পরাণ ভাই । PART- 18 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART- 18

 

———————–ঃ নাসের কামাল

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

যখন গোধূলির সন্ধ্যাকাশে পাখিরা নীড়ে ফিরতে ব্যস্ত ।

যখন মানুষ শত ব্যস্ত থাকার পরও ঘরে ফিরে প্রাণের টানে । ঠিক তখন সে সময় যে কজন নিজের ঘর ছেড়ে বারবার বেরিয়ে গেছে তার মধ্যে একজন পরাণ । ওর ঘর ছেড়ে যাওয়া অভ‍্যেস ছিলো বহুকাল । বিশেষ করে ইন্ডিয়ানদের জানতো অনেক আগে থেকে । ট্রামে , বাসে ; ট্রেনে , টমটম ; স্পীড বোর্ড , লঞ্চ ; ঘোড়া , মানুষ ঠেলা গাড়ি ; হুন্ডা , বাইসাইকেল ; রিক্সা , মাইক্রো সবকিছুতেই চড়ে ঘুরে বেড়ানোর অভ‍্যেস ছিলো তাঁর । যাদবপুর বিশ্ব বিদ‍্যালয়ে ঘুরতে ঘুরতে পরাণের সঙ্গে এক ইংরেজী অনার্স First Year এর ছাত্রী ইভার সঙ্গে হঠাত্‍ করে গভীর সম্পর্ক হয়ে যায় । অতো দিনের সম্পর্ক এখনো অটুট রেখেছে । সেই সমকালীন মালদহ ইংলিশ বাজার থানা সংলগ্ন এক মারোয়ারীর ছেলে পালকি পালের সঙ্গে সেরকম ভাবেই হঠাত্‍ চেনাজানা হয়ে যায় । দীর্ঘদিন পত্রের সম্পর্ক চালিয়েছিলো । এখন নিয়মিত মোবাইল ও ফেসবুকে যোগাযোগ আছে । এই রকম শ’খানেক পুরনো সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছে পরাণ । সম্পর্ক একবার গড়ে গেলে সেটাকে পুরনো করতে কখনোই চাইতোনা । পুরোধা নতুন করে রাখতে স্বর্ণের মতো পালিস দিতেই থাকতো মাঝে মাঝে । তাছাড়া জাতির জাতীয় সার্থে সামগ্রীক পুরোধা দেখতে গিয়ে শেষে মরণপুরে অবস্থান নিতে হলো তাঁকে । একটু অগ্রগতি । আর একটু বাস্তবিক পথে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে চেয়েছিলো অন‍্যদেরও এবং সেই সঙ্গে একটু মরণপুরটাকে গুছিয়ে নিতে চেয়েছিলো হৃদয়ের টানে । গুছিয়ে নিতে পারলেই তবেই রহণপুরে ফিরতো সে । রহণপুরে ফিরেই ঢাকা রওনা দিতো । সেটা কবে নাগাদ হবে বলা মুশকিল ! শান্তনার বাবার সঙ্গে গত কাল মোবাইলে যোগাযোগ হয় পরাণের । সে বুঝেছে কি এমন কথা আছে ভীষণ তাগাদা দিয়ে বলেছে বারবার করে শান্তনার বাবা । এমন অনেক কটা বিষয় ভীড় জমে আছে মনের ভিতরে । সবটা বিষয় এখনো সিপুর কাছে প্রকাশ করা হয়নি । আজ অতি ভোরে কায়েলের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলো । মড়লের বাড়ি ছেড়ে খুব বেশি দূরত্ব না । কায়েলের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়লো টাপর দেয়া সেই কায়েলের গাড়িটাকে । দেখলো ছাড়া আছে ওর গলির সামনেই গাড়িটা । কাছাকাছি গিয়ে দেখলো গাড়ির ভিতর ঘুমাচ্ছে কায়েল । ওর ঘুম না ভাঙ্গিয়ে ওকে ক্রস করে হাঁটলো সম্মুখে তাল বনের দিকে । উঁচু তাল বনের কবর স্থানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো । দেখছিলো চারদিকটা চোখ ঘুরিয়ে । আর তাঁকে দেখছিলো কুয়াশা ভিজা চারদিকটার ধুঁধুঁ প্রান্তর । ভোরের মস্ত খোলা আকাশমন্ডল দেখছিলো মাথার উপর থেকে । ও ভাবছিলো এখানে নতুন কেউ একজন আজ চির নিদ্রায় শায়িত হবে । যে মরেছে তাঁকে চিকিৎসা না দিতে পারায় তাঁর অবসন্ন মনে কড়াঘাত্‍ করছিলো । তাঁকে অসম্মান করুক কেউ কখনোই চাইনি সে । তাঁকে তোয়াজ করুক সেটাও চাইনি । তবে কারণটা কি এমন প্রশ্নতো খুব স্বভাবত আসবেই ? তাঁর চিকিৎসা না নিয়ে রহণপুর পাঠালো কেনো ? কোন জ্ঞানে পাঠালো ? সেটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে তাঁর বুকের মধ্যে । ভাবছিলো ! নিশ্চয় এটাও এক ধরনের চক্রান্ত ! বেচারা পথেই গরুর গাড়িতে মারা গেছে । কায়েলের এই নিয়মিত ডিউটি । সে ডিউটি সম্পর্কে খুব বেশী সচেতন বলেই রাত্রেই রওনা দিয়েছিলো । রহণপুর মেডিকেলে যে কোনো অসুস্থ রোগীকে পৌঁছে দেয়ার কাজটি যথার্থই করে গেছে এতোদিন । আজ সারারাত্রী ওর উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে । কোনোদিন এসব ডিউটিতে কখনো অবহেলা করেনি । ঘুমাক । মন ভরে ঘুমিয়ে নিক । এমন সময় দেখলো । লাডুয়া ছুটে এসে পরাণ এর পাশে ঘেঁষে দাঁড়ালো । হাফপ্যান্টের সঙ্গে মোটা চাদর পড়ে আছে । লাডুয়ার দাঁত কটা চকচকে দেখতে । ছোট্ট গঠন । ও নাজুক প্রকৃতির স্বভাব ভারি চমত্‍কার লাগে ওকে । পরাণ এর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো । কোনো শব্দ না করেই দেখছিলো মাথা চেঁড়ে মাঝে মাঝে । ছোট বাচ্চা ছেলেদের এমনিতেই আদর আপ্যায়ন করতে পেলে সে ভীষণ সুখবোধ উপভোগ করে । লাডুয়ার চকচকে দাঁতের দিকে দেখে বিস্মিত অনেকটা যে কারণে ? ও নিয়মিত দাঁত পরিস্কার করেনা যদিও । তবুও ওর দাঁতগুলো চকচকে সুন্দর । ওর দিকে দেখতো সবাই বিশেষ করে ওর দাঁত কটার জন্য । সেও দেখছিলো লাডুয়াকে । লাডুয়ার হাত ধরে আদর এর মতো আসতে করে চিমটি কাটলো । ও শব্দ করে উঠলো ,
– লাকবেক !
– লাগে লাডুয়া ? পূনরায় চিমটালো ।
– না লাগবেক না ?
লাডুয়ার হাতে চকলেট পুড়ে দিলো কয়টা । লাডুয়া ফিরকির মতো দৌঁড় দিলো । ছুটে দৌঁড়ে গেলো গরু গাড়ির পাশ দিয়ে । একটা খেঁকশিয়াল হুহু করে দৌঁড়ালো কবরের দিকে । তাল গাছের দিকে গিয়ে আড়াল হয়ে গেলো নিমিষে ।
শীতের আকাশ ছুঁয়ে সারি-সারি মাঠের উপর দাঁড়িয়ে আছে তাল গাছগুলো । সেগলোকে ছাড়িয়ে মরণপুর গ্রামটি খুব ছোট্ট দেখালো । চোখের দৃশ্য পটে জন শূণ্য মনে হলো দেখে । ভোরের ফিকে আলোয় দুইজন লাঙ্গল ঘাড়ে গরু নিয়ে চলছিলো । হয়তো তাদের আগে অনেকেই মাঠে গিয়ে হাল বাইতে লেগে গেছে । পরাণ যে দুজনকে দেখলো হয়তো তারা দেরি করে ফেলেছে কোনো কারণ বিশেষে । হয়তো-বা মৃত্যুবরণের কারণও হতে পারে , হয়তো হবে ? চৈতালী ফসল বুনার জন্য মরণপুরে মানুষের তোড়জোড় ও খুব পীড়া পিড়ী চলছে এখন । সে খবরও আছে পরাণের কাছে । নবান্নের আনন্দ উত্‍সব করতে ওদের অনেক খড়কুটো পুড়াতে হয় এ সময় । মড়লের কাছে অতিরিক্ত সর্ষে দি‍য়ে বিনিময় করে নিতে হয় নবান্নের চাল । তারপরও লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সেই চাল সংগ্রহ করতে হয় । গোলা ঘরের সামনে এই নবান্নে নিরব একটা আনন্দের প্রতিক্ষা ক্রমাগত ছোট হতে থাকে । খোভ , দুঃখ ; ক্রোধ থাকার পরও অবশেষে সামান্য আনন্দটুকু মিশে যায় শত দুঃখের জোয়ারে । পায়েশ , ভাঁপা পিঠে ; খেঁজুর রস , তালের রস ; মুড়ি – মুড়কি । আরও কতো হরেক রকমের আইটেম এর খাবার নিজ নিজ ঘরে ঘরে মহা আনন্দ উত্‍সব করে থাকে ওরা । এই সব ভাবছিলো আর দেখছিলো । আকাশ । মাটি । দেখছিলো কেমন দিগন্তের শুভ্র রেখা একটু একটু দূর থেকে দূরে গিয়ে মিশে যাচ্ছিলো ।
চোখের ভূখণ্ডে দৃষ্টি ধাবিত হলে মরণপুরের সামনেটা প্রথমেই কেমন ঢুকে যায় ঝপাত করে । আর সামনেটা মানেই কায়েলের বাড়ি । তার উঠোন ছাড়িয়ে গ্রামের গলি পথ । মাটির চালা দিয়ে ঘর বাড়িগুলো বেশীরভাগ এবরো-থেবরো । শুধুমাত্র কায়েলের বাড়িটায় মাটি দিয়ে সুন্দর ল‍েপা আছে দেখা গেলো । ওর বাড়ি ছাড়িয়ে এল প্যাটার্ন একটা গলি রাস্তা । ওই গলি রাস্তার ধারে মরা বাড়ির বিক্রিত কান্নার ধ্বনি বাতাসে বাতাসে ভাসছিলো । সে কান্নার ক্রন্দন ধ্বনি বেদম প্রহার করছিলো পুরো গ্রামটায় । দু একটা করে মানুষের চলাচল শুরু হয়ে গেছে ভোর থেকে এরি মধ্যে । কিছু মেয়ে মানুষ সে দিকে উদ্দেশ্য করে চলেছে । দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য কেউ কেউ দৌঁড়াচ্ছেও । পাশাপাশি দুই মহিলা হেঁটে চলছিলো । ওদের মধ্যে একজন বয়স্ক মহিলা বলতে বলতে গেলো ,
– না বাঁচবেক কেউ । সাভায় মারবে মারাণপুরে ।
– হাঁহাঁ না বাঁচবেকরে কেউ ।
কায়েলের টাপর দেয়া গরুর গাড়ি ছাড়িয়ে ওরা হেঁটে গেলো । কায়েলের দু’টি সাদা গরু কাড়ি খাচ্ছিলো ক্লান্ত নয়নে । কায়েল টাপরের ভিতর বিভোর হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছিলো । কালাবতি হন্তদন্ত হয়ে এসে ডাক দিলো ,
– আরে লাডুয়ার বাপ ! এখুনকে মারা গাড়ি লিয়ে না ঘুমাবি তু । চান কারে লে । লিয়ে ঘুমা । ওঠ-ওঠ । বেলা না কারবি । ওঠরে লাডুয়ার বাপ ।
ঘুম ভেঙে উঠে যায় কায়েল । চোখ খোলে । ও দুহাত দিয়ে চোখ কচলায় । হাই তুলে গা মোচড় দিয়ে । এ পাশ ও পাশ করে হাই তুলে আরও বেশ কয়েকবার মোজা করে । শরীরের মোটা কাঁথা সরিয়ে উঠে বসে । গাড়ি থেকে বেড়িয়ে দূরে তাল বন কবরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পরাণকে । পরাণের জন্য ভাবছিলো । মড়ল কখন যে ওকে গিলে নিবে । কেউ জানবেও না । কায়েল মনে মনে মড়লকে খুব মুখ ভেঙচে ভর্তসনা করে খেঁউড় কাটলো । দিয়ে বাড়িতে ঢুকলো ।
কায়েলের বড় আঙ্গিনা । ভিতরে চারটা ঘর । বাহির মুখে একটি গরুর গয়াল ঘর । বাহির মুখে দরজা একটা । ভিতরে একটা । মুরগির জন্য ছোট্ট একটা খুল্লা । একটা খেঁজুর গাছ উঠোনের কোনায় । ওর লাগায় সানি খাওয়ানোর জন্য দু’টি বড় হাঁড়া মাটি উঁচু করে বাঁধানো আছে । কায়েলের ঘরের পাশে জোড়া করে দু’টো চুলা লেপে রেখেছে কালাবতি । গত দিনের জমানো ছাই তুলে ফেলছিলো ডালিতে । ছাই ওঠাতে ওঠাতে বিলাপের ঝংকারে বলে উঠলো ,
– না হবেক হামার মারোণ ! না হবেক হামার মারোণপুরে মাটি ! লুয়িশ মারে গ‍্যালো , বানচি মারে গ‍্যালো ; হামার না মারান আছে ? হামার মারোণ , না হবেক ক‍্যানে ? না হবেক ক‍্যানে ?
গরু দু’টোকে খেঁজুর গাছে বাঁধতে বাঁধতে কায়েল বলল ,
– না – ভাকভাক কারবি কালাবতি ।
– না কারবেক না ?
– না কারবি না । গুড়ার সানি গরুকে খায়ায়া – লে কালাবতি । হামার চিন্তা মারা লিয়ে আছে । তু ক‍্যানে কারবি ?
কথা কটা বলে কায়েল ঘরের ছাউনির নিচে বাঁশের খুটি ধরে বসলো । কালাবতি গয়াল ঘরের এর ঝাপ খুলে ছয় সাতটা ছাগল বের করে “, মুরগ – মুরগির ঝাপ খুলে ছড়িয়ে দিলো দু মুঠ গম । দিয়ে বলল ,
– তু মারার গাড়িতে ঘুমাইবিক ক‍্যানে , না বালিয়াছিনা ! মারার গাড়িতে না ঘুমাইবি না ? না শুনবিক তো হামার জান লিয়ে লিবি !
– না লিবেক না তুর জান । কালাবতি ! দিমাক ঠিক কারে লে আখুনো ? ঠিক লিয়ে বাত বুল কালাবতি —
প্রতি উত্তর না করে কালাবতি কোচা ঠিক করলো । হাত থেকে এরপর গমের পাত্রটি কায়েলের সম্মুখে রেখে হনহন করে ঢুকলো একটি ঘরে । লাডুয়া সে সময় অকস্মাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে দৌঁড় দিলো । কায়েলের বাসি মুখের থুথু চাকা করে , হাঁক থু করে উঠে দাঁড়ালো বাঁশের খুঁটি ধরে । একটি মুরগ ঠিক তখন বাক দিয়ে উঠলো , কক কো ও – ও —- কোক !
বেশ কিছু কবরের নতুন ঢিবি । সারি বেঁধে দশ বারটা তাল গাছ ছিলো ওইখানে । ওখানেই গাছের তলে বাতেন টুডুর কবর খুঁড়ে তৈরী করে রেখেছিলো কায়েলরা । ওখানেই কবর দিলো কায়েলরা বাতেন টুডুকে । তার আগে ওদের সব আনুষ্ঠানিকতা করলো রহণপুর মিশন থেকে আগত হাপরুম মাধ‍্যমে । বাইবেল পাঠ এবং লাশ কবরে নামার পূর্বে ” আশির্বাদ পানি ” লাশের গায়ে ছিটানো । যথার্থই করলো সব । এরপরই তোপাক দিয়ালে নির্দেশ পেয়ে লাশ নামালো ওরা । কবরে নামাবার পর ডের হাত নিচে বাঁশের ফাঁরাটি দিয়ে সাজিয়ে দিলো । তারপর হাপরুমের মাটি দেয়ার পর আর সকলে মাটি দিলো । সর্বশেষ যেটি করলো । প্রার্থনা । তারপর আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলো । হাপরুমের হঠাত্‍ করে এই আগমন না হলে এই আনুষ্ঠানিকতা আরো দুই দিন পিছিয়ে যেতো । বাতেন টুডুর মাটি হতো আরো দুই দিন পরে । রহণপুর মিশন গিয়ে ফাদার কর্তৃক অনুমতি নিয়ে এই হাপরুমকে কায়েল গিয়ে নিয়ে আনতো । হাপরুম মড়লের অনুমোদিত বার্তা প্রেরণে কায়েল গিয়ে নিয়ে এসেছে দুই দিন গত হয়ে গেলো । খুব সম্ভবত মড়লের মা ” মরবো মরবো হয়ে এসেছে‍‍ । পরাণও জানিয়ে দিয়েছে সম্ভব নয় বাঁচানো আর । অনেক বয়স হয়ে গেছে । সে জন্যই হয়তো-বা ? রহণপুরে পৌঁছে বাতেন টুডু মারা গেলে রহণপুর মিশনে গিয়ে সর্বপ্রথম তারা গির্জায় লাশ নিয়ে গিয়ে প্রার্থনা করতো । এরপর ফাদারের পরিবর্তে ফাদারেরই নির্দেশনা মতে হাপরুম মরণপুর এসে সব আনুষ্ঠানিকতা করতো । যা ইতিপূর্বে আর সকলের ক্ষেত্রে যেমনটি হয়েছে । ওদের ধর্মীয় প্রথা এইভাবেই মেনে এসেছে পূর্বপুরুষ থেকে । অনিয়ম হয়েছে ঝড় বৃষ্টি ও দূরবর্তী কারণে কখনো । তাছাড়া নয় ? তবে সেটাও খুবই কম । কায়েল হাতে একটা সাবল আর একটা খুন্তি ধরেছিলো । সমাধিস্থ স্থানে সকলের মধ্যেই গম্ভীর নিরব একটা আবহাওয়া বিরাজ করছিলো মনে মনে । এমন মনে হলো শোকাহত সবাই । গোল্ডেনের ছেলে হাতে একটা দা নিয়ে ” ও একটা বাঁশের অবশিষ্ট অংশ নিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে । মধু ” বাতেন টুডুর ছেলে ও বেশকিছু লোকজন কে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো । বাতেন টুডুর ষোল বছরের একটি মাত্র ছেলে । সে কাঁদছিলো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ওর আব্বার জন্য । ওকে শান্তনা দিচ্ছিলো মধুই । একটু অদূরে পথের ধারে দাঁড়িয়ে দেখছিলো আমির আলী এবং সিপু । সিপু বলল আমির আলীকে ,
– দেখেছো আমির ভাই । এ মানুষটার সম্পর্কে কেউ বলিনি পরাণ ভাইকে । বেচারা চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেলো । এটা পরাণ ভাই এখনো মেনে নিতেই পারছেনা । অতএব খুব হুঁশ বুদ্ধি করে চলো আমির ভাই । চোখ কান খুলে চলো । অতো সহজ ভেবে নিও না কোনোকিছুই ? এখনও কতো কি অজানা আছে আমাদের । ভাবছি যখন । সত‍্যি আমির ভাই । মাথা চক্কর দিয়ে উঠছে ।
– খালি হামাকে জ্ঞান দিছো তোমরা ! হামার মাথাটাকেই খায়‍্যা লিব‍্যা
দেখছি ?
– বিড়ি খাওয়া কমাও । আমির ভাই তোমাকে নিয়ে সত‍্যি চিন্তায় আছি !
– কি করবো ঠিক কইরা কহোতো ? তুমিই কহো । ঘনো ঘনো খাছি সে ল‍্যাগা হামার পিছে ল‍্যাগা গ‍্যালা ? দেখো , তুমি হামার পাতার বিড়ি ছাড়াতে প‍্যাইড়ব‍্যানা তোমাকে কোহ‍্যাদিনু ।
– এখন চুপো । চুপ করো আমির ভাই !
– তুমি বুদ্ধি কইরা মড়লের বাড়িতে হামাকে ঠেলা দিল‍্যা ।
– পরাণ ভাই তোমাকে নিয়েছে আমির ভাই । বিশ্বাস করো । তোমার ব্যাপারে আমি কিছুই বলিনি ?
– তুমি ভ‍্যাবল‍্যানা ? হামার দিক থ‍্যাইকা একটু কহিলেকি তোমার গা ক‍্যাট‍্যা য‍্যাতো ? কহিত‍্যা না হইলে একটু ?
– থামো , থামো – থামো আমির ভাই । ওরা আসছে ।
মধু বাতেন টুডুর ছেলেকে নিয়ে সিপুদের দিকে এগিয়ে গেলো । ওদের পিছনে এবং সামনে বেশ কিছু মানুষ বাড়ি ফেরার জন্য এগিয়ে যেতে লাগলো । সিপুরাও ধিরে ধিরে হাঁটছিলো কায়েলের বাড়ির দিকে । কায়েলের ছেলে , লাডুয়ার ” একটা স্পেশাল দল আছে । সে দলের ছয় জন সমবয়সীকে নিয়ে সে দৌঁড়ে গ্রামের দিকে ছুটে গেলো । সিপু কায়েলের বাড়িতে গিয়ে উঠবে । আমির আলী পরাণের কাছে চলে যাবে । এই সময়ের মধ্যে সিপু গুছিয়ে নিচ্ছিলো । আমির আলীর মাধ্যমে তথ‍্য প্রেরনের জন্য ঠিক করা যে সমস্ত তথ‍্য । সেসব তথ‍্য ওকে যেতে যেতে বুঝিয়ে সব বলে দিলো যথার্থ । তথ‍্য আদান প্রদানের জন্য আমির আলী বিড়ি ফুঁকতে বাইরে বের হয় । এই কারণে ওকে কাজে লাগছে এখন ভীষণভাবে । ওর বহুমূত্রোর মতো বিড়ির নেশা । খাও , খাওনা ? কতো বিড়ি খেতে পরো তুমি । সিপু মনে মনে ভাবছিলো । পরাণকে কেউ যদি রাজি করাতে পারতো ? তবে ওর জন্য সিপুই দুই মুনা বস্তায় । বস্তা ভর্তি ইন্ডিয়ান পাতার বিড়ি নিয়ে স্টকে রাখতো । যখন এই কথাগুলো সিপু ভাবছিলো তখন আকাশ ভর্তি রোদ্দুর । শীতের পিঠে চাদর পড়িয়ে দিচ্ছিলো রৌদ্রস্নান গগনপট । ধুঁধুঁ মাঠের বুকে রৌদ্রের এই অট্টহাসি দেখে উষ্ণ আনন্দে প্রত‍্যেকে আরাম বোধ করছিলো । দেখেই মনে হচ্ছিলো । সবাই নিজের মতো রৌদ্রের উত্তাপ গ্রহণ করতে তৃপ্তি ভোগ করছে । চাদর মুড়ি দেয়া মুখগুলো বরং এখন গা থেকেই খুলে খুলে ফেলছে মোটা মোটা ” সেসব চাদর । মুখ ঢাকাতো দূরের কথা ! কেউ কেউ উদোম গায়েও রৌদ্রের উত্তাপ নিলো । এরি মধ্যে আমির আলী বিড়ি ধরিয়ে ফেলেছে । হণহণ করে হাঁটছে । ওর সঙ্গে হেঁটে ওর সাথ ধরা আর সিপুর পক্ষে সম্ভব হলো না । সিপুর নাগালের বাইরে গ্রামে ঢুকতে কায়েলের বাড়ি ছাড়িয়ে চলে গেলো আরও ভিতর দিকে গ্রামের । তখন আমির আলীকে আর দেখতে পাওয়া গেলো না ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *