পরাণ ভাই । PART- 8 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART-8

———————–ঃ নাসের কামাল

শাল

কাঠের জানলা খোলে নদীর হাওয়া খাচ্ছে শান্তনা নিশ্চয় । ওকে ইচ্ছে করে নদীর ধারের রুমটা দিয়েছি । বাই চান্স কেউ এলে প্রথম রুমে ঢুকে দেখবে শান্তনাকে । যদিও সে রুম থেকে তাঁকে সরিয়ে ফলা সম্ভব তৎক্ষনাত কেউ এলেই । তদুপরি শান্তনার নারী সুগন্ধ থাকবে । থাকবে পরে হয়তো লম্বা কালো কেশ । ভুল করে ফেলে যেতে পারে রাবার ব্যান্ড অথবা চুল বাঁধা ক্লিপ । আরও হয়তো যা নারী আলামত আছে যা নিজেদের অগোচরে ভুল হয়ে যেতে পারে ভেবে ঠিক করা হয়েছে উভয় মিলে অবশেষে এ সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত শান্তনা থাকবে ।
আর দুটো রুম যে নিজের ফেভারেইট তা বন্ধু মহল থেকে আরম্ভ করে আর সকলে জানে । এ বিষয়ে বিন্দু মাত্র সন্দিহান নয় নিজে । এই রুমে বিশেষ সুবিধে হচ্ছে সহজে বাইরে যাওয়া আসা করতে পারা যায় । জানালা একটাই যদিও তবে দুই পাল্লার শাল কাঠের বেশ বড় । খুলে দিলে বাইরেটা চমৎকার ভাবে দেখতে পাওয়া যায় । মানুষের চলা চল , বাস ; রিক্সা থেকে শুরু করে সব ।
দীর্ঘক্ষণ হলো বাসায় ফিরেছি । তার মধ্যে একটিবার শান্তনা অনিচ্ছুক ভাবে দেখেছে । দেখে নিয়মিত নিয়মে ঢুকে গেছে ঘরে । ভাবছিলাম কাঞ্চনের ব্যাপারে । সে আসলে সব কিছু এ্যাট ফাষ্ট কি ভাবে ফেস করবে । হঠাৎ একটা প্রপাকান্ড ঘটিয়ে বসলে প্রেস্টিজের ব্যপার । ব্যপারটা খুব স্বাভাবিক নেই এখন ।
হরিহাট না হলেও অলমোস্ট জানে বেশ কিছু পারসোন্ । মহন্ত শ্রী খিতিশ নাথ আচারী পর্যন্ত যখন ব্যপারটা গড়িয়ে গেছে তখন জানে ব্যপারটা নিশ্চিত হয়ে গেছি এখন অনেকেই । তা আরও কত জন জানে নির্দিষ্ট ভাবে হয়তো জানছি না এ মুহুর্তে । একটা মুহুর্ত আসবে হয়তো সব জানতে পারবো । তখন নিজেদের ব্যপারটাও হয়তো আর সেভাবে গোপন থাকবে না । সঙ্গত কারনেই প্রকাশ পেয়ে যাবে সবার মাঝে । রাষ্ট্র হয়ে যাবে এই সিপু কত বড় অপরাধের সাথে সংঘঠিত হতে পারে , কত বড় কালপিট সমাজের ! খুব দ্রূত ঘনিয়ে আসছে দিন । কাঞ্চন এলেইতো সব প্রপাকান্ডের রেকর্ড বাজবে ।
সবে রাত্রি আটটা বাজলো দেয়াল ঘড়িতে শব্দ করে ঘন্টা দিলো । আরও কতক্ষন বাইরে যাপিত করা যেত সময় ।
কিন্ত কিছুতেই মন টানছিলো না । বারবার শুধু কি জন্য যে ঘরে ফিরতে চাইছিলো মন । ফিরে ফিরে টানছিলো হাত ধরে । এই অনুভূতি জ্ঞান হবার পর এই প্রথম উপলব্দী করলাম । এ না ফসিল অনুভূতি এ সর্বকালের সর্ব সময়ের চির নবীন সেরা অনুভূতি । বসন্তের ফাল্গুনী ফাগুন বেলার আগুন । জ্বলে নিভে – নিভে জ্বলে কেন ?
দেখার কেউ থাকেনি । একাকিত্ব জীবনের গল্প শুনবে এমন কেউ পাশে এসে বসে বলেনি একটি বার । বল শুনি।
আকাশ মাটি যে ভাবে ছুঁয়ে থেকেছে দূরে ঠিক সে ভাবেই অদৃশ্যের অদৃষ্টে হয়তো বলছে কেউ ,
– থাক সিপু তোর মত তোর ঘরে পরে ।
থাক বয়সটা আরো উপযুক্ত করে নে ।
বিয়ের অভিগ্যতা নিতে আরও পুক্ত হ তুই । ভালো মত চিন আরও নিজেকে ।
তুইতো ভূত একটা ।
ঠিক মনে হলো কে যেন কানের কাছে চাপা কন্ঠে বলল এক্ষনি ,
– তুইতো ভূত !
ঘোর কাটছিলো না । চারি দিক ঘুরে দেখছি । শুণ্য । ভীষন নিঃসঙ্গ একা জীবন নিয়ে আছি । কেউ কোথ্যাও নেই । নিজেকেও অনেকটা ভূত মনে হচ্ছিলো ।
হঠাৎ বুকটায় কেউ যেন চেপে ধরলো মনে হলো । এই ভূত চেনা , অতি পরিচিত ভূত । ফসিল ভূত হলে চেনার জন্য মাধ্যম লাগতো । কোন একটা ওঝা ধরে আনতে হতো । অথচ কোন মাধ্যম ছাড়ায় চিনেছি শান্তনাকে । শান্তনা এখন মাঝে মাঝে বুকের উপর উঠে বসছে । বুকে উঠার দর্শন আছে যথাপুযুক্ত তাঁর ।
শান্তনাকে দুটো পোষাক দেয়া হয়েছে তার একটিও পড়েনি । কেন পড়েনি জিজ্ঞেস করা হয়নি যদিও । এটা ভেবে মনের অস্থিরতা দিগুনের চেয়ে দিগুন বারছে প্রতি সেকেন্টে । প্রতি মুহুর্তে হ্নতপিন্ডে উঠা নামা করছে অস্বস্তিকর খুব চেনা সেই কালো ভূতটা । কি আশ্চর্য নিজের পছন্দে অতো চমৎকার আর মিষ্টি বেগনী কালারের অতি ভিন্ন অধুনিক মডেলের সালোয়ার কামিজ তার মধ্যে একটি থ্রী পিস তার একটিও পড়েনি । পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার পরে কিন্ত তাঁর প্রয়োজনে তাঁকে তো পড়তে হবে ? ভীষন রাগ জন্মালো ভিতরে । কি ভেবে শান্তনা এতো বড় অন্যায়টা করলো । কেন করলো কি ভেবে করলো । ভাবতে পারছি না । এর অবশ্য নিরব একটা প্রতিকার রয়েছে আর সেটায় হবে তাঁর জন্য যথাপুযুক্ত প্রতিকার । মনে মনে ঠিক করলাম কাল অতি ভোরে একটা পত্রে বিস্তারিত লিখে সকালের ট্রেন ধরে চাঁপাই নবাবগঞ্জ পরাণ ভাইয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা দিবো তাতে শান্তনা যাই ভাবুক । তাছাড়া রাত্রের ডিনার সহ কাল সারা দিনের ব্যবস্থা বর্তমান করেই নিয়ে এসেছি । ওর ব্যাপারে ও ছাড়া নিজেরও টেনশন ফ্রি অনেকটা টেনশন মুক্ত লাগছে । কিন্ত রাত্রের ডিনার ভাবতেই ব্যপারটা অন্যরকম ঘটে গেলো । দর্শনের প্রতিক্রিয়া হলো ভিতরে । শান্তনা এখন পর্যন্ত খায়নি । ভাবতেই ইন্দ্রিয় একটা শক্তি দমরে মুচড়ে দিলো নিজের ভিতরের সেই কালো চেনা ভূতটার মুখটাকে । থোতা মুখ ভোতা করে দিলো এই সিপুর ভূতটা ।
ও বড় অসহায় অবলা নিরুপায় মেয়ে এখন । ওকে নিয়ে তামাশা মশকরা ওই সব ফাজলামি চলবে না । এক মুহুর্ত বিলম্ব নয় – কি হয়েছে শান্তনার এখনি জানতে হবে ? শান্তনার জন্য ক্রয়কৃত ব্যাগটির সবকিছু হাতে নিয়ে ওর রুমে ঢুকতেই ওর অনুমতি চাইলাম ।
– মে আই কামিং শান্তনা ।
একটু সময় নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলাম শান্তনা নিরুত্তর । ডাকলাম ,
– শান্তনা ।
– সিপু ভাই কাম ।
– ইউওর আফসেট ?
– ক্যান হ্যাপেন ।
– তুমি মোবাইলটা এখনও বাক্স বন্দি করে রেখেছো দেখছি । পোশাক দুটোই কি তোমার পছন্দ হয়নি শান্তনা ?
– আপনার পছন্দ আছে সিপু ভাই । বেগুনী কালার আমার অন্তত লোভনীয় কালার । কি ভাবে ডিসাইড
করলেন এটা ?
শান্তনা কাঁদছিলো নিজেকে আড়াল করে নিয়ে । এতোক্ষন সাভাবিক হতে তাই এতোক্ষন সময় নিলো । এখন ওর সঙ্গে পেরে উঠা মুশকিল হয়ে যাবে । অন্ধকার পূণর্ভবাকে দেখছিলো তাঁর নীল নিষিক্ত নয়নে । পূণর্ভবার বুকে দেখছিলো তাঁর অতীত দিনের কৈশোরকে । তাই নিরবে নদীর সাথে একাকার হয়ে গেছিলো
কতক্ষন শান্তনা । খুব সাভাবিক যেভাবে বলি ও ভাবেই বললাম শান্তনাকে ,
– কাঞ্চন যোগা যোগ করেছে আজ ?
– না !
– ও তোমার চোখ দেখেই বুঝছি ।
কম্পিউটারটা তুমিও খোলনি ?
– এখনো খোলা আছে । লাইনে নেই সারাদিন কাঞ্চন । তাছাড়া —
-হু বুঝছি । পিকুলিয়ার ব্যপার সেপার । আচ্ছা ছাড় সব এক্ষনি ওকে রিং দাও ।
ব্যাগ থেকে বেড় করে আনলো নতুন মোবাইল স্কিন টার্চ । শান্তনা বারণ করলো ।
– থাক সিপু ভাই ।
– এটা এখন থেকে তোমার । নতুন নম্বর । ও বুঝবে না । দাও রিং চোমকে দাও
ওকে ।
গুড আইডিয়া মনে হলো শান্তনার কাছে এটা । প্রফুল্য হয়ে হাত বাড়িয়ে নিলো মোবাইল ফোনটা ।
স্কিন টার্চ মোবাইল ইতিপূর্বে ব্যাবহার করে অভ্যেস হয়ে আছে । তবে কথা আছে ব্রান্ড নিউ বলে কথা । প্রথমে একটু নেড়ে দেখলো । এর পর মুখস্থ নম্বর টিপলো মেশিনের মত । রিং বাজছে না । সংযোগ বিছিন্ন শোনালো । তার পরও ট্রায় করলো বেশ কয়েকবার । অন্য নম্বরে ট্রায় করলো পেলো না ।
নিজে মোবাইল থেকে একাধীকবার একাধীক নম্বরে কাঞ্চনকে লাগালাম সেখানেও নিস্ফল প্রচেস্টা । হতাশ অনেকটা নিজেও হয়ে পরলাম । বুকের মধ্যে হতাশার টিকটিকিটা আজ অনেক দিন পর দেখলাম এই সিপুকে ছেড়ে দৌড়াচ্ছে । ছুঁটছে আপ্রান গতি ধরে রেখে । এটা এই সিপুর বার্তা বাহকের ডিউটি পালন করার খুব obedient ব্যক্তি । অনেক দায়িত্বপূর্ণ এবং নিষ্ঠার সঙ্গে ডিউটি পালন করতে গিয়ে কখনো দেখেনি অমর্যাদা করেছে । বুকটা কম্পন করে হাত থেকে মোবাইল ফোনটা পরে যাচ্ছিলো মাটিতে । কোন ভাবে আটকাতে গিয়ে দূরে ছিটকে পড়লো । শান্তনা অপলক দেখেছিলো সেই এক ভাবে এইদিকে । এবার তাঁকেও দেখলাম কেমন বদলে গেলো । অপরুপ লাবন্য ভরা মুখটা একটূ মলিন মায়া মাখা হয়ে পলাতক মেঘের শুভ্রতায় ঢেকে নিচ্ছিলো নিজেকে ।
ভাবছিলাম এ রকম একটা পরিস্থিতি থেকে শান্তনাকে কোন উপায়ে কোন ভাবে অন্যকিছু ভাবাতে হবে । এবং নিজেকেও একটু সাভাবিক হতে হবে তাঁর দৃষ্টি থেকে । তার পূর্বেই শান্তনা প্রশ্ন করে বসলো ,
– আবার Try করে দেখি সিপু ভাই ।
– না । ওর দরকার পরলে ও দিবে । স্টোপিট ননসেন্স তুই বেটা পরের ঘরে হব বউ রেখে ঘোড়া ছুটাস রেশের ময়দানে গিয়ে । তোকে খুব ভালো মত চিনি কাঞ্চন । তোকে হারে হারে চিনি ।
– কাঞ্চন ঘোরা চালাতে জানে না সিপু ভাই ।
– জানে না শিখবে । আর রেশের ময়দানে কেউ কি ঘোড়া চালায় , গিয়ে কি করবে ,দেখবে । গর্ধোবটা দেখতেইতো গেছে । ও গবেট না হলে রেশের ময়দানে যায় ?
– তাই বলেন ।
– তুমি তার জন্য তোমার কমিটমেন্ট রক্ষা করবে না এটা মানতে
পারছি না । এখন রাত বেশী হয়নি । কাল খুব সকালেই ট্রেন ধরে পরাণ ভাইকে দেখতে যাবো । তুমি এক্ষনি পোশাক বদলে আসো তোমার অভিনয় দেখবো , গান শুনবো ; কবিতা
পাঠ হবে ।
– কবিতা পাঠ ! না । না সিপু ভাই ।
– আশ্চর্য সব পারো কবিতা পাঠে এমন বৈরী ভাব কেন , কবিতা বুঝ না তুমি ?
– ওটা সিপু ভাই আমি পারি না । আমার দারা হবেই না । পারলে নিত্যের মুদ্রা দু একটা দেখিয়ে দিব ।
– সে দেখা যাবে । যাও ফ্রেস হয়ে এসো । কুইক । গো ।
– ওকে
শান্তনা এইবার ব্যাগ ধরে নিয়ে গেলো নিজের মনেই । ও চলে গেলে আবার অনেক কটা বিষয় একত্রে ভেবে নিচ্ছিলাম । আর এই ভাবতে গিয়ে মনে হলো এখন প্রত্যেকটা মুহুর্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ ।
তাই ফালতু সময় যাপিত করার মত এখন সে মুহুর্ত নেই । খুব মেপে পা ফেলতে হবে ।
এক ঘন্টা সময় দিব মাত্র শান্তনাকে ।
এর মধ্যে নিজে একটি কবিতা পাঠ করবো । ওকে সব বিষয়ে প্রোভাইড করলে বোরিং লাগবে । টুকরো কাগজে লিখা ওর ছোট্ট চিঠিটা –
কবিতার আগে পড়ে শুনাবো , না কবিতা পাঠ করবো এটাও আগে ভেবে নিচ্ছিলাম । কার কবিতা , সুনীল , সুকান্ত ; রবীন্দ্রনাথ না বড় ভাই নাসের কামালের ? অনেক ভেবে চিন্তে প্রিয় কাঙ্ক্ষিত প্রান্তিক সিদ্ধান্তে উপনিত হলাম । এর আগে সারথী সাহিত্য বাঁসরের আবৃতি প্রোগ্রামে যে কবিতাটি নাসের কামাল ভাই এর আবৃতি করেছিলাম সেটা ফাইনাল করে ফেললাম ।
ভেজা চুল নিয়ে ঢুকলো শান্তানা । বিদূৎ চমকার মত চমকে গেলাম ওকে দেখে ।
যে কোন নারী ভিজলে সুন্দর লাগে তবে শান্তনার ক্ষেত্রে আরও ধারনা বদলে দিলো । মেয়েরা সাজ গুজ না করে এতো সুন্দর হয় ওকে দেখে আজ প্রথম বুঝলাম । তার পরও মনে হলো কাল চাঁপাই থেকে ফিরে হাবুয়ার দোকান থেকে কিছু কশমেটিক্স নিয়ে তার পর ঢুকবো বাসায় ।
অনেক কিছু ভেবে চিন্তে ঠিক করে ছিলাম কিন্ত সব কিছুকে ছাপিয়ে নিজেই কেমন উদ্যম চঞ্চল প্রকৃতির মত অবাক করে দিয়ে নাচতে লাগলো । মুখে গুনগুন করে গাইছিলো কি একটা গানের সুর । নিত্যের তালে ছন্দে আর গানের মধুরতায় একাকার হয়ে গেলো ঘরের পরিবেশ ।
অনেক গুনে গুনানিত শান্তনাকে এখন দেখে মনে হলো । রিতিমত প্রশিক্ষিত নিত্যের মুদ্রায় অঙ্গে বুকে ঢেউ তুলে দেখিয়ে দিলো কেমন পারে ও । হঠাৎ শুরু করেছিলো হঠাৎ করেই আবার থেমে বলল হিপতে হিপতে ,
– প্রেকটিস নেই । আজ এ পর্যন্তই ।
– অসাধারণ , অদ্ভূত ! যতটুক দেখিয়েছো নিঃসন্দেহে কি বলবো – মাইনড ব্লোয়িং । তোমার সাফল্য কামনা করি । দেখো কাঞ্চন এলে ঠিকি বলবো ওর পাশে পাশে থাকবি । ওর কাল্চারাল সাইড থেকে তুই কখনো সরে দাঁড়াবি না ।
– ছি আমি নেচেছি বলে দিবেন এ কথা সিপু ভাই ।
– তুমি চিঠি দিয়েছো এটাও বলে দিব ।
– একদম না সিপু ভাই ।
– আপত্তি না থাকে তো একটু কাছে আসো ।
– ভয় করছে ।
– ভয় ভেঙ্গে দিবো তোমার ।
– প্রত্যেকটা রাত্রেই ভয় পাচ্ছি ।
– একটা রাত মাত্র কাটালে বড্ড বেশি ভুল বকছো । এখানে কোন ভয়ের কারণ নেইতো ।
– জানি না সিপু ভাই ।
– এডভান্চার জীবেনের বায়ুন্ডারিতে দাঁড়িয়ে যদি তুমি ভয় পাও তবে এ অধমটার কি হবে ।
– এই যে , এখন খুব ভয় করছে ।
– কাছে আসো দেখবে ভয় ভেঙ্গে গেছে ।
সাহসের সঙ্গে শান্তনা এগিয়ে গেলো সিপুর দিকে ধিরে ধিরে । সিপু তাঁর হাতের ডানা দুটো আলতো ছুঁয়ে বসিয়ে দিলো খাটে । দিয়ে শুধু বলল ,
– চোখ বন্ধ কর ।
– ভয় করছে সিপু ভাই ।
– এখানে কোন ভয় নেই তোমার ।
– তবুও
– না । বলছিতো তোমার ভয় নেই ।
শান্তনা নিরবে চোখ দুটোকে বুঁজে দিলো । সপে দিলো ওর ভাগ্যের হাতে । সম্পর্ণ করলো দেখলাম ও নিজেকে । ওর নিস্পাপ মুখটার দিকে ক্ষুনিক নিষিক্ত চেয়ে আবৃতি করতে লাগলাম নাসের ভাইয়ের কবিতাটা ।
অস্তিত্বের সুখ
———- নাসের কামাল
অতো বড় পৃথিবীর মধ্যে ,
আরও একটি দেখিনি নিজের মধ্যে ।
তাইতো ভাবিনি ,
কোথায় গেছো কত দূরে ।
এ পৃথিবীর মাটি ,ঘাস ; আলো , বাতাস ; এ সব কিছুর মধ্যেই
আছো ফের ঘুরে ফিরে ,
আছোতো বেঁচে ?
কোথাও হয়তো একটু বৃষ্টিতে
ভিজে গেছো ,
কোথাও একটু রৌদ্রে
রৌদ্র মেখে গেছি ।
এ পৃথিবী ছেড়ে এখনো যাইনি কেউ –
এখনো চোখে , মুখে ; হাতে
সর্বাঙ্গে লেগে আছে
সেদিনের প্রেমটুকু ,
এখনো শরীরের ছোঁয়াটুকু
ধুয়ে মুছে ফেলতে পারিনি কোনো বর্ষাতে ।
খুব ভেবে দেখো ,
এ পৃথিবীটায় বিচ্ছিন্ন করেনি
এতোদিন !
বেঁচে থাকো দীর্ঘজীবি হও ,
আরও কটা বছর
আরও আরও
আরও বছর পেরিয়ে বেঁচে থাকি –
এখনো বর্ষায় হাত রেখে ,
এখনো আলো আঁধার গায়ে মেখে ;
দুজনেই –
কোথাওনা কোথাও চলছি ।
যেখানেই থাকো –
এ পৃথিবীতে আছো জেনে ,
এখনো ভালো লাগে ।
শান্তনা কাঁদছিলো । ওর দু চোখ ভিজে অশ্রু গড়িয়ে যেতে দেখলাম । চিবুক বেয়ে ফোটা ফোটা অশ্রু বিছানার চাদরে পরলো টপ টপ করে । এক সময় ছোট বাচ্চাদের মত করে কাঁদতে লাগল । ওর কাঁন্না দেখে বারবার শুধু মনে হলো । ওর এই ভাগ্যের জন্যে কাঞ্চন দায়ী । কাঞ্চনের জন্যে সারা জীবন মাশুল দিবে এই নিরাপরাধ নিস্পাপ মেয়েটা । অনেক কাঠ খোড় পুড়াতে হবে ওকে । অনেক লাঞ্ছনা গঞ্জনা অপবাদ সহ্য করতে হবে ওকে । ওকে কোন কিছু বলে এ মুহুর্তে শান্তনা দিলাম না । ও আরও কাঁদুক । ওর কেঁদে কেঁদে হালকা হোক বুকটা । ও নিজে নিজে বুঝুক ওর ভুলের নেই কোন পরিত্রাণ । নেই দোরজা খোলা কারো । নেই কোন সমাধান । নেই কোন ক্ষমা ওর জীবনকে প্রতোক্ষ দেখে আর সমাজের মেয়েরা একদিন শিক্ষা গ্রহণ করবে । ওর ভুল সিদ্ধান্তকে সমাজের অন্য মেয়েরা উপলব্ধী করে ঘৃণা করতে শিখবে । প্রত্যাক্ষান করতে শিখবে এ সমস্ত ভুল সিদ্ধান্তের ব্যক্তিদের এ সমাজে কোন স্থান নেই । সমাজের দু একটা এমন ভুল ঘটনা উর্তি অগনীত অসংখ্য জীবনের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে
চিরন্তন ।
খোলা জানালার কাছে গিয়ে
দাঁড়ালাম । পূণর্ভবাকে দেখলাম একটা কালো চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছে তাঁর সুন্দর ন্যাংটাকে রাত্রিটা । তার মধ্যে তার গায়ের জলে ভিজছে ওই সুদূরের চন্দ্র আর তাঁরার অসংখ্য উযুত নিযুত আলোর জোৎসনা । ওই জোৎসনা আঁধারের নিবীড় মাখামাখি দেখছিলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ।
শান্তনার কাঁন্না থেমে গেছে । এই নিরবতার পর সে কখন উঠে এসে পাশে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি । ওর মৃদু কন্ঠ শুনে ঘুরে দেখি শান্তনা দাঁড়িয়ে আছে খুব ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গের কাছে । বেগনী পোশাকে এতো সুন্দর এতো অপরুপ মিষ্টি একটু আলাদা অন্যরকম লাগবে কখনো ভাবতে পারিনি ওকে ।
পৃথিবীতে এতো রুপ এতো মধুর মাদকতা সৃষ্টি করতে পারে এটাও কখনো ভাবিনি জীবনে । আজ এই প্রথম এতো কাছে এতো অন্তরঙ্গে কোন নারীর সান্নিধ্য পেয়ে নিজের মধ্যে ঠাঁই আছি কে জানে কে বিশ্বাস করবে কেউ নেই কোনো জাস্টিজ নেই এখানে । শুধু শান্তনার কথা শুনতে পেলাম কানে এসে পৌছলো ,
– এখানে দাঁড়িয়ে আমিও গতকাল দেখেছিলাম নদীটাকে ।
– ঐ পাড়টা দেখো দেখা যাচ্ছে না তবু কি চমৎকার লাগছে দেখতে ।
– ওই যে ওটা কি জ্বলছে মিট মিট করে দেখা যাচ্ছে সিপু ভাই ।
– মাছ ধরছে নৌকায় করে । লিয়াকত নাম সিনিয়র ভাই । ছোট থেকেই এই ভাবে ডিঙি করে মাছ ধরবার তাঁর অভ্যেস দেখেছি । এটা এখন পেশায় পরিণত হয়ে গেছে তাঁর । আবার কি জানো , সে একজন ভালো কবিরাজ । বিনিময়ে কারো থেকে কোন টাকা গ্রহণ করেণ না । এটা তাঁর কত বড় গুন আল্লাহই ভালো জানেন । আর কি জানো এই নদীর একটা সুরঙ্গ পথ রেয়েছে এই সুরঙ্গ পথ দিয়ে লক্ষন সেন ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বীন বখতিয়ার খিলজির কাছে আক্রান্ত হয়ে চলে গিয়ে উঠেছিলেন সাড় ব্রুজে । সাড়ব্রুজটা দেখেছো ওটা উঁচু একটা ঢিবি ওর অদূরেই একটা গম্বুজ আছে দেখেছোতো । আর ওই সাড়ব্রুজের ভিতর দিয়ে এই নদীর সংযোগ । এই নদীতে এসে সেই সুড়ঙ্গ পথটা ঠেকেছে ।
– আমার শুনেই গা ছম ছম করছে সিপু ভাই ।
– আরও কি জানো এই নদীতে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস রয়েছে ঐ সাড়বুরুজকে ঘিরে । আর মূলত বহু প্রাচীন ইতিহসের সঙ্গে রহণপুরটার মিল খুঁজে পাওয়া গেছে । মৌঘোল আমলের আগেও এই রহণপুরটা আরও উন্নত চাকচিক্য শহর হিসেবে ছিলো ইতিহাস বলে । সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এই পূণর্ভবা নদী আজও বহমান । একটা সময় হবে এগলো বিষয়ে পর্যাক্রমে বিষদ ভাবে বিস্তারিত আলোচনা করবো ।
– এই নদীতে অনেক গোসল করেছি ছোটতে । তখন শুনতাম আমরা মমেনা পাগলি রাত্রে এই নদীর কুলকুল দৌড়াতো ।
– দানা স্বর্ণকারের মেয়ে । সিনিয়র ছিলো আপা । খুব শ্রদ্ধা করতাম । সবাইকে আদর করতো খুব – যখন ভালো সুস্থ ছিলো আপা । আহা হঠাৎ করেই একদিন নিখোঁজ হলতো হলোই । অনেকেই বলতো এই নদীর সুরঙ্গ দিয়ে কোন দিকে চলে গেছে তো গেছেই আর ফিরেনি !
– আমার শরীর কাটা কাটা হয়ে গেলো । থাক সিপু ভাই । ভয় করছে ভীষন আমার ।
– ভয় এক সময় নিজেও করেছি এখন কিছু মনে হয় না আর । তবে আজকে নিজেকে কেমন যেন একটা লাগছে মনে হচ্ছে ।
ঠিক ওই সময় বিদ্রূৎ হঠাৎ করে চলে গেল । মুহুর্তের মধ্যে সবকিছু আন্ধকার দেখতে লাগলাম । বুঝতে পারলাম শান্তনার নরম শরীরের স্পর্শ ছূঁয়ে গেলো মনের নিতল মহল পর্যন্ত । ছূঁয়ে গেলো পৌরষের অস্তিত্বের শেষ সম্বলটুকু । তবু নিজেকে সংযোত রেখে অপেক্ষা করলাম নিজের মধ্যে । শান্তনার ভেজা ভিতু কন্ঠের শুধু আওয়াজ শুনলাম নির্বিকার নিভৃতে ,
– সিপু ভাই আমার দেয়া চিঠিটা আপনি পড়েছেন ?
– পড়েছি শান্তনা ।
– অতোটুকু পেয়েছি বলেই নিজেকে এখন আর ভাবি না কেউ ছিলো না এই হতভাগার । কিন্ত যখন ভাবি তুমি কাঞ্চনের যখন ভাবি তুমি পবিত্র । যখন ভাবি তুমি ছোট অবুজের মত অনেক কিছু অকপটে বলে দিতে পার । যা সুস্থ সাভাবিক হলে কখনোই প্রকাশ করতে না ওভাবে তুমি ।
শান্তনার নরম হাত নড়ে উঠতেই বুঝলাম সে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে । সে আত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে উচ্চারণ করল কটা কথা ,
– সিপু ভাই এই চিঠির কথা কাঞ্চন জানলে আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাবে ।
– এমন খারাপ কিছু লিখোনি তো তুমি ।
– এখন বুঝছি সেটাও ভালো না সিপু ভাই ।
– কাঞ্চনকে বলার প্রয়োজন মনে করিনি কখনো । কাঞ্চনের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ না হয়ে যদি এই হতোভাগার সাথে সাক্ষাৎ হতো তুমি লিখেছো ভালোবাসতে । এই হতভাগার জন্যে এইকি কম বড় উপহার শান্তনা । সত্যি কি বলবো তোমাকে প্রাপ্তি স্বীকারের কোন পথ যদি খোলা থাকতো তবে এই ভাবে না । সবার সামনেই উচ্চস্বরেই বলতাম তুমি উপযুক্ত । তুমি এই হতভাগার সহধর্মীনী হবার জন্য উপযুক্ত যোগ্য এক মাত্র নারী ।
– এক্সেম্লি সরি সিপু ভাই ।
– বললামতো ও তোমার নির্বুদ্ধিতা । তোমার । তোমাদের ভুলের মাসুল দিতে হবে এখন এই হতোভাগাকে । কত অসমপ্ত কাজ পড়ে রয়েছে । পরাণ ভাইকে ছাড়ানোর ব্যাপারে এখন কত কি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে নিজেকে । নিজেও জানিনা । বিগত দিনের মিটিং এ পরাণ ভাইয়ের এক গাদা অসমাপ্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে জানি । এখন অতোগুলো সিদ্ধান্ত একত্রে চোখের সামনে ঝুলছে কিভাবে বাস্তবায়ন হবে নিজেও কোন কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছি না । এ মুহুর্তে তোমাদের বিষয়ে দারুণ ভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েছি । । তাছাড়া কোন ভাবে যদি একটা দূর্ঘটনা ঘটে যায় বাইচান্স তাহলে সমাজের কাছে মুখ দেখানো সম্ভব হয়ে উঠবে না আর নিজেকে বুঝে গেছি ।
শান্তনার মনের আবস্থা দেখে যতটুকু বুঝলাম সে এখন অনেকটায়
সাভাবিক । হঠাৎ বিদ্রূৎ জ্বলে উঠল । আলোয় সবকিছু আবার ঝলমল করে উঠলো । সে সুস্থ সাভাবিক ভাবেই মনে হলো এবার তাঁকে প্রকাশ করলো ,
– সিপু ভাই কোই একবারও তো বললেন না আপনার এই পোশাকে আমাকে দেখাচ্ছে কেমন ?
দেখলাম এবার তাঁর প্রকৃত সুন্দরটা । চোখ ফেরাতে পারিনি শান্তনার সুন্দর থেকে । তাঁর প্রকৃত রুপের কোন খুত খুঁজে অতৃপ্ত করতে পারলোনা মনকে । শুধু বারবার মনে হয়েছে এ কি অপরুপ রুপ নিয়ে জন্ম নিয়েছো তুমি শান্তনা । খুব মনে হলো এই হতভাগার পোশাক কেন ? বিশ্বের দামি পোশাক খুলে ফেলে দিয়ে চটের বস্তা পরে থাকলেও তুমি চির সুন্দর । তুমি অনন্যা । তুমি এ অন্তর রাজ্যের বিশ্ব সুন্দরী । তোমাকে এ সমাজের হায়েনার দল পেলে ছিড়ে খাবে । তোমার অঙ্গ পতঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে দিবে এক নিমীষে । এ সুন্দর আমানত কি করে সংরক্ষণ করবো এটা নিয়ে দুঃচিন্তায় আছি । বড় ভাবনায় ফেলে দিয়েছে কাঞ্চন । বড় উৎকন্ঠায় ফেলে দিয়েছো শান্তনা । দেখছো না কি ভাবনায় পড়েছি । ভাবছো মজায় আছি আর ভরা যৌবন সামনে নিয়ে এসে দেখিয়ে বলছো , কেমন লাগছে ? ফাজিল মেয়ে ! তার পরও ওর সুন্দর মিষ্টি লাবন্যময় মুখের দিক থেকে চোখ অপসরণ করতে চাইছিলো না মন । তাঁর চোখে চোখ রেখেই তাঁকে বুঝাতে হলো সে কত সুন্দর ! সে কত অপরুপা !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *