December 13, 2016

পরাণ ভাই । PART- 19 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART- 19

 

———————–ঃ নাসের কামাল

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

শীতের সকাল । শালের একটা চাদর পড়ে বেরুলো পরাণ ।

কাসমেরি ঘিয়ে কালারের চাদর । কদিন ধরে শৈত প্রবাহিত আবহাওয়া চলে যাচ্ছে ভীষণভাবে মরণপুরের উপর দিয়ে । ইদানিং যে যার মতো মরণপুরে ঘুরছে । সিপু আমির আলীর সঙ্গে বেরিয়েছে । মধু তার ইচ্ছে মতো চারদিক গুছিয়ে ফেলছে গোল্ডেনের ছেলে ও লাডুয়াকে নিয়ে । পরিকল্পনার বাইরে কোনো একটি কাজ হচ্ছেনা । আর ইচ্ছে করে করবেও না কেউ । করছেওনা । তার প্রমাণও দিতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত পরাণকে । ওদেরকে নিয়ে ইতি মধ্যে প্রায় শ’খানেক নিম মেহগনী গাছ মরণপুরের চতুর্দিক ঘিরে লাগিয়ে ফেলেছে । আরও দুইশ উই ক্লেপটাস ও আকাশ মুনির গাছ লাগাতে এখনো বাকি আছে । খুব সাবধান আর সতর্কতার সঙ্গে সবকিছু করছে ওরা । চটের বস্তায় লুকিয়ে এনেছিলো অতি ক্ষুদ্র ছোট ছোট সাইজের চারা গাছ । ধূরির নিচে সেট করেছিলো বুদ্ধি করে । মরণপুরে খুব বেশী গরু ছাগল নেই বলেই আশা করা যায় সবকিছুই সম্ভব । পনের দিন নিয়মিত পানি দিলে খুব সম্ভবনা গাছ গুলো দ্রুত সতেজ হয়ে উঠবে এবং গোপন পাহারাদার নিয়োগ দিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সহজ হবে সবকিছুই । প্রায় দশ জন শিক্ষার্থীকে মধুর তত্বাবধানে রেখে দেয়া হয়েছে । যারা নিয়মিত ভাবে সিপুর কাছে ইতিমধ্যে পড়ালিখা শিখছে । তার মধ্যে গোল্ডেনের ছেলে । লাডুয়া । কালাবতিও আছে । গোল্ডেনের গলির মাথায় কায়েলের বাড়ী । খুব বেশী দূর ছাড়াছাড়ি না ওদের বাড়ী । কায়েলের উঠোনের যায়গাটি বেশ বড়সড় । সেই উঠোনের অদূরে বেশ বড় ফাঁক জুড়ে সুন্দর করে মাটি দিয়ে ল‍েপে রেখেছে একটি যায়গা । সেখানে বসে পিত্তিচাঁদ বাঁশের ডালি বুনছে নিত্যদিনের মতো । তার সামনে কায়েলের বাঁধা আছে দু’টি সাদা স্বাস্থবান বলোদ । লোভনীয় বলোদ দু’টি । পিত্তচাঁদ মাঝে মাঝে বলোদ দু’টিকে দেখতো নিত্য নৈমিত্তিক একটু অন্যরকম ভাবে । আজকেও দেখলো । বলোদ দু’টি জাবর কাটছিলো । বলোদ দু’টির একটু দূরে লাডুয়া তার সম বয়সী পাঁচজনকে নিয়ে মিলেমিশে খেলছিলো ডান্ঠা ফুরতি । একজন বারি দুরি তিলিয়া চাউরি শুতেক বলে তাকালো পরাণকে । লাডুয়া দৌড়ে গেলো পরাণের দিকে । ওর দেখাদেখি প্রেত‍্যেকেই দৌড় দিলো তার পিছুপিছু । পরাণ তাঁর পকেট থেকে বের করে বেশ দামী কিছু চকলেট দিলো লাডুয়ার হাতে । তারা দ্রুত ভাগাভাগি করে নিলো নিজেদের মধ্যে । প্রত‍্যেকেই লাফাতে লাফাতে গিয়ে আগের মতো আবারো খেলতে লাগলো । ওদের সেই শখ‍্যতা দেখে পরাণ কিছুক্ষণ ওদের খেলাধুলার দিকে উদাসীন থাকলো । মনে মনে ভাবলো তুর্কিবিদ কামাল পাশা , মাহাতির মোহাম্মদ ; ভাবলো কলম্বাসের বিতর্কিত জীবনের ইতিহাস । হিটলার, লেনীন ; কাল মার্কস , এ‍্যাঙ্গেলস এমন অনেক জীবনীর বৃত্তান্ত খুঁড়ছিলো ভিতর ভিতর । আর রোপণ করছিলো তারি মধ্যের ভালো ভালো কিছু কিছু বীচ মরণপুরে । অর্থনীতি নিয়ে ভাবছিলো । অর্থনীতির সম বন্টন সম্পর্কে ভাবছিলো । ইসলামী অনুশাসন ব্যবস্থা সহ সাম‍্য ও ধনতন্ত্র মিলে সবকিছুই । এবং সবকিছুর মূলে অর্থনীতির কাছে মাথা না নুয়ানো ছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিলো না খোলা । এই ভেবেই প্রাথমিকভাবে বেছে নি‍তে হয়েছিলো বর্তমানের এই সব ব্যবস্থা । কুটির শিল্পের একটা আলো ছায়া মনের মধ্যে ভীষণ রকম প্রভাব ফেলছিলো যা চোখ দিয়ে তুলে আনতে ভীষণভাবে চেস্টা করেছিলো পরাণকে । পরাণ ভাবছিলো তাঁর দু’টো হাত – দু’টো পা আজ খোলা । স্বাধীন ডানা মুক্ত পাখির মতো একটি মন । একটা ভালোর মধ্যে অমিত আলো । ভালোর মধ্যেই থাকা ভালো । ভাবছিলো একটা সত‍্যের মধ্যে অগনিত নীতি । সেই নীতির মধ্যে প্রতি মুহুর্তেই ভীতি । ভাবছিলো কঠিন পথ তখনই সহজ হয় । যখন সহজ পথে প্রতিবন্ধকা সৃষ্টি হয় । এই সমস্ত আদর্শ তিলতিল করে গড়েছে পরাণ । তাই কঠিন পথ ধরে হেঁটে চলতে কখনোই ভয় করেনি সে । আজও তাই দূর্বোধ্য চ্যালেঞ্জের সব মোকাবিলা করে দাঁড়িয়ে আছে । চিনের প্রাচীরের মতো বুকটাকে সে নিজে নিজেও দেখতো মাঝে মাঝে কখনো কখনো । কায়েলের শব্দে ঘোর কেটে তাকালো পরাণ ।
– ডাক্তার !
– কায়েলদা কি খবর ?
– তুর বউদির লিগে চাল লিবেক হামি । নবান্নের পিঠা খাবিকনেরে তু ? মড়লের চাল লিতে গেনু হামি ডাক্তার । কায়েলের মাথায় বেশ ওজনসই বস্তা দেখতে দেখতে বলল ,
– আসার সময় মড়লের গলিতে মানুষের ভীষণ ভীড় দেখলাম কায়েলদা ।
– নবান্নের চাল লিবেক না ? চাল না লিবেক তো খাবে কি ? আঁ ? হামি চালে গেনু ডাক্তার ।
একটা বস্তা ভর্তি কি মাথায় নিয়ে কায়েল মড়লের বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো হেলে দুলে । পরাণও পিত্তি চাঁদের দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো ওকে ,
– দাদা কেমন আছেন ?
– ইনদো মজগি মিনেঞা ।
– বুঝলাম না ।
– হামি ভালা আছিরে ।
– এইবার বুঝলাম । আচ্ছা দাদা , সবাইকে দেখলাম মড়লের বাড়ির সামনে । আসলে আজকের ব্যাপারটা কি ? খুব বড়সড় একটা সরগরম মনে হলো দেখে ?
– হামাদের ম‍্যালা । হামাদের আনান্দা ।
নবান্নের বিহা ল‍্যাগবেক আইজ থিকে । রাইতে মড়লের গালিতে গানা লিয়ে নাইচে মাজা লিবেক সাভায় ।
– দারুণ ব‍্যাপারতো !
– মড়ল সাভাইকে নাবান্নের চাল দিবেক আইজ ডাক্তার ।
– ফ্রি দিবে ? মানে এমনি এমনি দিবে দাদা ?
বলেই পিত্তি চাঁদের প্রতি লক্ষ করলো । পিত্তিচাঁদ রাগান্নিত হয়ে বড় বড় দুই চোখ মেলে দেখলো । পরাণ এই পরিবর্তন দেখলো তত্‍ক্ষনাত্‍ । পরবর্তিতে আর এ বিষয়ে পরাণ ঘাটলো না পিত্তি চাঁদকে । পরাণ জানতো সবকিছুই তারপরও বেখেয়ালে বেরিয়ে এসেছে ঝোঁকের মাথায় । মনে মনে নিমগ্ন হয়ে কতোক্ষণ ভাবলো । বেরুনোর উদ্দেশ্যে পরিবর্তন করলো তখনই পুরোদমে । তারপর মড়লের বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরলো আবারও । ধীরে ধীরে পা ফেলে এগিয়ে গেলো সেই দিকে । তখন স্পষ্ট মনে পড়লো মধু বলেছিলো নবান্নের উত্‍সবে মড়লের লুটপাট । ওর মুনাফার বেহিসেবি ধামাকা । ধামার ডাবল ওজন সর্ষে নিয়ে বিনিময়ে এক ধামা নবান্নের চাল বুঝিয়ে দিতো ওদেরকে । মধুর সেসব কথা পূনরায় মনে পড়লো । মোড় ঘুরে পরাণ গোলা ঘরের সামনের দিকে এগিয়ে গেলো । পরাণকে দূর থেকে মড়ল লক্ষ করলো লম্বা লম্বি ভাবে । বহুদিনের গল্পের চোখে এই মুহুর্তে ভাসা ভাসা সেই দৃশ্য জীবন্ত হয়ে উঠলো । দেখলো লাইন দিয়ে ছেলে মেয়ে মিলে মিলেমিশে অদল – বদল করে নিচ্ছে ওদের সর্ষের সঙ্গে চাল । একটি মাত্র ধামা । ওটার ওজন করে এক ধামা দিচ্ছে এবং ওটার বদলে দুই ধামার একটু বেশীই বরং নিয়ে নিচ্ছে জোড় করে । ইচ্ছে মতো যা মনে হচ্ছে করছে । বাঁধা নিষেধ দিবে এমন কেউ নেই । আশাও করেনা । মড়লের লাঠিয়াল বাহিনী সার্বক্ষনিক প্রস্তুত ছিলো পনেরো থেকে ষোল জন ওখানে । এখানে নবান্নের চাল নিতে অনেক সময় বাধ‍্য হয়ে আসতে হয় কুমারীদের । যে ঘরে মেয়ে সন্তান ছাড়া তার আর কোনো সন্তান নেই । সে পরিবারকে বাধ‍্যতা মূলক পাঠাতে হয় নবান্নের চাল নিতে । তানা হলে মড়ল নিজের অধীনস্থ করে নিবে বাধ‍্যতামূলক ওই কুমারীকে । মড়লের এই প্রথা নিয়মিত এই মরণপুরে চালু আছে এখনো । বলেই অনেক কিশোরীকে দেখা গেলো লাইনে দাঁড়িয়ে আছে । এক যুবক লাইন থেকে একটু বিচ্যুতি করেছে এই করণে ওকে এমন ধলাই দিলো ধরে । ওর চিত্‍কার চেচামেচিতে দেখলামনা একটু কর্ণপাত করলো কেউ । ওর পক্ষে উঠে দাঁড়ানো সম্ভব হলোনা বলে মাটিতে পড়ে রইলো মরার মতো । গোল কেন্নার মতো ঠান্ডায় ব‍্যথায় জড়সড় হয়ে মাটিতে পড়েছিলো গোল হয়ে । একজন অল্প বয়সী সুন্দর কিশোরী মেয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলো । ওকে মড়ল নিজে হাত ধরে আসতে করে টেনে ভিতরে নিয়ে চলে গেলো । কিশোরী মেয়েটি অনেকের মধ্যে সুন্দর দেখতে ছিলো বোধহয় । সে ভয়ে লজ্জায় নিশ্চুপ হেঁটে গেলো । পিছনে ঘার ঘুরিয়ে দেখতে চেস্টা করছিলো যদিও । কিন্তু ব্যর্থ প্রয়াস । ঘাড় ঘুরাতে গিয়েও আর দেখলোনা ফিরে । অবশ্রান্ত নিরব হয়ে গেছিলো কিশোরীর আক্রান মন । তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব ছিলোনা । এই সময় একটু ব্যতিক্রম লক্ষ করা গেলো । সামান্য প্রতিক্রিয়া সবার মধ্যে লক্ষ করা গেলো । সেটাও খুবই সামান‍্য । সবাই দেখেছিলো মড়লের প্রস্থান মুখে । চাল নেয়া বন্ধ ছিলো ততক্ষণ । ধামার ওজন থেমে গেছিলো হঠাত্‍ করে । ধামার ওজনের সামনে চাল না নিয়ে যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিলো । তার দিকে তেড়ে পাঁচজন লাঠিয়াল হঠাত্‍ ছুটে গেলো । মুহুর্তের মধ্যে ওকে ধরে ছ‍্যাঁচড়ে এনে পূর্বের কায়দায় বেদম ধোলাই দিলো একেও । মাঝ বয়সী বেচারা আচ্ছাসে ধোলাই খেয়ে সে মাটির সঙ্গে গড়াগড়ি খেলো । কেউ ধরতে গেলো না । দুজনই মরা কুর্তা বিড়ালের মতো পড়ে রইলো পাশাপাশি মাটিতে । এই দৃশ্য দেখার পর পরাণের মেজাজ ঠিক ছিলোনা । ঠিক থাকার কথাও না । ওর শুধু মাথার মধ্যে একটা কথাই প্রথমে মনে এলো । ওরা দুজন দুজনকে এক নজর দেখেছে । মড়ল সেই ক্ষেত্রে কি ভাবলো তার যাই আসেনা । কিন্তু মধু , গোল্ডেনের ছেলে ও বাতেনের ছেলে পরাণের চোখের দিকে গভীর প্রত‍্যাশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলো তাদের তাকানোর উত্তর তাঁর কাছে সে মুহূর্তে ছিলোনা । সেখান থেকে আসতে করে সড়ে পড়ে এমন কিছুই ভাবছিলো পরাণ । কায়েল বস্তা মাথায় কাছে এসে চোখের ইসারা করলো সড়ে যেতে । এরপর আর দাঁড়ালোনা । অন‍্যদের মতো চাল মাথায় নিয়ে সেও চলে গেলো । কায়েলের মাথার বস্তাটা খুব লক্ষ করে দেখলো । আয়োতনে ছোট হয়েগেছে । পরাণের চোখটা বড় হয়ে গেলো দেখে । শেষ পর্যন্ত দেখলো কায়েলকে । দেখে থাকলো তার ছোট বস্তাটার দিকে এবং তার ইঙ্গিতের দিকটাও ভেবে দেখছিলো ভীষণভাবে । ও কি বুঝিয়ে গেলো ?
পরাণ নিভৃতে চলে গেলো । মনটা আজ ভীষণভাবে খারাপ ওর । মন খারাপ হলেই চলে যায় নদীর পাড়ে । সিপুকে রিং করে ডেকে নেয় । সিপুর সঙ্গে একাগ্র চিত্তে মন খোলে গল্প করে দীর্ঘ সময় । আজও তাই করলো । ওরা দুজন নদীর পাড়ে বসে গল্প করছিলো । সিপুই বলল প্রথমে ,
– তোমাকে আগেও বলেছি পরাণ ভাই । আজকেও বলবো । এ সব বাংলাদেশ সরকার দেখবে । এদের অর্থনীতি । এদের সংস্কৃতি তুমি আমি ভাবছি । আমরা কেনো ভাববো ? এ রকম কতো মেয়ে মানুষের সর্বনাশ করেছে ! তুমি জানো ? স্বামী হারা মেয়ে মানুষ পেলেই মড়ল ফুর্তি করে । তুমি জানো পরাণ ভাই , মড়লের একটা পাগল ছেলে আছে । সে কি করে ? তাকেও রীতিমতো ভোগ দিতে হয় মেয়ে মানুষ । আর এই সব তথ্য সংগ্রহ করে দেয় এই মরণপুরেরই মানুষ । এই মরণপুরে কতো কিসিমের যে মানুষ আছে মাথায় নষ্ট !
– সিপু । তোর গাছ লাগানোর খবর বল ? আর কতো দূর বাকি ?
– কালকের মধ্যে শেষ করে ফেলবো ।
কটা পাইকড় ও বট গাছ থেকে গেছে । সেগলোকে ভাবছি উত্তর পাড়ার দিকে লাগিয়ে দিবো । সম্ভবত ইউক্লেপটাস ও আকাশ মনিও কিছু লাগাতে বাকি আছে ।
– দ্রুত শেষ কর ? শেষ করে ফ‍্যাল ?
– তোমাকে একটা কথা বলবো পরাণ ভাই ।
– সব আলোচনা খোলামেলা করবো বলেই তো এখানে চলে এসেছি । তোর মনে যা ভালো লাগে বল ?
– চলো আমরা ফিরে যায় ।
– রহণপুর ?
– হ‍্যাঁ !
– তুই একটা গর্ধোপ সিপু ।
– বলো তোমার মুখে যা আসে । তারপরও বলবো তুমি ভুল করছো ! জাতি গত পার্থক্য করলে কোনো হিসেবেই পরেণা , যাদের জন্য এতো করছো তুমি ?
– এইতো বোকার মতো বকতে লেগে গেলি । তুই ভাবছিস একটা গোষ্ঠীকে নিয়ে । ভাবলে ভাব জাতিকে নিয়েওনা ? পৃথিবীর সমস্ত মানুষগুলোকে নিয়ে ভাব । সমষ্টিগত ভাব ।
– তুমিও আবোলতাবোল বকছো । তুমিই কেনো একা ভাববে ? তোমার কি দায় পরেছে ? এগলো লস আইটেম পরাণ ভাই ।
– কোনগুলো প্রফিটিবুল বলতো তুই ?
সিপু নিরুত্তর নিরব রইলো । পরাণও কতোক্ষণ কথা না বলে নদীর দিকে দেখে দেখে সময় কাটালো । সিপু এক সময় বলল ,
– মেয়েটার কি হবে এখন ?
পরাণ কিছুই বললোনা । সিপু পূণরায় বলল ,
– আমার ডিস্টার্ব হচ্ছে পরাণ ভাই । কালাবতিকে নিয়ে আমি সত্যি যন্ত্রণায় আছি । এ কি রকম যন্ত্রণা কায়েলদার এখানে টেনেস্ফার হও বুঝবে কেমন যন্ত্রণা ?
– কায়েলদা কালকে মনি হমিওপ‍্যাথি ডাক্তারকে আনতে যাবে রহণপুর । মড়লের বউ এর বাচ্চা হচ্ছেনা । এই কাজের রেজাল্টের উপর আমাদের সবকিছুই নির্ভর করছে এখন । এর আগে তোদের কোনো কথাই আমার কানে এখন ঢুকবেনা ।
– আজ রাত্রে নবান্নের উত্‍সব করবে । নাচ গান করবে ওরা ।
– ওদের উত্‍সবে আমরাও থাকবো । মড়ল নিজে দাওয়াত দিয়েছে
আমাদের । মধুর কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত ভুল হয়নি । এই গ্রামে মুসলমান হিন্দুর সংখ্যা খুবই সামান্য । খ্রিষ্টানদের দশ থেকে বারটা ঘর বাদে সবাই সাঁওতাল । এখানে সংখ্যায় সাঁওতালী বেশী । তুই কি বলিস ?
– মধুকে এ জন্য ধন্যবাদ । তুমি যদি এখান থেকে কখনো ফিরে যাও ধরে নিবে মধুর জন্যই সেটা সম্ভব ।
– শুন তোকে একটা আগাম গোপন ইনফরমেশন দিয়ে রাখি । মড়লের বাড়ির ভিতরে বেশ কিছু মানুষ বন্দী অবস্থায় আছে । বেশীই ডাক্তার !
– এ খবর আগে বলোনিতো তুমি ?
– গতো রাত্রে আবিস্কার করলাম !
– তাহলে এখন কি ভাবছো ?
– এখন মড়লের বউ এর বন্ধ‍্যাত্বের কারণে ? না অন‍্য কোনো কারণে এখনো বের করতে পারিনি ।
– ধরো মড়লের বউ এর বাচ্চা হলোনা । তখন তোমার কি হবে ?
– যা হবার হবে । মুনির রেকর্ড সম্পর্কে তোর ধারনা নেই । ওর হমিওতে কিডনির পাথর পর্যন্ত বের করে দিয়েছে । বন্ধ‍্যাত্ব থেকে আনেকেই গর্ভবতী হয়েছে তার প্রমাণ আমি নিজে সিপু ।
– তুমি যা বলছো তাই করছি । তারপরও বলবো একটু ভেবে চিন্তে সবকিছু করো । একবার স্লিপ করলে কিন্তু কেউ
বাঁচবোনা এখানে । এ জন্যই বলছি । আমাদের কথা বাদই দিলাম । কিন্তু তোমাকে বাঁচতে হবে । তোমাকে দীর্ঘদিন বাঁচতে হবে পরাণ ভাই । বারবার বলছি । এ জন্য তোমাকে খারাপও লাগছে
হয়তো-বা ।
– বলনা , তুই তো বলবি ?
– তোমাকে কোনোদিন বলিনি । আচ্ছা পরাণ ভাই এখনো তুমি বিয়ে করলেনা কেনো ?
– বিয়ে নিয়ে মাতার সময় অনেক আছে সিপু । শুন । এখন থেকে যাযা করতে হবে বলছি শুন । পরাণ দীর্ঘ সময় ধরে গল্প-উপন্যাস এর মতো করে সিপুকে বুঝিয়ে দিলো জীবনটা কি ? আর বাস্তব জীবনটা কি ? সিপু শুধু মাথা ঝুকিয়ে গেলো । চারিদিকের নিস্তব্ধতা ঘিরে রাখলো ওদেরকে । ইন্ডিয়ানদের নদীর উপকূলে একজন শাড়ী পড়া মহিলা নেমে আসলো কলস নিয়ে পানি নিতে । একটা ডিঙি নৌকা নিয়ে একজন ইন্ডিয়ান মাছ ধরছিলো । একজন মধ‍্য বয়সী পুরুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলো সে মহিলার সর্বাঙ্গের সৌন্দর্য । সিপু মাটি খুঁড়ে খুঁটিয়ে তুলছিলো আংগুল দিয়ে । পরাণ চুপচাপ দেখেছিলো উত্‍ভ্রান্তের মতো এদিক সেদিক । তারপর আবার বলতে শুরু করলো ,
– একটা মানুষের ভিতরের ছবি আবারও জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে , তার স্মৃতিতে এমনো হতে পারে তার স্মৃতিময় জীবনটা এখন হয়তো একটা বিড়ম্বনা ? সময়ের দাবি রেখে হয়তো বদলেও যেতে পারে , হয়তো-বা স্মৃতিটাই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে , এমনো হতে পারে ? তোকে বলে রাখছি সিপু । তুই বেঁচে থাকলে দেখবি এই মরণপুর একদিন এই মরণপুর থাকবেনা । এই মরণপুরের স্মৃতি নিয়ে একদিন কেউ কেউ তোর আমার সামনে গর্ব করবে । মাথা উঁচু করে একদিন ওরাই কথা বলবে আগে । সেদিন তোকে আমাকে লাগবেনা ।
– বুঝেছি । তুমি আমার কথাতে কষ্ট পেয়েছো ?
– চল । উঠা যাক ।
– মেয়েটার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নাও । তুমি যেমন বলবে । মরলে মরবো । কিন্তু নিরব মুখ বুজে আর থাকতে পারবোনা । খুবই বরিং লাগছে ! আর ভালোই লাগছেনা পরাণ ভাই ।
– তোকে নিয়ে সমস্যা । এই হলো
তোর দোষ ।
– একটা কিছু করো ? এই রকম করে আর কতদিন ?
– আমরা চুপচাপ তো কেউ বসে নেই !
– অগ্রগতি কি আমি ঠিক বিঝছিও না ?
– চারিদিকে মেরে তুষারপাত করে দিচ্ছিলো তখনো রাশিয়ানরা চুপ ছিলো । একদম চুপ ছিলো । কিন্তু এর মধ্যে ভিতর ভিতর ওরা ঠিকই ওদের ডিফেন্স সাজিয়ে ফেলেছিলো । রণ নীতিতে ডিফেন্সই মেন শক্তি সিপু । আমাদেরও ডিফেন্সটা শক্ত করতে হবে । ডিফেন্স ঠিক না করতে পারলে ততদিন কিচ্ছু করতে পারবিনা ।
যতোদিন ওদের পড়াচ্ছিস শিখাচ্ছিস । খুব ভালো । দায়িত্বের সঙ্গে নিষ্ঠার সঙ্গে কর । কুটির শিল্প থেকে কৃষি বান্ধব এবং একাধিক ফসল ফলানোর নিয়মকানুন দ্রুত শিখিয়ে পড়িয়ে নে । খুব ভলো । কিন্তু মাথা থেকে মূল মন্ত্রটা ঝেড়ে ফেলবিনা । কক্ষণোনা ? সেটা কি ? সেটা হলো নিজেদের অবস্থান । নিজেদের পূর্ব পরিকল্পনা এবং তার সঙ্গে মড়লের একক ছত্র । একক ছত্রের সামন্ত প্রথা কতো হিংস্র বর্বরতার রুপ নিতে পারে – সামন্তরা কি সাংঘাতিক তুই না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবিনা । সেটা আমি আজ নিজের চোখে দেখেছি সিপু ।
– আমি সেটাই শুনছিলাম এমন সময় তুমি রিং দিলে । কা‍য়েলদার কাছে প্রথম এই খবরটাই পেলাম ।
– বংশের টান । বংশের পরম্পরা একটা অকৃত্রিম সম্পর্ক যুগযুগ থেকে হয়ে আসছে । সেই সম্পর্কের শিকড়ে এতোদিন পর মড়লের ছেঁকা লেগেছে ! মড়ল বাবা হতে চাই ।
– মড়লের পাগল ছেলে বলে যাকে জানি ও তাহলে কে ?
– না । ওটা গল্পের মতো একটা নাটক সাজানো হয়েছে মাত্র । তুই ভুল জানিস । তোর মতো অনেকেই জানেনা আসল সত‍্যটা কি !
– কি বলছো তুমি ?
– ই‍য়েস । মড়লের বউকে আমি পরীক্ষা করেছি । আর মড়লকেও আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি । আমার পক্ষে অসম্ভব । রহণপুর বড় বাজারের হোমিও মুনি ডাক্তারকে চিনিসতো ? একটু আগে যার কথা বললাম তোকে ।
– খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের ও । মুনিকে চিনি পরাণ ভাই । কিডনীর পাথর অনেকেরই তো বেড় করে দিয়েছে তুমি বললে । কিন্তু আমি নিজেও জানি । অল্প বয়স করে । এখনো ভালো করে সবাই চিনেনা ঠিক মতো ওকে ।
– হুহু । ওরিই কথা বলছি । ওর নাম মড়লকে জানিয়ে বলেছি , ওর সঙ্গে যোগাযোগ করেণ । কাজ হয়ে যাবে । আর কা‍য়েলদা কাল রহণপুর যাচ্ছে ঘটা করে সে জন্যেই ।
একটু থেমে । ওঠ । বলেই পরাণ উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করলো । সিপুও সঙ্গে সঙ্গে উঠে সঙ্গতি রেখে হাঁটছিলো । মরণপুরের দিকে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল নিরবে দুজন । পরাণ মুখ খুললো ,
– মরণপুরের সঙ্গে যোগাযোগটা যেভাবেই হোক রহণপুরের ঘটাতে হবে । কদিন থেকে এই কারণে ঘুমাতেই পারছিনা । ঘুম আসেনা । হিজিবিজি চিন্তা আর চিন্তা । এতো পরিকল্পনা করছি । এতো অংক কশছি । নাহঃ মিলেনা । শেষে দেখছি । সব নেটওয়ার্কে ফেল মারছে ? শুন । বিদ্যুৎ আর যোগাযোগ ব্যবস্থা যতোদিন না করতে পারছি কোনোকিছুই করা সম্ভব না এখানে ।
– এখানে সত‍্যি সম্ভব না । রহণপুরে যা ইচ্ছে করেছো পেরেছো । ওয়েব সাইটে যাযা পোস্টিং দিবে আজকের মধ্যেই দিয়ে নিও পরাণ ভাই । মোবাইল এর চার্জার ব‍্যাটরীও আজ কালের মধ্যে জবাব দিয়ে দিবে । তখন মরণপুরের মতো আমরাও মরা ! মরে যাবো
একদম ।
– ভয়ঙ্কর ! সত‍্যি । যমুনা সেতু কতো কিছুর বিড়ম্বনা ঘুচিয়েছে আমাদের । উত্তর বঙ্গে , এই মরণপুরের মতো সেম দশা তখন । তখন আমরা মরণপুরের মতোই অন্ধকারে হাবুডুবু খেয়েছি । তখন অর্থনীতি , শিক্ষা ; শিল্প , সংস্কৃতিতে ভীষণভাবে পিছিয়ে ছিলো রহণপুর । মরণপুরে ঢুকবার পর ওই দিনগুলোর কথা এখন যখন ভাবছি । নাহঃ সিপু ভেঙে পড়ছি । মনে হচ্ছে এতো দিনে সব অন্ধকার থমথম করছে যেন চারিদিকে ।
– তুমি বেশী বেশী ভাবছো তাই ?
– তুই সাহস দিবি । মাঝে মাঝেই আমাকে সাহস দিবি ।
– তুমি হতাশায় ফেলে দিচ্ছ পরাণ ভাই ।
– তাইরে ! এতদিনে আমার হলোটা কি ?
– তখন তোমাকে ওইভাবে বলাই উচিত হয়নি আমার । সত‍্যিই বড় ভুল হয়েগেছে পরাণ ভাই । তখন থেকেই তুমি আপসেট হয়ে আছো । আমাকে ক্ষমা করো । কি বলেছি তোমাকে – তুমি ভুলে যাও ? এই দেখো পরাণ ভাই । কখনো আর বলবোনা । এইবারের মতো ক্ষমা করো । ক্ষমা করে দাও ।
– তুইও মাঝে মাঝে এমন না কি সব বলে দিচ্ছিস আমিও বিগড়ে যাচ্ছি । এই মুহূর্তে বুদ্ধি পরামর্শ দিবি কিনা ? যাক – যাক । হতাশার শব্দ প্রয়োগ অভ‍্যেস যতোটা পারিস । ছাড় , ছেড়ে দে । ছেড়ে দে । জোড় দিয়েই বলছি । তুই কেনো এই অসংলগ্ন কথা এই মাঝ পথে এসে বলছিস । এখন তুই প্রায় নেগেটিভ কথা বলে দিচ্ছিস সিপু ?
সিপু নিরব গম্ভীর ছিলো । মনে মনে গভীর অনুশোচনায় ডুবে নিরুত্তর নিম্নোক্তভাবে চলছিলো এক পা দু পা করে । পরাণও চুপচাপ হয়ে গেলো পরে । ওদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ কথা হলোনা । নিরবে অনেক দূর পথ হেঁটে হেঁটে গেলো দুজনে । পরাণ একটিবার সিপুর অভিমুখে ফিরে দেখে পূনরায় পূর্বোক্ত হেঁটে চলল । সিপু একটু অভিমানী বটে । একটুতেই অভিমানে ফেটে পড়ে । ও বারবার সরি এক্সকিউজ বলতে বলতে নিজেই এক প্রকার ভিতর ভিতর ভেঙে পড়লো যা বুঝা গেলো । ওর অভিমানী মুখটা ভীষণভাবে ভাব গম্ভীর হয়ে গেলো মুহুর্তে । সেটা এতোক্ষণে পরাণও বুঝে উঠলো খুব ভালোভাবে । পরাণ হঠাত্‍ করেই শক্ত করে সিপুর হাত ধরে একটা দাবন দিলো । এমন সময় সিপু পরাণকে মাথা তুলে দেখলো । পরাণ দাঁড়িয়ে গেছে তাঁকে ধরে । বাধ‍্য হয়ে সেও দাঁড়িয়ে গেলো ।
– বল কি হয়েছে ?
– না কিছুনা ।
– নিশ্চয় মনে-মনে তুই কষ্ট পাচ্ছিস ? কি হয়েছে বল খুলে বল সিপু ?
– মেয়েটার জন্য ভাবছি !
– মেয়েটার জন্য আমিও ভাবছি !
– ওর জন্য আমাদের কি করণীয় আছে এখন ?
– যা আছে সেটা আমাকে একাই করতে হবে । তোদের নিয়ে আমি সে কথা ভাবছি না ।
– এতো বড় একটা রিস্ক তুমি একাই নিবে , তুমি পারবে ? যদি না পারো ?
– পারতে হবে । আর না পারলেও করবার কিছু নেই ।
– আফসোস । কেনো বলছো এমন করে বলতো ?
– মরণপুরের সমস্ত নারী কুলকে তথা সমস্ত কিছুকে রক্ষা করবার সার্থে কোথাও কোনো একটি ভুলও করা যাবেনা সিপু । শুধু আমার উপর ভরসা রাখিস ।
এই বলে পরাণ আর দাঁড়ায়নি । সিপুর গন্ডি ছাড়িয়ে বেশ দ্রুত সড়ে হেঁটে চলে গেলো সামনের দিকে । দুজনের দূরত্ব বারতে লাগলো ক্রমাগত । পরাণের এমন হঠাত্‍ চলে যাওয়া দেখে সিপু দাঁড়িয়ে থমকে গিয়ে দেখছিলো তাঁকে বিশেষভাবে । বিশদভাবে তাঁর বিশালতাকে অনুধাবন করছিলো মনে-মনে । তখন শুধু মনের মধ্যে একটিই প্রশ্ন দানা বেঁধে উঠলো ।
সে প্রশ্নের কাছে নিরবে সে উত্তর খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গেলো । এরপরও কোনো উত্তর মিললোনা । উত্তরের কোনো কুল কিনারা খুঁজে পেলো না । অনুশোচনায় অবশ্রান্ত হয়ে উঠলো সিপুর ভিতর মন । তখন আবারও ফিরে দেখলো পরাণকে । চারদিক ঘিরে পোড়া মাটির প্রান্তহীন মাঠের পর মাঠ চোখের মধ্যে এসে অবস্থান নিলো । তবু পরাণকে কিছুতেই আর চোখে পড়লো না । চোখের সীমান্তের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে তখন সে দুঃস্বপ্নের শুধুমাত্র একটা ধুধু তেপান্তর মনে হলো ।