পরাণ ভাই । PART- 7 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART-7

 

———————–ঃ নাসের কামাল

 

—– শান্তনা

————আর কাঞ্চনকে লাইনে ছেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে গেলাম । ব্রেকফাষ্টের সব ব্যবস্থা গ্রহণ করলাম তাঁর জন্যে । ফিরে এসে দেখি শান্তনার মুখ চোখ জুড়ে তার মৃদু স্মোথ হাসি লেগে আছে এখনো । নিশ্চয় দুজনে দুজনকে খুব ইন্জয় করেছে এ সময়ে । এ মুহুত্ব গুলো খুব রোম্যান্টিক হয় । যে কোনো নারীর সৌন্দর্য বদলে ফেলে । আর এমনিতেই শান্তনা অসম্ভ সুন্দর । যেন তাঁর সৌন্দর্যে ঘরময় আলোয় আলোর বিকিরণ ছড়িয়ে গেলো আরও । সেই অনুরক্ত মুখের দিকে দেখে বললাম ,

– কাঞ্চন এ অধমটার বিরুদ্ধে কি বলল শান্তনা বল প্লিজ ।
– না না কিছু বলেনি সিপু ভাই ।
– নাও ব্রেকফাস্ট । এতোক্ষন তোমারই সব ব্যবস্থা নিচ্ছিলাম । বলুক কাঞ্চন তাতে কোনো যায় আসে না । ও বেটা আসলেই তোমার সামনে যা বলার বলবো আসুক আগে ।
– সিপু ভাই আপনি , আপনি খাবেন না ?
– যা যা বলছি শুনো । বেড়িয়ে নাস্তা করবো আজ বড় বাজারে । করে আর এদিকে ফিরছি না । এরি মধ্যে তুমি ঘুমিয়ে নিবে একটু । তোমার খাবার নিয়ে একবারে ফিরবো দুপুরে । আর হ্যাঁ কিছু কেনা কাটা আছে তোমার জন্যে । সে সব এ বেলাতেই সেরে ফেলতে পারবো । তুমি শেষ কর । শেষ করে শরীরের মাপটা দাও ।
শান্তনা খাচ্ছিলো কারণ তাঁর প্রচন্ড ক্ষুধার কাতরানী ছিলো ভিতর ভিতর । দীর্ঘক্ষন থেকেই পরাধীন পেটটার কথা ভাবছিলো শান্তনা । একটু স্বাধীনতার জন্য চেঁচাচ্ছিলো পেটটা । আর ভাবছিলো ছেড়ে আসা তাঁর শখের পোশাক গুলোর কথা । এখন মনে হচ্ছে মানুষ সব সময় পরাধীন থাকে না এক সময় মুক্ত স্বাধীন হয়ে যায় । সেটা কখন কি ভাবে হয় কার মাধ্যমে হয় মানুষ নিজেও জানে না । চোখের কোনে উষ্ণ উষ্ণ কি মনে হচ্ছিলো । মনে হচ্ছিলো কতোটা স্বাধীন হতে পেরেছি । এই কি স্বাধীনতা যা চোখের কোনে একটু একটু করে জমা হচ্ছিলো ত্যাগ আর গভীর প্রচন্ড ভালোবাসায় ?
খাচ্ছিলো শান্তনা তাঁর মুখে কোন উত্তর নেই দেখেই বুঝছিলাম তাঁর প্রতিক্রিয়া ও কি বুঝাতে চায় ।
সমস্যা নেই ওয়েট করছি । দুপুরে ফিরে নিজেও একটু ঘুমিয়ে নিব । ফিরে এসে তোমাকে জাগাবো না । তুমি তোমার মন মত ঘুমিয়ে নিবে , টানা ঘুম । এখানে এই টেবিল্টার উপর লান্চ রাখা থাকবে তোমার – তুমি উঠে নিজের মত খেয়ে নিও । একটা কথা ! থাক এসেই
বলবো । ও হ্যাঁ জানালা দুটো লাগিয়ে দিই । যদিও এদিকে কেউ আসে না বাই চান্স এক্সিডেন্ট বলে কথা – তুমি ফ্যান চালিয়ে ঘুমাও । তোমাকে হুপ্লেস খুব লাগছে । রাত্রে কথা হবে । জমিয়ে আড্ডা হবে । কি ভাবছো তুমি , তোমাকে হাসি খুশি রাখতে , তোমাকে ইজি করতে পারবো না । ঐ সব ছাড়ো । যা
হবার হবে ।
– প্লিজ সিপু ভাই আমি !
– আমি । এই আমি কি , আমি কি ? তোমার নার্ভাস নেসটাকেই
দেখছি দাঁড়াও ।
জানালা লাগাতে লাগাতে নিজ মনে চলছিলো কথা । এর মধ্যে শান্তনার ব্রেকফাস্ট সমাপ্ত হয়েছে । ঘুরেই ,
– একটু হাসো তো শান্তনা ।
– একবারই হাসবো রাত্রে সিপু ভাই । জমানো জোম্পক আড্ডায় মিস্টি মিস্টি হাসি দিব আপনাকে ।
– সে হাসিটা কাঞ্চন আসলে দিও ।
রাত্রে না হয় –
রাইফেলের গুলির মত ছুঁটছিলো কথা শান্তনার মুখ থেকে ।
– রাত্রে আপনাকে ছাড়ছি না সিপু ভাই ।
গুমোট থাকতে আমিও পারি না । আমার সাথে ফ্রি ফ্যাংক হলে । আমি তিনটা দিন ভুলে থাকবো কাঞ্চনকে ।
– সিরিয়াস ।
– আমি সিরিয়াস সিপু ভাই ।
– প্রিয় জনকে এই ভাবে ছোট করছো শান্তনা ।
– নাতো । এক মুহুত্ব কাঞ্চন ছাড়া আমার চলবে না । ওকে এক মুহুত্ব আমি ভুলে থাকতে পারবো না । ও আপনার হাতে আমাকে তোলে দিয়েছে । ওকে যতটা এখন শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসা করি না – তার চেয়ে বেশী আপনাকে করি সিপু ভাই । আপনি নারী হয়ে জন্ম নিলে ঠিক বুঝতেন কি সিচুয়েশানে কথা গুলো আপনাকে আমি বলছি ।
– না শান্তনা তুমি কি মানে করছো । ঠিক সেভাবে বুঝাতে চাইনি তোমাকে । না । না নিজেকে ওভাবে অসহায় ভেব না ।
– না । না আমিও কখনো এভাবে নিজেকে ভাবিনি অসহায় । না । না কখনো না । না কেউ কোনো নারী কখনো কি আগে ভাবে ? তবে এইটুকু বলবো পিতা মাতার আশ্রয় যে নারী একটিবার পরিত্যাগ করেছে সে নারীর সম্ভ্রম সমাজ কখনো স্কৃতি দিবে না সিপু ভাই ।
– তুমি বাধ্য না হলে কি ছেড়ে আসতে পারতে ওই ভাবে ওতো রাতে ?
এখন মনে হচ্ছে সিপু ভাই । থাক । আপনার ওই দিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে । যান আপনি । রাত্রেই বলবো ।
– তোমার হাসি দেখতে চাওয়াটা খুব বেশী অপরাধ মনে হলে বল —
– ছিঃ সিপু ভাই । আপনি কত হ্যান্ডসাম । যেভাবে বলছেন । আপনি কখনো অভিনয় টোভিনয় করিননি বুঝছি । আমি রহণপুর গার্লস স্কুলে পড়তে অনেকবার অভিনয়ের জন্য পুরুস্কৃত হয়েছি । আজ এই ছোট্ট অভিনয়ের জন্য মনে হচ্ছে আমিই আমার হাতে একটা প্রাইজ তোলে দিই । কি দেখবেন । আপনাকে কি ভাবে হাসাতে হয় এই এক মুহুর্তের মধ্যে আপনাকে আমি কেমন –
অনেকটা ঝড়ের মত খাটের বালিশটার তল থেকে ছোট্ট একটি ভাজ করা কাগজের টুকরো হাতে নিয়ে জোর করে হাতে তোলে দিয়ে বলল ,
– শর্ত একটায় , পড়বেন কিন্ত মন্তব্য করতে পারবেন না । আর কাগজটাতে যা লিখেছি আমার জীবনের প্রকৃত কথা লিখা আছে ওতে । শর্ত মতে Yes করলে আপনার ডান চোখ দিয়ে এক পলকে আমার চোখে শ্লো মোশানে একটিবার চোখ টিপে ওই চিরকুট পড়বেন মানে, মানে আমার চোখে চোখ রেখে । সিপু ভাই নিশ্চয় বুঝাতে পেরেছি আপনাকে ।
কথাকটা হজম করতে কিছুটা সময় চলে গেলো । কাগজ খুলবো কি খুলার আগেই কৌতূহল আর রহস্যে হাসি পাচ্ছিলো ভিতরে ভিতরে । মনে হচ্ছিলো হাতে যা গুঁজে দিলো তা যেন কাতিকুতি দিচ্ছে , শুর শুর করছে হাতের তালু । আহ কি বলবো পঞ্চাশ টাকা দামের সেন্ডেল কিনে পড়ি । খাওয়া দাওয়া করি খুব সস্তা মূল্যে । গোপাল ভালো জানে কি খাই । তার পরও প্রায় সময় রাইস কুকারে চড়িয়ে দিই খিচুড়ি নিজে নিজে । নিজের মত যেমন খুশি চলি আর কি । টিউশানি করে আর কটাই বা টাকা পাই । রহণপুরে টিউশানির কদর অসম্ভব কম । বাজারে একটা বাপ দাদার রেখে যাওয়া কোন ভাগ্যে দোকান ঘর থেকে গেছিলো । ওটা থেকে আসে মাত্র মাসে তিন হাজার টাকা । আর টিউশানি । এতো কিছু জানলে শান্তনার মাথা হেট হয়ে যেত এতোক্ষন । এদিকে চার দিন লাগাতার গোপালের হোটেলে মাছ মাংস ডিম । শেষ করে দিবে পুঁজি পাটা । মেয়েটাকে দেখে এখন মনে হচ্ছে মেয়েটার প্রকৃত রুপ আর চরিত্র এখন ধিরে ধিরে খুলছে । চোখ টিপতে গিয়ে কি হতে কি হবে তখন , ভাবছিলাম ।
– শর্ত দিয়ে না । তাঁর চেয়ে বরং তুমিই দেখে থাকো এদিকে । দেখো, হাসি কতটা হাসছি ।
এমন অবস্থায় কাগজের টুকরোটা খুলতে উদ্যত হই । মুহুর্তে ঝাঁপিয়ে গায়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এমন একটা অবস্থা করে বসলো শান্তনা । কাগজের টুকরো টা ছিনিয়ে নিবার আপ্রাণ চেষ্টা চালালো । নিস্ফল চেষ্টার পর অবশেষে বলল ,
– এই না পুরুষ মানুষ আপনি সিপু ভাই ।
না না না এক দম না এক দম ভালো হবে না বলে দিচ্ছি সিপু ভাই । আমার দিকে দেখেন । আমার চোখে চোখ রাখেন । আমাকে বুঝতে চেষ্টা করেন । আমার চোখে চোখ রেখে খুলেন আমি কিচ্ছু বলবো না ।
– ঠিক আছে তোমারটাও না আমারটাও না আমি অন্য সময় পড়ে নিব ।
– না । তাও না । ওকে । এখন না পড়লে রাত্রে আমার সামনে পড়বেন । ওকে ?
– ওকে ।
– প্রমিজ ।
– প্রমিজ ।
এখন থেকে , আর টুকরো টুকরো স্বপ্ন গুলো লিষ্ট করে রাখতে ভুলছি না । এখন থেকেই সুখের বাতাসে একটু একটু করে ঘুরে বেড়াবো । ভালো লাগছে । ঘুম নেই চোখে তার পরও এক বুক – বুকের আগুনে জ্বলতে পুড়তে হঠাৎ করে যেন ভীষন ভালো লাগছে । কথা ছাড়ায় ভালো লাগছে । কেউ ছাড়ায় ভালো লাগছে । কেউ না থাকলেও ভালো লাগবে । কারো জন্য অপেক্ষা না করলেও ভালো লাগবে ।
সত্যি সত্যি এই ফাঁকে শান্তনা তাঁর গায়ের মাপ কাগজে লিখে এনে হাতে ধরিয়ে দিয়েছে কখন । হাতে পেয়ে বুঝলাম অনুভূতির কি অবস্থা । তখনো ভাবনার রেশ মন জুড়ে চলমান ছিলো । মনের মুক্ত হাওয়াতে দৌলছিলো সহাগী হ্নদয়টা একেবারে শুন্যে ।
এতো সব কিছু ভাবতে ভাবতে বেড়িয়ে পরলাম বাসা থেকে । বেশ হাঁটছিলাম বড় বাজারের প্রশস্থ রাস্তা ধরে । উৎভ্রান্ত উৎভ্রান্ত সব চিন্তার নতুন নতুন দরজা খুলে খুলে যেন অগ্রসর হচ্ছিলাম বুকের সামনে দিয়ে দিয়ে গন্তব্যের দিকে ।
আবার মনে পরলো শান্তনার কথা । আবার তাঁর মুখের ছবি ভেসে উঠলো চোখের সামনে । দূর্দান্ত ফাজিল আর বাচাল মেয়ে একটা । ধষিয়ে ছাড়বে দেখছি । জাকিরের গার্মেন্টস থেকে বাকিতে চালিয়ে নিব শান্তনার পোষাক । একটা মোবাইল বাকিতে তোলে নিব ষ্টেশন খাঁন মোবাইল সেন্টার থেকে । মেয়েটাকে ইচ্ছে করচ্ছে না আর দু চোখে দেখি । শর্বনাশা মেয়ে সর্ব শান্ত হয়ে শেষে এসেছে এই অধমের কাছে ।
কাঞ্চনের ফরমায়েশী বাক্য শুনবি কেন , আমেরিকা থেকে বলে দিতে পারলেই বাহাদুরি ।
বেটা বিয়ে করবি , আমেরিকায় থাকিস আবার লোন চাস কি মুখে , হাত পাতিস লজ্জা করলো না । ভাবলিনা একটিবার বন্ধুটা কত বড় অসহায় । বেটা তুই এই কাঙ্গালের ব্যাপারে সবি জানিস । এই অধমটা তোকে কতটা সাহায্য সহযোগীতা করতে পারবে ওটাও তুই ভালো জানিস । আবার বলেকিনা এসে দিয়ে দিবো । ছুচা , ইতর ; ইল্লত , চামার । এই সব ভেবে একাই মনের মধ্যে বিড় বিড় করছিলাম । দেখলাম বড় বাজার তুলা পট্টির কাছে বর্তমান চলে এসেছি । খুব স্বাভাবিক চোখ দৃষ্টির গন্ডির মধ্যে বিচিরণের আয়োত্বে এখন । প্রতিনিয়ত এখানে একাকশ লোকের সমাগম । অনেক লোকের রুটি রুজির কারবার এখানে । হাতের বামে বেশ মস্ত বড় একটা এলাকা নিয়ে ফাঁকা পড়ে আছে জায়গা । দুইটা মস্ত বড় বড় কড়াইয়ের গাছ ছায়া করে আছে জায়গাটাকে । তার চারি দিক ঘুরে মানুষের পাকা দোকান পাট । এই বাজারটা মূলত ব্যপক একটা আয়তন জুড়ে অবস্থান করে আছে । এই বাজারে অসংখ্য গলি পথ । অসংখ্য দোকান পাট । তাও প্রায় দুই হাজারেরও বেশি হবে হয়তো । এই বাজারে ঢুকে যে কেউ তাঁর নিজের চাহিদা মত জিনিস ক্রয় করে নিয়ে যেতে পারে । খুচরা পাইকারী যে যেমন যার মন মত ক্রয় করার স্বাধীনতা থাকে এখানে অঢেল আছে । এ বাজারে ঢুকে কেউ এমন কিছু যা পায়নি দিয়ে ফিরে গেছে কখনো শোনেনি খালি হাতে । এই বাজারের মধ্যে এই জায়গাটা একটা ছোট্ট অংশ মাত্র । প্রশস্থ সোজা রাস্তায় গেলে বাজারের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক গোলা মাঠ বড় মসজিদ । মসজিদের সামনে দিয়ে খোয়ার মোড় যাবার এই রাস্তা ।
সামনেই হাতের ডানে জাকিরের গার্মেন্টস । শান্তনাদের বাসা পেরিয়ে চলে এসেছি । খূব লক্ষ না করলে বুঝছি ওদের বাসাতে একটা নিরব হাহাকার চলছে । হঠাৎ করে মহন্ত শ্রী খিতীশনাথ আচারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ মিলে গেলো । দেখেই ব্যক্তিটির ফরিয়াদী কিছু কথা বার্তা মনে পড়ে খারাপ লাগতে লাগলো । এই মূক্তাশা সিনামা হলের সামনে গিয়ে সবুজ সংঘ ক্লাবটি আছে ওটি বড় মহন্ত গূরু পিতা প্রয়াত শ্রী হরিকরণ আচারীর সম্পূর্ণ মাটি সহ অনুদানে গড়ে উঠা অথচ কোনো নাম নেই কৃতজ্ঞতা নেই তেমনি হাজি রিয়াজ উদ্দিন স্কুলটিও এই দেবত্তেরই মাটিতে গড়ে উঠেছে পরাণ ভাই । দিয়েই হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ । কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে । হরে রামো হরে রামো । রামো রামো হরে হরে । ঠাকুর ঠাকুর বলতে বলতে চলে গেছিলো । সেদিন পরাণ ভাইয়ের সঙ্গে নিজে ছিলাম বলে শুনতে পেয়েছি । ওখানেই এ শহরের বড় একটি সেতু নির্মাণ হচ্ছে এই সেতুটির নির্মাণকে কেন্দ্র করে অনেক অপ্রিতিকর অপ্রত্যাশীত ঘটনা ঘটে গেছে এই শহরে । মহন্তজি কাছে আসতেই সামনা সামনি এড়িয়ে যেতে পারলাম না । হাত তোলে নমস্কার জানালাম ।
– নমস্কার নমস্কার ।
– সিপু কেমন আছো ।
– দাদা ভালো আছি দাদা ।
– একটা খবর দিতে পারবে ?
– নিশ্চয় । বলেন সম্ভব হলে নিশ্চয় দিব ।
– কাঞ্চন তোমাদেরই বন্ধু । আমেরিকায় থাকে । তার সম্পর্কে একজন জানতে চাইলো আমার কাছে । কিছু বলতে পারলাম না । ওকি বাংলাদেশে এসেছে জানো তুমি ?
– এ খবর তো জানা নেই দাদা ।
– দেখোতো খবর নিয়ে ।
– জেনে অবশ্যই জানাচ্ছি দাদা ।
– পরাণ ভাইয়ের জন্য আমিও খুব কষ্ট পেয়েছি সিপু । অমায়িক ভদ্র লোক উনি । এক্ষনি শুনলাম বাস পুড়া মাডার কেশেও নাকি তাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছে । কি দিন কাল পড়েছে দেখো । যাও যাও কি কাজে যাচ্ছো যাও । ভগোবান
ভগোবান । হরি হরিরে হরি ।
এতোক্ষনে মাথাটা বো করে ঘুরে চক্কর দিয়ে উঠলো । জাকিরের দোকানটা খোলা আছে দেখছি হাত পঁচিশেক দূরে তার পরও মনে হচ্ছে পৌছতে
পারবোকি না ? কেউ একজন হাত দিয়ে ধাক্কা দিলেই পড়ে যাবো মাটিতে মনে হলো । দু দুটো বিষয় মুহুর্তের মধ্যে মনকে দূর্বল করে ফেলল । সব কিছু অন্ধকার দেখতে লাগলাম চোখে । কোনো কিছু গুছিয়ে ভাবতে পারছিলাম না । আগা মাথার কোনো পাড়ের নাগাল খুঁজে পাচ্ছিলাম না । অপহরণ থেকে মাডার । ওসি সাহেব যা বলেছিলো এরেস্টের সময় পরাণ ভাই সম্পর্কে ভুল কিছু বলেননি তবে উনি । একাধীক মামলায় পুতে দিয়েছে একেবারে । রাজনীতি কত নিষ্ঠুর কত পাষান হতে পারে তার দৃষ্টান্ত পরাণ ভাইকে দিয়ে বুঝলেই সব কিছু পরিস্কার হয়ে যাবে ।
এরি মধ্যে ঝড় শুরু হলো প্রচন্ড বেগে । ঝড়ের ধূলিকোনা এসে সর্ব শরীরে এলোমেলো করে ঢেকে দিলো মুহুর্তে । ওই অবস্থায় জাকিরের দোকানে গিয়ে উঠলাম দৌড়ে ছুঁটে গিয়ে এক লাফে ।
দুপুরে ঘুমিয়ে নিয়েছি মাতালের মত তার পরও ঘুমের রেশ কাটছে না এখনো । ঘুমের চোখেই জ্বালা ধরা কস্টে দেখলাম শান্তনার বাজার করা ব্যাগটা ওই অবস্থায় পড়ে আছে সেখানেই ।
ওতে দু দুটো থ্রী পিশ । একটা টাওয়াল আর নোকিয়া এনড্রোয়েড এক্সেল টু ঢুকানো আছে । বুকের কলজেটা কচ্ কচ্ করছিলো কেটে খাচ্ছিলো দু চোখ দিয়ে ।
এই প্রথম কোনো নারীকে ছুঁতে যাবে নিজের অর্থের কেনা সব পণ্যসামগ্রী । ওরা ওর শরীরে মিশে বলবে ওদের ভাষার কথা । ওরা এই সিপুর কেনা গোলাম । ওরা সিপুর গুনো কির্তন করবে ওর সর্ব দেহে মনে অঙ্গে অঙ্গে লেপ্টে থাকবে । ওরা ভালোবাসবে সিপুর হয়ে – গায়ে মনে মিশে মেখে থাকবে সারাক্ষন । অন্তরে অন্তরে সুখ স্বাচ্ছন্দে । চোখে মুখে অস্পষ্ট সুখের প্রতিছবিতে ভেসে ভেসে যেতে থাকবে বুকের নিতলে । হঠাৎ কি মনে হলো শান্তনার টুকরো কাগজটা খুলে পড়তে লাগলাম ।
সত্যি চোখের কোনে যেন একটুতেই মিষ্টি নিষিক্ত মধুর হাসিতে ছুঁয়ে গেলো সারা মন । বারবার মনে হলো প্রেম ভালোবাসার কেন্দ্র বিন্দুই হচ্ছে চোখ । তার পর চোখ থেকে নামতে থাকে মনে । এতোক্ষনে মনে পড়লো , প্রেম বিশ্বের প্রথম ভালোবাসার চোখ । তাছাড়া সব মিথ্যে সব কামনা সব কল্পনা বাসনা আসলে সব চোখেরই দাসত্বের বাধ্যবাধকতায় পরে থাকে কাল
কালন্তর ।
শান্তনার রুমের দিকে একটি বার চেয়ে দেখলাম । ভিতরটা জুরিয়ে গেলো শিতল হয়ে গেলো তৃষ্ণার্ত বুকটা । খুব নিরবে বেড়িয়ে পরলাম ছাত্র দুটোকে পড়ানোর উদ্দেশ্যে ।
দুপুরে ঝড় আর একটু বৃষ্টির ফোটা ফোটা গুড়ি হয়েছিলো ওতেই বিকেলটাকে মনে হচ্ছিলো অনেকটা প্রসন্ন আর হীমেল । ছাত্র দুটোকে পড়িয়ে যাচ্ছিলাম ভারি চমৎকার মিষ্টি মৃদু মৃদু হাওয়াতে মাথার চুল উড়ছিলো । চোখের সামনে এসে কিছু বারন্ত চুলে লাগছিলো মাঝে মাঝে তাই বুঝলাম চুল কাটার প্রয়োজনীয়তা । নিতায়ের কাছে চুল আর খোঁচা খোঁচা দাঁড়ী শেভ করে তার পর বাসায় ঢুকবো ভেবে আগেই ঠিক করে নিলাম ।
পরাণ ভাইয়ের বাসাকে উদ্দেশ্য করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম । পরাণ ভাইয়ের বাসায় ঢু মেরে তার পর অন্যদিকের পর্বে যা কিছু ভাবার করার করবো ভাববো । পরাণ ভাইদের বাসাটা পৌর ভবন ছেড়ে উত্তরে । বড় বাজার পেরিয়ে যেতে হয় উত্তর দক্ষিনে । অনেক কটা বাসা পেরিয়ে তারপর , পর – পর তিনটা গলি পথ ছেড়ে একটা ছোট্ট সবুজ ঘাসের মাঠের শেষ প্রান্তের মাথায় একটায় সুন্দর ছিমছাম বাসা । মাধূবী লতায় ছেয়ে আছে গেটের উঁচু দিয়ে গ্রীল ঘিরা রেলিং পর্যন্ত । এক তলা বাসা ওটায় পরাণ ভাইদের । দীর্ঘদিনের অনেক পুরনো সভ্রান্ত পরিবার । বাসার চারি ধার ঝক ঝক – চক চক করছে একেবারে । প্লাস্টার করা দালানের ভিতর বাহির কাউকে হাত ছোঁয়াতে দেয় না । চাচা নিজেই পরিস্কার করেন । সকাল বিকাল ভেজা কাপড় দিয়ে নিজেই মুছে প্রতিদিন । পরিস্কার করে দেখে কোথাও আবার ছুটে গেলোকিনা । শহরে হাবভাবে পরিবারটা এখনো অনেকের কাছে চোক্ষুসূল হয়ে আছে এই সমাজে । শিক্ষানুরাগী শহর ঘেঁষা বরাবরি বাপ দাদা পূর্ব পুরুষ আমল থেকে চলে এসেছে এ অবদি । পরাণ ভাইয়ের একটি মাত্র বড় ভাই ঢাকায় বিদেশী এক বড় কোম্পানীতে চাকরী করে । তাঁরও বড় পিঠাপিঠি দুই বোন তাঁরাও চাকরীজীবি । দুই বোনই বিয়ের পর শসুর বাড়ীতে এমন ভাবে চির স্থায়ী হয়ে গেছে যে ঘার ঘুরাবার এদিকে সময় নেই । এখন বাসায় রয়েছে শুধু মাত্র তাঁদের পিতা মাতার অথর্ব দুই প্রাণ । নিষ্ক্রিয় নির্জীব জীবন ধারণের মধ্যে শুধু এক টুকরো আশার আলো হচ্ছে পরাণ ভাই ।
বেল বাজালাম । বেল বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলো চাচা । দেখলাম একজন রিট্যায়ার্ডমেন্টে স্কুল মাস্টারের জীবনকে খুব কাছ থেকে । যেন ছুটে এলো ফর্সা ধব ধবে লম্বা গড়নের মানুষটা । কোনো কথা না বলে হাত ধরে ভিতরে টেনে নিয়ে গেলো সোজা ড্রয়িং রুমে । সালাম দিয়েছি বিন্দু মাত্র লক্ষ করিনি । ড্রয়িং রুমে চাচীকে দেখা মাত্র সালাম দিলাম । চাচার যেন বিলম্ব সয়ছিলো না । কথাকটা তখনি বলার অধির বড় অস্থির হয়ে গেছিলো বলবে তাই এমন ভাব করে বলল ,
– বসো বসো সিপু বসো । একটা বাবা মস্ত বড় শর্বনাশ হয়ে গেছে । তুমি বিশ্বাস কর আমি জানি না তোমাদের সাথে রঞ্জু নেই । কি ভুলটা করে দিয়েছি আমি বোকার মত । ওতো সব কটা টাকা আমার নষ্ট করে ফেলবে । ওকে অনেক গোপন কিছু জানিয়ে ফেলেছি । জানিয়ে ভুল করে দিয়েছি । মধু এসেছিলো মধুর কাছে শুনে তখন থেকে আমার মাথা খারাপ মাথা ঘুরছে ।
– ওকে টাকা দিয়েছেন ?
– দশ হাজার টাকা । ও ফরিদ এ্যাডভকেটকে নিয়ে গিয়ে দিবে টাকাটা ।
এখন কি হবে ! তুমি নিজে যাও কাল সকালে বাবা বিস্তারিত বুঝিয়ে বলে আসো । টাকাটাও সঙ্গে নিয়ে যেও । যদিও ফরিদ এ্যডভকেট বারবার বলেছে টাকা নিয়ে কোনো চিন্তা করবেন না কোন টেনশান নিবেন না । তার পরও
চাচা ও চাচী কাছে এসে
এর পর এমন কিছু গোপন কথা বার্তা বলল শুনে মাথা হেট হয়ে গেলো । অনেক সমাদ্রিত পিতৃতুল্য মুখটার দিকে চেয়ে , চেয়ে থাকতে নিজেরই কষ্ট হচ্ছিলো । ভিতর ফেটে যাচ্ছিলো যেন ভীষন জ্যৈষ্ঠ খড়া মাটির মত হয়ে । সব যেন উলোট – পালোট হয়ে যাচ্ছিলো । নিজেও জানি না নিজের ভিতর ভিতর কখন ফুঁসে উঠেছি । আগুন হয়ে গেছি ।
তবে কি সব কিছু শেষ হয়ে গেলো ?
হাজারও প্রশ্ন সামনে এসে ভীড় করতে লাগলো – চোখের সামনে শুধু দেখেই যাচ্ছিলাম হাজারো ধংশ লিলা । হিরোশিমা নাগাশাকির মত একাকটা ধংশ !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *