পরাণ ভাই । PART- 21 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART- 21

 

———————–ঃ নাসের কামাল

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

কালাবতি রাণীর রসাত্মক নয়ন প্রথমেই বি‍ষ ধরিয়েছিলো মনে ।

কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো মনের ভিতর । ওর ঐ নয়নের যাদুতে ছিলো গোখরা সাপের বি‍ষ । যে বিষের যন্ত্রণায় ভিতর ভিতর ছটফট করছিলো সিপু । কারো ভারিক্কি পোনা নিয়ে চলতে পছন্দ বোধহয় বেশী না । হাসি খুশি থাকতেই বেশী পছন্দ করে বিধায় এই অল্প সময়ের মধ্যে কতো দিনের দীর্ঘ পরিচিত মনে করে নিয়েছে ! কতো কাছের সম্পর্ক করে নিয়েছে ? শুধু ওর আচরণ গত দিকগুলো বড় আপত্তিকর ছিলো ! কেউ না পাশে থাকলেই সুজোগ খুঁজে নিতো । একটু কেউ আড়াল হলেই ইচ্ছে করেই খুনসুটি করতো কোনকিছুর ছুতো ধরে । গা ঘেঁষে ঘেঁষে কথা বলার চেস্টা করতো । সিপুর ইদানিং সে জন্য মুখের উপর বলে দিতে বাধেনা । এখন নাকের ডগায় আংগুল ঘোঁষে বলে দেয় ,
– বউদি । তুমি খুবিই মিস্টি । তোমার চোখ দু’টো ভীষণ সুন্দর । এই একটি শব্দ বিরক্তি কর তবু অকপটে উচ্ছাস করে বলে ! ওতেই কলাবতী রাণী গা ঘেঁষে চলে যেতো তার সুন্দর মুখের হাসি দিয়ে । যখন যেতো ঝড় তুলে দিয়ে যেতো । একটু পরে ফের ফিরে আসতো নতুন কোনো ছুতো নিয়ে । গ্রেট মেয়েরে বাবা ! শহরে মেয়ের চেয়েও তীক্ষ্ন বিদগ্ধ বচন ভঙ্গি । এই মেয়ে চড়িয়ে খাবে একটু সুযোগ দিলেই । সিপু সেটা টের পেয়েছে এ কদিনে । তাই ওর আগেই মুখ খুলে বলে দেয় ওর চোখের দিকে দেখে ,
– বউদি । বয়স তোমার কতো ঠিক ঠিক বলোতো ? তখন প্রতি উত্তর না করে হাসিতে লুটিয়ে পড়ে কালাবতি । তার গচ্ছিত সুন্দর চুলগুলো ঘারে তুলে হাতে নেড়েচেড়ে নাচিয়ে দেখতো তখন । যেনো স্পিন বল করেই ক‍্যাচ উঠছে কিনা তাকিয়ে দেখতো সে । তাকে বুঝতেও সময় লেগেছে অধিক । তাকে কাবু করবার সেই সহজ পদ্ধতি প্রায় সময় কাজে লাগিয়েছে । কিন্তু আজ তার হলো কি ! একটি বারও এলোনা ঘরে দেখতে ? খোঁজ খবর নিলোনা কি করছে । ওর অনুপস্থিতিতে অলিখিত মনের ভিতর কাব‍্য রচনায় ঘিরে ধরলো । ওর চোখের চাহনি হয়ে উঠলো বিদগ্ধ রাক্ষসী । ওর অঙ্গ ফুটে বেড়িয়ে এলো বাহারী গোলাপ ফুলের সুবাস । ওর শরীরের ভাজে গোলাপ পাঁপড়ির অঢেল প্রেমের আবরণ লেগে আটকে থাকলো । ওকে অপছন্দ করতে না চাইলো চোখ , না মন ? এই মরণপুরে এসে নৈতিকতার কিছুটা হলেও মরণ হয়েছে বুঝলো । ঘর বেঁধে ফেললো ছোট্ট করে মনের ভিতর । সেই ছোট্ট সীমানার সীমান্তে এখন সুখের অবাঞ্ছিত ঝর্ণারা মাঝে মাঝেই চোখের ঢাল বেয়ে নেমে আসতে চাইলো বুকে । জেগে উঠতে চাইলো দুঃস্বপ্নের মাঝে অসঞ্জীবনী মনটা । এই বোঝাপড়নের মধ্যে এখন প্রতিনিয়ত লড়াই চলল প্রতিদিন তাঁর নিজেরই সঙ্গে । কিছুতেই ফিরতে পারছিলোনা । কিছুতেই সুস্থ স্বাভাবিক হতে পারছিলোনা । এমন সময় কালাবতি রাণী এসে ঢুকলো । গা ঘেঁষে ঘেঁষে ওর চুলগুলো পড়েছিলো বুকের সামনে । ওর হিংসুটে রুপে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে বলল খুশীতে
আপ্লুত হয়ে ,
– তু হামার বুকের জমিন দাখল কারে লিয়েছিস বাবু ।
– লাডুয়া ঘুমাচ্ছে ?
– হাঁ । তুর চোখে কি দেখছিস হামাকে ?
– তোমার সুন্দর চোখ দু’টোকে ।
– হামার চোখ দেখ । তুর চোখ হামি দেখি । হামার মরণরে বাবু ।
– শুনো বউদি এই অল্প সময়ের মধ্যে পড়া লিখাটা মন দিয়ে শিখে নাও তুমি ? আমরা খুব বেশীদিন আর থাকছিনা । হেসে উঠলো খিলখিল করে ও ।
– হাসলে যে ?
উত্তর না দিয়ে আবারও হাসলো ও । চুলগুলো গড়াগড়ি খেলো হাসির হাতে-হাতে । বাসন্তী কালারের নতুন শাড়ীর আঁচল দিয়ে কোমড় বেঁধে রেখেছিলো ভালো করে । ওর এই হাসিতে ছিলো ভীষণ কাছে পাবার আলিঙ্গন । ওর উষ্ণ সান্নিধ্য পেতে লাগলো ক্রমশ । ওর ব্লাউজ খোলা শরীর উপচে উপচে পড়ছিলো কামনার কিনারে । তারি ঢেউয়ে ঢেউয়ে মনের পাড় ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিলো ভীষণ দ্রুত কল্পনায় । ওর হাটুর শাড়ী একটু টান খেয়ে উঠে উরু দেখা যাচ্ছিলো শোয়ার সময় ফ্লোর বিছানায় । এক হাতে হাটুর শাড়ী টেনে তুলে ও
বলল ,
– হামাকে দিয়ে লিখা পড়া হবেকনারে
বাবু ।
– তুমি এর মধ্যে অনেক এগিয়েছো ? আর একটু মনোযোগী হলেই সুন্দর ইংরেজী ঝরঝরা পড়তে পারবে । আর এখনই ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছো কেনো ! এখন ধৈর্য হারালে চলবেনা বউদি ? এখন সামনে এগোনোর সময় । না শুনলেই পরাণ ভাইয়ের ধমক খাবে তুমি ! লাডুয়া ঘুম ভেঙে চোখ কচলাতে কচলাতে ঘরে ঢুকলো । কালাবতি উঠে বসে লাডুয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরলো । একটা হীমেল মহুয়া বাতাস বয়ে গেলো পাশ দিয়ে । এই মহুয়া গন্ধ ওর শরীর থেকে ছুটছিলো মাঝেমধ্যে । ওর এই মিষ্টি গন্ধ পেয়েছিলো প্রথম দিনই । আদিগন্তর ছায়া ধার । যেন নিম পাতার ভিজা ভিজা গায়ে মুছে দিয়ে গেলো সমস্ত শরীর । মনের যতো ভুত ছিলো ঝাড় ফুঁক করে তাড়িয়ে দিয়ে গেলো এসে । জানলা বন্ধ ছিলো ঘরে । তারপরও পোড়া পোড়া শীত শীত মাটির গন্ধ ঢুকছিলো । শিরশিরে – ফুরফুরে ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগছিলো মাঝে মাঝে । সে সবের সংমিশ্রনে মরণপুরের নিজস্বতা ফুটে উঠলো তাঁর মধ্যে একটু একটু । এমন শীতে সিপুর কপাল চুঁইয়ে কেনো যেন ঘাম গড়িয়ে গেলো । হঠাত্‍ ফিরে দেখে কখন কালাবতি রাণী উঠে চলে গেছে একটু টেরও পাইনি । শুধু ওর ভুল করে ফেলে রেখে যাওয়া হাতের দু’টো পিতলের বালা পড়ে থাকতে দেখলো বিছানার চাদরে । হাতে তুলে নিয়ে দেখতে দেখতে ভাবলো । হাত থেকে খুলে রেখে যাওয়ার কি অর্থ ? খুঁজেছে অনেক ! খুঁজে পায়নি কোনো তার রহস্য ! হঠাত্‍ সে প্রশ্নই মনের মধ্যে ঘুরেফিরে এলো । সত‍্যিকি ভুল করে রেখে গেছে কালাবতি রাণী ? ঠিক সেই মুহূর্তে পূনরায় কালাবতি রাণী ঘরে ঢুকলো । ঢুকে তার হাতের বালা দু’টো খোঁজ করলো ইঙ্গিতে । হাত বারিয়ে ওর হাতে তুলে দিতে গিয়ে ও কাছে এগিয়ে এলো । ওর রসালো শ্বাস অনুভব করলো । ইচ্ছে করছিলো মন যা চাইছে । সে মুহুর্তে ওর চোখের ক্ষিপ্র ক্ষুধার্ত গিলে নিলো ইচ্ছের সবটুকু । দেখছিলো ওর চোখের সৌন্দর্যের ভীষণ রুপ কেমন ঝরেঝরে পড়ছে বুকের ভিতর । চোখযে কখনো কখনো মনের কথা বলে তা ওর চোখ দেখেই বুঝলো । ওর চোখের অপলক দৃষ্টি এমনভাবে আকর্ষণ করলো । যেখানে সম্পূর্ণ নিজেকে সমর্পণ করে দিলো । দীর্ঘক্ষণ চোখের মধ্যে চোখ ঢুকিয়ে যে নেশায় আসক্ত হয়ে বেহুঁশ হয়ে রইলো । সেখান থেকে সরে আসতে আর পারলোনা । না পারলো সে ? এমন শুভ দৃষ্টি মনে হলো পৃথিবীর কেউ কখনো রাখিনি । তখন বারবার কেবলি মনে হলো । পৃথিবীর যতো কবি আছো ,
কালাবতি রাণীর মতো চোখ দু’টো – কেউ কারোই এমন দেখনি তোমরা ? সমুদ্র সৈকতে থাকলে এতোক্ষণ নিশ্চিৎ চিত্‍কার করে বলা হয়ে যেতো নীল আকাশকে , নীল সীমান্তের তুরন্ত উচ্চারিত সেই শব্দেরা দূর আকাশের দেয়ালে দেয়ালে বারি খেয়ে ঝরে ঝরে পড়তো ক্লান্ত পাখির ডানায় । কি সব যা-তা অল্প বয়সী টিনেজদের মতো ভাবছে সিপু । এ বয়সেকি আর College life can tell that you like? I love it. What do you love ?

দরজার খিড়কি অনেকক্ষণ হলো লাগিয়েছে পরাণরা । আমির আলী নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে পরাণের সেদিকে খেয়াল নেই । ইন্ডিয়ান সিমে নেট ব্যাবহার এই শেষ বোধহয় । ফেসবুক খোলে কমেন্ট লাইক দেখে ওয়েবসাইটের মধ্যে ঢুকে পড়লো । মেসেঞ্জারে চ‍্যাট করছে অনেকেই । আজ সে অফুরাণ সময় নেই । অন‍্যদিনের মতো আজকে ঘনিষ্ঠ জনদের সঙ্গে সেরকম সঙ্গ দিলোনা । মনস্থির করাই ছিলো কারো সঙ্গে কোনো সময় দিবেনা । ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় পোস্টগুলো দিতেই মূলত ব্যস্ত হয়ে উঠলো । একটি মাত্র ব্যাটারি রিজার্ভে ছিলো ? দশ মিনিট চলবেকি চলবেনা কোনো ভরসা নেই ! এর মধ্যে ঢাকা থেকে পার্থ মুখার্জির বার্তা মেসেঞ্জারে দেখলো এলো । দারুণ খবর ! ইতিপূর্বে এই খবরের জন্য চাতক পাখির মতো ফেসবুক খুলে মেসেঞ্জার চেক করতো প্রায় সময় । নাহঃ তাঁর কিছু আসেনি । এক ফোটা শান্তনার বৃষ্টি ঝরেনি ! তার মানে সে কোনো পার্টির পাত্তা লাগাতে পারিনি এখনো ? এ মুহূর্তে তাঁর বার্তাটাই পরাণকে চমকে দিয়েছে ! বিস্মিত হয়ে পার্থ মুখার্জি কি দিয়ে পাঠালো ? দেখাই লাগবে বিধায় ওয়েবসাইটে পোস্টিং ছেড়ে তাঁর মেসেজে ফিরলো শেষে । দেখেই উত্‍ফুল্লো হয়ে উঠলো । দারুণ ! সত‍্যিই খুশীর খবর ? মনের মধ্যে রবীন্দ্র সংগীত বাজতে লাগলো – আমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে প্রাণে । আহাঃ সত‍্যি রবীন্দ্রনাথ ট্র‍্যাপ করেছে তাঁর সমস্ত লিখনীতে পৃথিবী ব‍্যাপি সবাইকে । পার্থ মুখার্জিকে লিখলো – তুমি ইন সিউর করলে আমি যেতে পারি ? পার্থ ইন সিউর করে জানালো – পরাণ দা আপনি চলে আসেন । আপনার জমির মূল্য কোটির উপরে চড়া মূল্যে ক্রয় করতে পার্টি রেডি আছে । আপনার ফোটো কপির কাগজ পত্র সবই লিগাল ! বুঝেছে ? আপনার সবই কাগজ পত্র দেখিয়েছি । ওদের বক্তব্য আপটুডেট খাজনা খারিজ সি এস , এস এ ; আর এস রেকর্ড আপনাদের নামে আছে ! আর কি লাগে বলুন ? ওরা রেকর্ড রুম । তহশী অফিস এবং রেজিস্ট্রি অফিস সার্চিং করে সিউর হয়ে গেছে ! এখন ওদের একটাই প্রশ্ন আপনাকে যে পাওয়ার অফ এ‍্যাটোনিটা দিলো ! আপনার আব্বা জীবিত তারপরও আপনাকে পাওয়ার অফ এ‍্যাটোনি আপনার ভাই বোন দিচ্ছে কেনো আপনাকে ? ওর উত্তর দিলো পেস বলের মতো ছুঁড়ে দিয়ে পরাণ – আব্বার নামে কোনো সম্পত্তি নেই ! তার কারণ জানতে চাইলো পার্থ মুখার্জি ?
– যেই কারণেই হোক আব্বা আম্মার সমস্ত সম্পত্তি আমাদের ভাই বোনদের নামে উইল করে দিয়ে দিয়েছে । আব্বা আম্মার হস্তান্তরের কাগজ পত্র তোমাকে দিয়েছি । আমার সম্পত্তি বাদে আমার ভাই বোনের সম্পত্তিতে শুধুমাত্র পাওয়ার অফ এ‍্যাটোনি আমাকে দিয়েছে ওরা ! তারও কাগজ পত্রের ফটোকপি তুমি পেয়েছো ? ওদের এক্সপার্ট কোনো উকিল বা মহরীল এক নজর দেখলেই বুঝবে ! তুমি দেখাও ওদের ? ও জানালো – আপনি এ‍্যডভান্স চান ? চাইলে পার্টি লাক্ষ দশেক টাকা আপনার একাউন্টে দিয়ে দিবে যে কোনো মুহুর্তে । এবারও পেস বল করে ছুঁড়ে দিলো পরাণ – না পার্থ মুখার্জি ! তুমি ওদের ওয়েট করতে বলো ? আমি দিন দশকের মধ্যে ঢাকা রওনা দিবো তোমার উদ্দেশ্যে । চ‍্যাট করেই নেটওয়ার্ক ও নেট দু’টোই আউট হয়ে গেলো হঠাত্‍ । মাথায় নষ্ট । আরও কিছু দরকারী কথা ছিলো তাঁর সঙ্গে । অনেক টাকার প্রয়োজন পরাণের । হারানো সম্পত্তি ? ভাই বোনের কাছ থেকে প্রাপ্ত । তাঁরা ঝামেলায় জড়াতে চাইনি কেউ । সামান্য টাকার বিনিময়ে লিখে দিয়েছে । সেটাও সম্পূর্ণ বাকিতে ! সম্পত্তি বেচা বিক্রি করে পরিশোধ করবে সেই টাকা পরাণ তাঁর ভাই বোনদের । ন্যায্য মূল্য ধরে হলেও দশ কোটি টাকা হবে ! মন্ত্রী টুন্ত্রী নিচ্ছে হয়তো ? ঢাকা মালিবাগ চৌধুরী পাড়া আবুল হোটেলের লাগা সম্পত্তি । দীর্ঘদিন বেদখল হয়ে আছে । যা আসে এই অসময়ে তাই ভালো । সশরীরে হলে চিলের ঠোঁটে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যেতো তাঁকে । আবুল হোটেলের কাছাকাছি অনেক সন্ত্রাস মার্ডার হয়ে থাকে । প্রায় সংবাদ পত্রে শোনা যায় মানুষ হত‍্যার ঘটনা । যা পাই তাই ভালো বারবার ভাবলো সেই কথা ? পার্থ মুখার্জি তাঁর জানের উপর রিস্ক নিয়ে পরাণকে হেল্প করছে । লেনীন চৌধুরীর সুত্র ধরে পার্থ মুখার্জি এমন একটি কাজে হাত দিয়েছে । ও জানে এই টাকা জন স্বার্থে ব্যাবহার হবে । ব্যাক্তি জীবনে নিজ অর্থ খুবই কম ব্যাবহার করেছে ও । সে খবর সবার জানা ? পরাণ ব্যাটারি চেক করছিলো । ধারালো সুচের চোখে ব্যাটারি গুলোর মধ্যে থেকে বেছে নিচ্ছিলো একটি ব্যাটারি । একটু সচল হলেই চলবে ! একটিতে চার্জ থাকলে ওয়েবে পোষ্টগুলো দিতে সক্ষম হতো পরাণ ? চার্জ শেষের পরও অনেক সময় ব্যাটারিতে চার্জ পাওয়া যায় । সুযোগ খুঁজছিলো ! অয়িড বলের সুযোগটা কাজে লাগালো পরাণ অবশেষে । পোস্টগুলো দ্রুত দিতে লাগলো । পর্যায়ক্রমে দিয়ে গেলো তাঁর প্রয়োজনীয় সবকিছু । ফেসবুকের মেসেঞ্জারে তমালের একটি মেসেজ পেয়ে বুক ভরে গেলো । পরাণ নড়েচড়ে উঠলো । রক্ত ধমনীতে বিজয়ী স্পন্দন নাচছিলো ভীষণ রকম । রাত্রি অনেক হয়েছে । গভীর রাত্রিতে গভীর আনন্দে নেচে উঠলো মন । তমালের বার্তা পড়ছিলো , পরাণ ভাই আপনি যেভাবে বলেছিলেন ! ঠিক ওভাবেই প্রায় তিন দলে পঞ্চাশ ঘর পরিবার মিলে মরণ ডাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওনা দিবে আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক লোক । মরণ ডাঙ্গায় নতুন বসতি গড়ছে নিশ্চিৎ আপনি ভরসা রাখবেন । আপনার প্রত‍্যেকটি কথাই গুরুত্বের সঙ্গে আমি সবুজ মিলে করছি । সঙ্গে বিরুদের নিচ্ছি বিশেষ কিছু কিছু কাজে । আপনি নিশ্চিন্ত থাকবেন । মরণ ডাঙ্গায় বসতি হচ্ছে কেউ আটকাতে পারবেনা পরাণ ভাই । উত্তর দিলো পরাণ – খুব সাবধান । আমি খুশি হয়েছি তমাল । তোমরা কেউ বসে নেই । তোমাদের সবরকম প্রচেষ্টা অব‍্যহত রাখো । মরণ ডাঙ্গায় একবার বসতি গড়ে উঠলে মরণপুরের অপশক্তি ফিফটি পার্সেন্টে নেমে আসবে । মরণপুর বিশেষ করে বাংলাদেশের একটি অবহেলিত গ্রাম ! যাতায়াত ব্যবস্থা ও বিদ্যুতের অভাবে মানুষগুলো বরাবরই বড় অসহায় ! হয়তো-বা আমরাও অসহায় হয়ে পরবো আজকের পর থেকে ! তোমার কথাই নতুনভাবে মনে হলো – আলোর স্বচ্ছল আকাশ দেখছি তমাল ! বৃষ্টি ভেজা সবুজ সুন্দর গাছ পালা দেখতে পাচ্ছি ? এখানে অসংখ্য গাছপালা লাগিয়ে ফেলেছি ইতি মধ্যে । সেগলো দ্রুত বড় হয়ে উঠছে দোয়া করো । মরণপুর মরণ ডাঙ্গায় ডিপ বসবে একাধিক ? একর একর অনাবাদি জমির উপর দিয়ে ওয়াটার লাইন ক‍্যানেল বসে চাষবাস করবে মরণপুরের অবহেলিত অসংখ্য অগনিত মানুষ । আমি এই স্বপ্ন দেখছি বিশ্বাস করো প্রতিনিয়ত ! তোমরাই সেটা বাস্তবে বাস্তবায়ন করবে ভেবে খুব আনন্দিত হচ্ছি । আল্লাহ তোমাদের মঙ্গল করুক । আমার দেয়া বিভিন্ন কর্মসূচীর যথার্থ মূল্যায়ন করেছো তোমরা ? বিরুদের জানাবে আমার ভালোবাসা । বিশেষ করে সবুজকে বলো মহান কাজ করতে বেশী লোক লাগেনা ? তার মধ্যে সে প্রভাব রয়েছে ! ওর মধ্যে বেশী রয়েছে সেটা । ওর মতো আন্তরিক নিষ্ঠাবান ব্যাক্তি কম সংখ্যক দেখেছি আমি জীবনে । তোমাদের সবসময় মনে পড়ছে এখানে তমাল । ভালো থেকো । আমার ব্যাটারী শেষের মধ্যে । আমাকে আর হয়তো লাইনে এইভাবে পাবেনা । মরণ ডাঙ্গার বসতি দেখেই আমরা রহণপুর ফিরবো । সাবধান সতর্কতার সঙ্গে কাজ করো ? দোয়া রইলো তোমাদের জন্য । খোদা হাফেজ । পরাণের চোখে যতোটা আনন্দ ফোটে উঠেছিলো তার দশগুণ নিতলে ডুবে দেখলো সমস্ত যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতায় গভীর গহীন অন্ধকার ! এখন থেকে এখানে নিজেদের কেউ মরলেও কোনো সংবাদ পাঠানোর ব্যবস্থা রইলো না । ঘরের মধ্যে হঠাত্‍ কিসের শব্দ করে উঠলো ! কাঠের চেয়ারের ঘাড় মোচড় দেয়ার ফাটা শব্দ নির্গত মনে হলো পরাণের কানে ?
– তুমি একান্ত কায়েল দার বউদি ? কায়েল দা একদিন বলছিলো তোমার সম্পর্কে ! তোমাকে শিক্ষিত করবে । তোমাকে দিয়ে স্কুল চালাবে ভবিষ্যতে এখানে । সে মানুষটার জন্য তোমারও ভাবা উচিৎ সেরকম কিছু একটা ?
কালাবতি রুম ছেড়ে উঠে চলে গেলো নিরুত্তর । সিপু দেখলো ওর অভিমানী ঘুরে দেখা কোঁকড়ানো চোখ ! তাঁর কাব‍্যময় চোখে ছলছল করছিলো এক খন্ড সাদা মেঘ । ওর ভালো লাগার সব টুকু প্রকাশ না করলেও গোপন যে থাকলোনা বুঝলো সিপু মনে-মনে সমস্তই । সিপুর কেনো জানি উদ্ভট উদ্ভট ভাবনা চলে এলো মনে । টিউশনিটা গেছে ! দোকানটার ভাড়াটিয়া ক মাসের ভাড়া একত্রে দিতে ভীষণ হাত ভারি করে ? গেলেই বলে – সামনে মাসে একত্রে দিয়ে দিবো । ব‍্যবসা খুব মন্দা সিপু ভাই । যা দিনকাল পড়েছে ! এদিকে আমার মেয়েটাও শেয়ান হয়ে উঠলো । মেয়েটার বিয়ে দিতে পারছিনা ? কি করবো সিপু ভাই ! শেষ পর্যন্ত পূণর্ভবা নদীতো আছেই ! না হলে লেক্কোর মতো ঝাপ দিবো আর কি করবো বলেন ? এর আগে এমন সুযোগ নিয়ে ওই ভাড়াটিয়া সিপুর গায়ে একবার জ্বর তুলে দিয়েছিলো । ওর সে কথা মনে পড়তেই খিঁচিয়ে উঠলো শরীর ! এখনতো সেই দিনগুলো আবারও ফিরে আসছে ! সেই কথা ভেবে চোখের কনে প্রতারণা করতেই থাকবে মাঝেমধ্যে এমন অশ্রুর ঘোলা । ও উপলব্ধি করলো নিজের দুই চোখ ভিজে গেলো যখন । ওর দুই চোখ থেকে তুলছে কেউ কেউ মহা সমুদ্রের জল ! তবুও শেষ হচ্ছেনা ? মনে পড়লো ভাড়াটিয়ার মেয়েটি কি টাইপের ও তার ভঙ্গ ভঙ্গিমা কেমন ? ও একটা জাপানী লাল রঙের ফিফটি হুন্ডায় চড়ে মাঝেমধ্যেই সিপুর কাছে গিয়ে ওর আব্বার বিরুদ্ধে নালিশ করে যেতো ? একদিন সে হুন্ডা থেকে নেমেই সিপুর মুখোমুখি হয়ে বলল ,
– আপনি আব্বাকে এ , ক দিন অঝতা টাকার চাপ দিয়েন না সিপু ভাই ?
– কেনো ! না ইচ্ছে করলো বলতে তবুও বলল সিপু ।
– আব্বার প্রেসার । ডাক্তারের বারন আছে ? সবসময় দুশোর উপর প্রেসার থাকলে কি মানুষ বাঁচে বলুন ?
– কি বলছো তুমি ! তাহলেতো মারাই যেতো ? এখনো বেঁচে আছে বলছো কি করে , আশ্চর্য !
– তারপরও মানুষটা বেঁচে আছে । বেচারাঃ
– কে ?
– আমার আব্বা ।
– আমি দেখতে আসছি । বলো তোমার আব্বাকে গিয়ে ।
– আপনি দেখছি মানুষটার শেষ দেখে ছাড়বেন সিপু ভাই ?
– শুধু সাক্ষাৎ এক নজর । শান্তনা দিবো মাত্র পিংকি ! ভাড়ার টাকা চাইতে না ?
– ধুর ! সামান্য ভুলের জন্য দোষ ঘাড়ে নিবেন । বেচারাঃ
– কে ?
– আব্বার কথাই বলছিলাম । আপনি গেলে যদি ভয়ে আঁতকে উঠে ! সেটাই বেশী ভাবছি ! কেউ না জানুক আপনি জানেন আমাদের পরিবারের কি দূর অবস্থা ?
এই কথার পর পিংকি হুন্ডা স্টার্ট দিয়ে শাঁ করে নাকের ডোগা দিয়ে চলে গেলো । যেনো ফুরুত করে চড়ুই উড়ে গেলো ? ডাক বাংলা রোড । পুলিশ লাইনের সামনে দিয়ে বাঁক ঘুরলো মেডিক্যাল এর দিকে । মেয়েটা যাবার সময় মিষ্টি হাসির রোল তুলে কি একটা গান গুনগুন করে গেলো । পাতলা ছিমছাম লম্বাটে গড়ন । চেহারায় বাচ্চাকাচ্চা ভাব ফুটে আছে । বয়স সতেরো আঠারো হবে হয়তো ! দেখতে সুন্দর খুবই ধবধবে ফর্সা । জিন্স প্যান্টের উপর টপ্স পড়ে মানিছেও খুব । ওর নিজের উপর অগাধ আত্মবিশ্বাস ? আর সে জন্যই হয়তো সিপুর কাছে বারবার পাড় পেয়ে যাচ্ছে ! ওর আব্বা সিপুকে ভাই বলছে , তাঁর মেয়ে পিংকিও ভাই সম্বোধন করে গেলো – ভালোই ! সম্পর্কের মহাব্বত ভালোই চলছে ?
বুকে চাপচাপ ব্যাথা নিয়ে ঘুরে দেখলো ভয়ে আতঙ্কে দাঁড়িয়ে আছে পাশে কালাবতি রাণী । আর দরজা ভাঙার প্রচন্ড শব্দ হচ্ছে বাইরে । বাড়ি সহ কাঁপছে ? প্রচন্ড সাংঘাতিক রকমের কড়াঘাত্‍ ! অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো দরজা ভেঙে ঢুকে সিপুকে এট‍্যাক করলো । প্রথম দিনের সেই ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে মোটা দড়ি দিয়ে তাঁর হাত পিছনে উল্টে ঘুরিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলো । সিপু হতভম্বের মতো নিরব হয়ে দেখলো শুধু । প্রত‍্যেকের হাতে ধারালো লম্বা লম্বা হাসুয়া । সাধারণত এ সমস্ত হাসুয়া বডার এলাকায় ঘোষদের হাতে থাকে । সিপুকে মড়লের নির্দেশক্রমে বন্দী করা হলো সে কথা প্রথমেই ছেলেটি বলল চড়া স্বরে ,
– পিতার আদেশ না নড়চড় হবেক । তু আখুন থিকে বন্দী থাকবিক লা । আকটুক না রা কারবি তু । সোজা সিধা চাল । চালবে শুয়ার শালা ? চিতা বাঘের মতো সিপুর শার্টের কলার ধরে টান দিলো ছেলেটাই প্রথমে । বাকিরা ছয়জন দাঁড়িয়ে ছিলো । হঠাত্‍ একজন একটা লাত্থি দিলো উরুর উপর । ক‍্যাঁতঃ শব্দ করে উঠলো । একজনের হাতে বাঁশের শক্ত লাদনা ছিলো ধরা । ও হঠাত্‍ সিপুর পায়ে আঘাত করলো কোষে । সিপু মাটিতে লুটিয়ে পড়লো । হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেলো মাটিতে । স্থূলবুদ্ধি সম্পূর্ণ মানুষ এরা । মড়লের একান্ত পোষ্য পালিত । তার নির্দেশের বাইরে কিছুই করবেনা কখনো ? ততক্ষণে লাডুয়া উঠে এসে সে দৃশ্য দেখলো তার মাকে জড়িয়ে ধরে । কালাবতি দেখে সহ‍্য করতে পারছিলো না তখন চোখ বন্ধ করে ফেলল ! ওকে ঘর থেকে বেড় করে নিয়ে চলে গেলো বাইরে । বাইরে নিয়ে গিয়ে শেষ মাইরটা আচ্ছাসে দিলো । সুতিয়ে দিলো মারতে মারতে । মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেলো । ঠান্ডায় কোঁকিয়ে উঠলো । কালাবতি রাণী লাডুয়ার ঘাড়ে হাত রেখে সবকিছু দেখলো দরজায় দাঁড়িয়ে । তখনো বাঁশের লাদনা দিয়ে এলোপাথাড়ি মেরে চলেছে নির্দয়ে বেদম । সিপুর পা ফেটে রক্তের ঝর্ণা গড়ে গেলো । শক্ত পোড়া মাটিতে পড়ে শুষেনি তখনো রক্ত ! সিপুকে ওরা তুলে ছ‍্যাঁচড়াতে ছ‍্যাঁচড়াতে নিয়ে গেলো মড়লের বাড়ির দিকে । নিয়ে যেতে যেতে মাঝ পথে নামিয়ে আবারও ধোলাই দিলো শেষবারের মতো । প্রচন্ড নিম্ন আবহাওয়ার চাপ ছিলো বাইরে । ঠান্ডা হাওয়া বয়ছিলো ঘন কুয়াশা ভেদ করে । কালাবতির সেদিকে খেয়াল ছিলোনা ? ওরা দূরে দেখলো হারিকেনের আলো টিমটিম করে মিলিয়ে যেতে । দূরে আলোর নিশ্চিহ্নতা নিশ্চিৎ করে কালাবতি লাডুয়া দৌড়ে গেলো । জমাট বাঁধানো চাপচাপ রক্ত মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলো । নিম্নোক্ত রক্ত ভেজা মাটির দিকে দেখে থাকলো তার সকরুণ ভেজা চোখ নিয়ে । তারপর তার দু’টো হাতে মাখলো নেড়েচেড়ে সিপুর রক্তের মাটি সহ । তারপরও তার দুই চোখে কিছুই দেখছিলোনা মনে হলো ? সবকিছুই ঝাপসা মনে হলো তার
কাছে ! একটা নির্বাণ দেখলো থেমে থেকে থেকে ! দেখেই থাকলো দীর্ঘ সময় —-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *