ভাইয়ের কাছে । ও যেভাবে গাড়ির জুয়ালের দিকে বাঘের মতো ঘাপটি মেরে দেখেছিলো । মনে হলো সেদিকেই কান খাড়া করে রাখলো । পরাণ ভাইকে দেখলাম নিরবে ডায়রির পাতা উল্টে উলটে একটা পাতায় গিয়ে থমকে গেলো । কি লিখা আছে সেটাই মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগলো । সবাই নিরব নিস্তব্ধ ! সবাই যেন পরাণ ভাইকেই দেখছিলাম । শেষ ভর্শাটুকু যেন শেষ পর্যন্ত ভস্ম না হয় ! এমন এক্সপেকটেশন নিজের মধ্যেও গড়ে উঠছিলো ভীষণভাবে । পরাণ ভাই কি তবে সেটারই নির্ভরতা নিয়ে এখনো নিরব হয়ে আছে ? কায়েলদা হারিকেনের আলোটা বেশ তুলে দিলো । ঘরে তখন প্রচুর আলো । সে আলোতে একটা ডায়রীর পাতা দেখিয়ে শুধু বলল ,
– শ্রী সত্তেন পাল ?
– জি স‍্যার !
– এই নে । পড় ভালো করে ।
বুঝতে বাকি কিছু রইলো না । শুধু চোখ কান বুজে মুখস্থ করতে লাগলাম
মনে-মনে । সবি ইংরেজীতে লিখা আছে । দু’টো লাইন চোখ পড়তেই
থমকে গেলাম । শ্রী গিয়াস মুখার্জি ইনফরমেশন এবাউট ডক্টরসঃ-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *