পরাণ ভাই । PART- 20 Naser Kamal

পরাণ ভাই ।

PART- 20

 

———————–ঃ নাসের কামাল

গল্পটির স্থান , কাল ; পাত্র ও কাহিনী এমন অনেক কিছুই কাল্পনিক :-

পরাণ রাত্রের আগেই গুছিয়ে নিয়েছিলো সবকিছু ।

রাত্রের প্রথম ভাগেই আমির আলীকে বুঝিয়ে দিলো সেই কিশোরীকে । কিশোরী আমির আলীর তত্ত্বাবধানে চলে গেলো নির্ভয়ে । মড়লের বাড়ির সামনে ভীষণ আতসবাজি ফাটাফাটির শব্দ । কিছু উর্তি ছেলেপিলে মিলে সে সবে মত্ত ছিলো । খুবই বেপরোয়ার মতো অঙ্গ নিত‍্যে মেতেছিলো কেউ কেউ । ছোটরা ধিতাং ধিতাং নাচছিলো । কারণ এই দিনটি মড়ল সবার আনন্দ ফুর্তি করবার জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছিলো অনেক আগে থেকেই । করবার বিশেষ কারণও ছিলো । ইন্টারটেনমেন্ট এর জন্য মড়লের অপকর্ম গুলো ভুলে যাবে । এইরকম ব্যবস্থা গ্রহণ সাধারণত প্রাইভেট কোম্পানি গুলোতেই করে থাকে নিয়মিত প্রতি বছর । তাঁদের অর্গানাইজেশন সহ পরিচিতি ও সেল ডেভেলপ ভেলু বাড়িয়ে তুলতেই বড় কোনো হোটেলে বছরে অন্তত একবার পার্টির ব্যাবস্থা করে থাকে । আমোদ প্রমোদ করবার জন্য পার্টিদের নিয়ে কখনো কখনো বড় বড় নান্দনিক পার্কে গিয়ে থাকে । অনেকটা সে রকমঃ মড়লের কাজ কারবার অনেকটা তেমনি দেখে মনে হলো । তার এই নবান্নের পিঠা পার্বণ সেই ধরনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছিলো । হরেক রকমারীর পিঠা শিল্পের উত্‍সবে , ঘোষনা হয় বিশেষভাবে বিজয়ীদের নাম বেশ জোরেশোরেই । পিঠা অনুষ্ঠিত প্রদর্শন মড়ল নিজে উপস্থিত থেকে তার দলবল সহ নিয়ে করে । এবং নিজে উপস্থিত থেকে পুরস্কৃত করে বিভিন্ন ক‍্যাটাগরিতে । এই জন্য সবার একটা পূর্ব প্রস্তুতিও থাকে ব‍্যপক রকম । ওদের মধ্যে প্রচন্ড উন্মাদনা । মড়লের গোলা ঘরের সামনে হরেক রকমের পিঠা , পাটিশাপটা ; আন্দাশা ভাপা পিঠা ইত‍্যাদি খাদ্যের সামগ্রী ঝাঁকাতে নিয়ে বসে আছে অনেকে । অনেকেই আন্তরিকতায় আনন্দের সঙ্গে খাচ্ছে কিনে-কিনে । এমন আনন্দ উন্মাদনা প্রত্যেক বছরই হয়ে থাকে । এ বছর আনন্দের মাত্রাটা একটু বেশী পরিমাণে হচ্ছে এই মাত্র । আকাশে আতসবাজি ফাটাতে খুব সম্ভবত কিছু ছেলেপিলে মিলে আগে থেকেই সংগ্রহ করে নিয়ে রেখেছিলো রকমারী কিছু আতসবাজি । সেটাই হবে হয়তো ? আকাশে ছুটছে আগুনের ফুলকির মতো মাঝেমাঝেই । মাঝেমধ্যে হৈ করে উঠছে । নানান বয়সের হৈ হুল্লোড় মড়লের গলিতে চলছে ভীষণভাবে । প্রচন্ড ঠান্ডাকে অতিক্রান্ত করে নতুন রঙবেরঙের পোশাক পড়ে ঘুরছে সকলে সেখানে । কিছু বয়স্ক লোক কাঁড়ি পোয়াল জ্বালিয়ে গোল করে আগুনের উত্তাপ গ্রহণ করছিলো অদূরেই । বুঝা গেলো নিম্নচাপ আবহাওয়া উপেক্ষা করে মরণপুরের উন্মাদনা ছিলো সবার মনে-মনে ।

পরাণ এক বিশ্বস্ত রোগীর বাড়ির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে ছিলো । সেখানে একজন বয়স্ক সাঁওতাল সহ তার কিশোরী বয়সের একজন মেয়ে ও আমির আলী দাঁড়িয়ে ছিলো । সবার চোখে মুখে ভীতিকর চাহনি । এই কিশোরী মেয়েটি তার বান্ধবী । তার কাছে একটু এগিয়ে গেলো । ওর শরীর স্পর্শ করলো । মৃদু স্বরে বলল ,
– ভালা থাকবিক লা !
এর বেশী কিছু না । ও শুধু চোখ দুটোকে নড়ালো । এমন সময় মেয়েটির বাবা পকেট থেকে একটা ময়লা ন‍্যাকড়া বেড় করে নাক মুছে বলল ,
মড়ল না ছাড়বেক তুকে ডাক্তার । হামাদের লিয়ে লা মারবি তু ? সেদিকে একটুও কর্ণপাত করলো না পরাণ ।
তাঁর মধ্যে যে ব্যস্ততা কাজ করছিলো সেখানেই মনস্থ ছিলো । সেও আমির আলীকে নিচু স্বরে বলল ,
– বিড়ি কোথাও খেওনা । আর কি হলো সিপুকে রিং দিতে বলো মনে করে । যাও । বেরিয়ে যাও । আমির আলী বেরিয়ে যাবার সময় বিড়ির টান জোরেশোরে দিয়ে পায়ের নিচে দাবন দিলো । যেন মনে হলো আর কখনো ধূমপান করবেনা । ধুপধাপ কিশোরীকে নিয়ে হাঁটা ধরলো । কিশোরী মেয়েটি ঘুরে দেখলো । পরাণ মেয়েটিকে ছোট্ট একটি কথা বলে আসস্থ করলো ,
– তুমি যাও মা । আমার আব্বা-আম্মার কাছে তোমার খারাপ লাগবেনা । যাও । ভয় করোনা । মেয়েটার প্রস্থান মুখটা ভালো করে দেখলো । নির্ভীক মনে হলো পরাণের । দ্বিতীয়বার আর ফিরে দেখলো না । ওর শরীর ছদ্মবেশী পোষাকে মোড়ে ছিলো । বেড়িয়ে গেলো সম্মুখ দরজা দিয়ে । আজ লক্ষ করবার মতো তেমন ভয় ছিলোনা কোথাও । ওদের কেউ সন্দেহ করবেনা এমন একটা মুহুর্ত ছিলো । বেশকিছু কিশোরী মেয়ে সেখানে ঘুরাঘুরি করছিলো তখনো । তার মধ্য দিয়েই আমির আলীরা সুড়সুড় করে পাশিয়ে গেলো । পরাণও ব্যস্ত হয়ে উঠলো । ও বলল ,
– রোগীর কি হলো জানাবে তোমরা । কাল আসছি আবার । চিন্তার কারণ নেই ভালো হয়ে যাবে । আমি আসি । পরাণ হনহন করে মড়লের বাড়ির দিকে ছুটে গেলো অন্ধকারে ।

কায়েলের বাদ্ধক‍্য লম্বাটে শরীর নিয়ে দাঁড়িয়েছিল একটা তাল গাছের তলে । অপেক্ষা করছিলো আমির আলীর জন্য । তার গড়নে মোড়ানো ছিলো একটা কৃষ্ণ কালো মোটা গাদলা । রাস্তার ধারে গরু গাড়ি দাঁড় করানো অবস্থায় গরু দুটি নিথর ছিলো । মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করছিলো খুলছিলো । কায়েলের উদ্দেশ্য তাকে দেখে কেউ প্রশ্ন করলেই সে আস্থাভাজন উত্তর দিতে পারবে এমন গন্তব্য নির্বাচন করেই দাঁড়িয়ে ছিলো । কিন্তু অপেক্ষা মানে যে বিড়ম্বনা ? অস্থির হয়ে উঠে মন এটা টের পেলো । কিছুতেই যাপিত করা যাচ্ছিলো না অপেক্ষার সময় । কায়েল ভাবছিলো ধরা টরা পড়লোনাতো আবার পিতার কাছে ? কায়েলকে দূর থেকে ভুতের মতো দেখালো । গরু গাড়িটাকে ধুয়ে দিচ্ছিলো কুয়াশা । গরু দু’টো প্রভুর কথা মতো দাঁড়িয়ে ছিলো নিশ্চল নিথর । সামান্য অদূরে ভালোমতো দেখা গেলো । কায়েলের অধীর আগ্রহের গভীর প্রতীক্ষা রত অবিচলিত দেহ মুখমন্ডল । ওর চোখ দুটো পিটপিট করছিলো । তার গরু দুটোর মতো নিশ্চল নিরব মনে হলো । একটা শৃগাল তার অদূর দিয়ে ছুটে গেলো । এই সময় সে শুধু মাথাটা ঘুরিয়ে দেখলো শৃগালটাকে । মুহুর্তের মধ্যে নিখোঁজ হয়ে গেলো শৃগালটা । মাথা স্বাভাবিক করলো তার মধ্যেই ঘুরিয়ে নিয়ে ।

আমির আলী হাঁটছিলো মেয়েটির আগে আগে । এতোদিনে এই গ্রামের কোনাকাষ্ণি সে সব চিনে ফেলেছে । সে পথ চিনে চলতে হুপ্লেস না । সাহসের সঙ্গে শীনা ফুলিয়ে হাঁটছে । মড়লের গোলা ঘরের কাছ থেকে মানুষের কোলাহল শুনতে পাচ্ছে । আকাশে আতসবাজি ফাটতে দেখা গেলো । পিচকিরির মতো আকাশে গিয়ে ফাটছে । আমির আলী ঘার ঘুরিয়ে একবার পিছনে ফিরলো । একটা বিড়ি ধরালো ঠান্ডা মাথায় । মুখ ভর্তি বিড়ির ধুয়া ছেড়ে মেয়েটিকে হাতের ইসারা করে ডেকে নিলো । সে দাঁড়িয়ে থমকে গেছিলো । তার কথায় হাঁটতে লাগলো আবারও । দুজনকে দেখা গেলো একটা বাঁক ঘুরতে । এরপর আর দেখা গেলো না ওদেরকে ।

কনকনে শিতের রাত । কায়েলের টাপর দেয়া গাড়ি । কবরের রাস্তায় তাল গাছগুলোর কাছে দাঁড় করানো ছিলো ওর গাড়িটা । মোটা গাদলা মুড়ি দিয়ে কিশোরী মেয়েটি অসুস্থ রোগীর মতো শুয়ে পড়ল টাপর এর ভিতর । মুখটা একটিবার মাত্র দেখা গেলো শুতে যাবার পূর্বে । কায়েল তড়িঘড়ি করে বলল ,
– তু চালে যা । তুকে না দেখবেক লা তো হামার কাপাল ভালা আছে ।
সিপুর মুখটাকে ফ‍্যাকসা দেখালো । সে কায়েলের চোখে চোখ রেখে শুধু একটাই কথা বলল ,
– সাবধানে যেও কায়েল দা । কায়েল সিপুর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে
গাড়ি চালাতে লাগলো দ্রুত । কবর স্থানের তাল গাছগুলো ভিজছিলো অন্ধকার ঘন কুয়াশায় । হঠাত্‍ চমকে দিয়ে আমির আলী ম‍্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে বিড়ি ধরালো । এতোক্ষণ তাকে দেখা যায়নি । ও মুখ ভর্তি ধুয়া ছাড়লো । সিপু এই প্রথম নিরবে আমির আলীর হাত থেকে বিড়ি কেড়ে মাটিতে পায়ের জুতার সাহায্যে দলে দিলো । খুব সহজে নিভলোনা বিড়ির আগুন । অন্ধকারে পায়ের জুতার নিচে বিড়ির আগুনটাকে নিভতে দেখা গেলো শেষ পর্যন্ত । দলে কচলে দিলো জুতার তলা দিয়ে ।

পরাণ তাঁর ঘরে ফিরে এসে ভাবছিলো মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিয়ে । দূর্গম রাত্রিতে তাদের ভাগ্য নিয়ে ভীষণ চিন্তিত সে । হঠাত্‍ মনে পড়লো সিপুর নোটিশ দেয়া কথা । চার্জার বেটারীর মেয়াদ অন্তিম পর্যায়ে । প্রয়োজনীয় কিছু পোষ্টটিং আজ রাত্রিতেই পোষ্ট করবে ? তমাল ও সবুজের উপর ভিত্তি করে স্কুলের ব‍্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া সিদ্ধান্ত গুলো এখন থেকে কিছু কিছু বাস্তবায়ন করতে হবে ? বিরুদের দল নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে ওদের সঙ্গে সহমতে । সাজানো গুছানো পরিকল্পনা । ভুল না হবার সম্ভাবনা খুব বেশি । স্কুল মাস্টারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত চালু করতে । বাইরে থেকে প্রফেশনাল ট্রেনার এসে ট্রেনিং দিবে রহণপুরের স্কুলগুলোতে । সরকারের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা বিমুখ হতেই এই ব্যবস্থা গ্রহণ খুব জোরেশোরেই কোমড় বেঁধে নেয়া হচ্ছে । মাস্টারদের প্রতিনিয়ত আপডেট করবে । এমন শিক্ষানীতি মেনে প্রত‍্যেকটি স্কুল প্রতিষ্ঠান বিশ্বস্ত হলে ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করলে আশা করা যায় জাতির কোনো আর থাকবেনা দূর্ভাগ্য ও দুর্ভোগ এবং তার সঙ্গে ওয়েব সাইট ও ডাটাবেজ সফটওয়্যার থাকবে তাঁদের একান্ত নিজস্ব ভাবে । যার সাহায্যে স্কুল ও অভিভাবক এবং পরিচালনা পর্ষদ সহ শিক্ষক , ছাত্র – ছাত্রীর সঙ্গে সুনিবীড় সম্পর্ক গড়ে উঠবে প্রতিনিয়ত । এমন নির্ভরযোগ্য নির্ভাবনার সহায়তা কেনো গ্রহণ করবেনা ? প্রশ্নই উঠেনা ! এর চেয়ে উত্তম কি ? ভাবছিলো পরাণ । ভাবছিলো অনেককিছুই । পরাণের রুমটা খুব সাধারণ । ভিতর মুখে একটা মাত্র জানালা । দৈর্ঘ্যে বড় হলেও ঘরটা প্রস্থে ছোট । গরমের দিন হলে সিদ্ধ হয়ে যেতো ওরা । ঠান্ডার দিন বলে এক প্রকার বেঁচে গেছে । একটি বাঁশের ঘুড়ি ওড়ানোর নাটাই দেয়ালে ঝুলানো ছিলো । দুই প্রান্তে দুটি চকি । একটিতে আমির আলী একটিতে পরাণ । পরাণ ভাবতে ভাবতে চকিতে গিয়ে বসলো ।
মড়ল সেই কিশোরীকে সাজিয়ে গুছিয়ে প্রদর্শন করবে আজকে । সেই জন্য সে তার ঘরে প্রবেশ করলো । তাকে না পেয়ে সে অন‍্যান‍্য ঘরে খুঁজে দেখলো নিজে নিজে । শেষে পরাণের ঘরে প্রবেশ করলো । পরাণ ততক্ষণে আমির আলীদের নিরাপদে স্থান্তর করে ফেলেছে ভেবে একটু প্রশান্তিতে ছিলো । পরাণের গাড়ি রহণপুর যাত্রা অভিমুখে রওনা হয়েগেছে এতোক্ষণে । সিপু জানিয়েছে সেই শুভ সংবাদ খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে । ওর সংবাদ পাওয়ার পর মড়ল ঢুকলো । খুব স্বাভাবিক মনে হলো মড়লকে । তার পরও একটু মলিন দেখতে লাগলো । ও শুধু বলল ,
– কায়েল যাবেক আইজ ।
– আমার চিঠি দিলে । মুনি অবশ্যই আসবে । না করবেনা আমার বিশ্বাস !
– তুর ভরসাই ডাক্তার ।
– আপনি চিন্তা করবেননা । আমার পক্ষে সম্ভব হলে মুনিকে লাগতোনা । এখন ওর উপর আমিও কিছুটা ভরসা করছি । সব কিছুইতো উপর ওয়ালার । তবে হতাশ হবেন না ?
এই মুহুর্তে গত দিনের সার্চিং এর মেয়ে দুজন এলো । ওদের মধ্যে ঢুকে একজন বলল ,
– পিতা তুকে ডাকে গাল্ডেনরা বাহিরে ।
– দো চালামে ইন্দো বোন চালা ।
কথার কিছু বুঝলো না পরাণ । তবে মড়লযে রেগে আছে বুঝা গেলো । মড়লের কথার পর ওরা তত্‍ক্ষনাত্‍ ফিরে গেলো । মড়ল মুহুর্তের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে গেলো । মুক্ত হস্ত বারিয়ে
দিয়ে বলল ,
– দ‍্যাখ ডাক্তার ।
পরাণ দেখলো দিয়ে বলল ,
– কি এগলো ?
– চিনবিকনা ক‍্যানে । পপি গাঁজার লা বীজবি আছে । তু দ‍্যাখলে ডাক্তার ? ক‍্যামন আছে এ সাব কিছু । ঠিক ঠাক না লাকবেক তো বুল ফের । মান্ত্রিকে চালান দিয়ে দিবেক হামি ।
– আমি শুধু বলবো । এ সবকিছু আপনি একটু অবশ্যই অভিগ্যদের পরামর্শ নিয়ে করবেন । ওদের পরামর্শ ছাড়া এসব চাষাবাদ করা কখনোই ঠিক হবেনা আপনার । এরপর এখন আপনি যা ভালো মনে করেন । ফাঁকা অনেক অনাবাদি জমি পরে আছে আপনার ।
– মান্ত্রী আর হামার লা আছে ।
– এতো জমি ! সব ?
– কি বালছিস তুরে । তুর না দিমাক ঠিক আছে ডাক্তার ?
– আমি একটু বুঝতে ভুলই করছি হয়তো । আপনি বুঝিয়ে দিলে আমি ঠিক বুঝে নিবো ।
– তু না ভুল বালছিস লা । চাল । না ছাড়বেক তুকে । চাল ডাক্তার হামার লা । বাইরের চিত্‍কার চেচামেচি শুনা গেলো । বাইরে সকলের মধ্যে থেকে সতোশফুর্ত আনন্দ ফুর্তি প্রকাশ পাচ্ছিলো ভীষণরকম । পরাণকে সঙ্গে নিয়ে মড়ল ভিতরে যাচ্ছিলো এমন সময় সেই দুজন মেয়ে প্রবেশ করলো পূনরায় ভিতরে । প্রবেশের পর এক জন বলল ,
– তুকে ডাকে পিতা ।
– না যাবেক হামি আখুন । হাত ধরে ভিতরে চলে গেলো পরাণকে নিয়ে । কে ডাকলো কেনো ডাকলো তার ভ্রুক্ষেপ করলোনা মড়ল । ওরা দুজনই দাঁড়িয়ে দেখলো ডাক্তার ও মড়লকে । মড়লের হাত থেকে পড়ে যাওয়া পোরোট স্বর্ণ হার একজন মাটি থেকে কুড়িয়ে গলায় লাগিয়ে দেখলো কেমন লাগে ওকে । পরক্ষণেই গলা থেকে নামিয়ে চোখের সামনে ধরলো । মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে দুজনই দেখলো বিস্মিত হয়ে ।

বাইরে চাঞ্চল্যকর পরিবেশে দীর্ঘ সময় যারা ছিলো তাদের মধ্যে অনেকেই এখন একটা নিয়মকানুন এর মধ্যে ফিরে এলো । হারমোনিয়াম , খোল ; নাল , তবলা ও ঢোল একত্রে বেজে উঠলো । ঝড় বৃষ্টি থামবার মতো একটা হঠাত্‍ কিছু মনে হলো । মধ্যের ভূখন্ড ফাঁকা রেখে গোল করে ঘিরে ধরলো । কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলো সেখানে । সুন্দর পরিবেশে সাজানো ছিলো টেবিল চেয়ার এক প্রান্তে । মড়ল চাল মুখের মধ্যে ছুঁড়ে দিতে দিতে ঢুকলো । মড়লের সঙ্গে সিপু , আমির আলী ও পরাণ সহ সঙ্গে এসে বসলো ফাঁকা চেয়ারে । আমির আলী তাঁদের সকলের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকলো । মাদল তালে বেজে উঠলো ঢোল ও খোলের শব্দ । হারমোনিয়ামে সুর তুলে ওদের সম কন্ঠে গান গাইতে লাগলো তালে তালে কিছু সংখ্যক কিশোরী এবং হঠাত্‍ করে এক ঝাক কিশোরী এসে নিত‍্য করতে লাগলো । মুহুর্তের মধ্যে পরিবেশ বদলে গেলো সেখানকার । জমে উঠলো চারিদিক । সবার মধ্যে যে কৌতুহল ছিলো থেমে গেলো । সবচেয়ে মজার বিষয় যেটি মড়লের সামনে বেশ কজন বদ্ধ মাতাল বেসামহাল টোল খাচ্ছিলো । মড়ল তাদের বিরুদ্ধে তেমন বারণ নিষেধ বা কোনো কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করলোনা । চুপচাপ দেখলো । দেখে থেকে উপভোগ করলো তৃপ্ত হয়ে । বিষয়টি পরাণকে অত‍্যন্ত ভাবিয়ে তুললো । মড়লের আচরণে পরিবর্তন বিন্দু মাত্র ছিলোনা এও সত‍্য এবং কিশোরী মেয়েটির জন্যও এতোটুকু বিচলিত লক্ষ করা গেলো না তাকে । এতকিছুর পর এই অবিচলিত মানুষটিকে দেখে পরাণ আজকে একটু আশ্চর্যই হলো বলা যাই । প‍্যাপারটি পরাণকে বারবার ভাবিয়ে তুলছে এ মুহূর্তে । ভাবিয়ে তুলবার আরও কারণ রয়েছে । মড়লের অনুগত গোল্ডেনের উগ্রজাতীয়তাবাদের দল বলরা নিখাদ সত‍্য । তাঁরা আজ শান্ত সুবোধ বালকের মতো চুপচাপ অনুষ্ঠানটি সত‍্যই উপভোগ করতে থাকলো । তাদের মধ্যেও বিশেষ তেমন পরিবর্তন দেখা গেলোনা । লাঠিয়ালদের দেখা গেলো নিরব শান্ত নিশ্চল নদীর মতো স্থির মাটিতে বসে আছে । আজকে বরং সাধারণরাই একটু টালমাটাল অবস্থায় মাতলামী করছে দেখা গেলো । দু একজন বেপরোয়া হয়ে মাটিতে পড়ে লটিয়ে গড়াগড়ি খেলো তারপরও মড়লের প্রতিক্রিয়া নেই । সিপু গম্ভীর হ‍য়েছিলো । মনে-মনে অনুতাপে জ্বলে পুড়ে মরছিলো একাএকা ।
সিপু ভাবছিলো পরাণের কৌশলী ও মেধাস্বত্ব বীরত্বের সাহস , প্রেম ও গভীর ভালোবাসার প্রকাশ কতোটা প্রকট ও দৃঢ় । এই দিনটি সৃষ্টিকর্তা হয়তো মেয়েটার জন্যই নির্ধারিত করে রেখেছিলো । এইরকম আরো কিছু বিশেষ দিনে মরণপুরের মাঠে মড়লের পাহারাদাররা পাহারা না দিয়ে মরণপুরের উত্‍সবে এইভাবেই অংশগ্রহণ করে থাকে । মড়লের অনুমতি ও নির্দেশক্রমেই ওরা মরণপুরের উত্‍সবে যোগদান করেছে এই তথ্যগুলি পেয়ে দিনের মতো পরিস্কার হয়ে গেলো । সত‍্যি দারুণ বর্ণিল বর্ণাঢ্য নবান্নের এই পিঠা উ‍ত্‍সব । সুন্দর ছন্দময় নিত্য পরিবেশন হচ্ছিলো সিপুর সেদিকে মনোযোগ ছিলো না । তাঁর চোখের সামনে বারবার ভাসছিলো পরাণের মুখটা । তাঁকে ছেড়ে চলে যাবার সময় যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে গেছিলো সেটার কথা ভেবে তাপে অনুতাপে দুঃখে কষ্টে ভিতর ভিতর গভীর অনুশোচনায় জাগ্রত হচ্ছিলো কতো কি মনে । ভিতরে কষ্ট হচ্ছিলো ভীষণ । এর মধ্যে আমির আলীকে লক্ষ করলো সিপু । দেখলো পিছনে সে নেই । নেই মানে বিড়ি ফুকতে গেছে । পরাণকে দেখলো উদাসীন দেখে আছে । মড়ল থেমে থেমে চাল চিবাচ্ছিলো । গানের শেষার্ধে মড়লের নাম ধরে একজন গালি গালাজ শুরু করলো অকথ্য বর্ণহীন ভাষায় । যা মুখে আসছে বলে যাচ্ছে । মড়ল নির্বিকার – মড়লের বাহিনীও নির্বিকার । আশ্চর্য ও আজ বরং উল্টো কিছু বলল ,
– তুরা না কান দিবিক উদিক । না বালবিক কুছু উকে ? ঠিক না আছে মাথা উর । উ পাগাল আছে । পাগাল
পাগাল ।
– তু পিয়ারীকে না লিবেক পিতা । পিয়ারী হামার জান আছে পিতা । ছোড়ে দে । ছোড়ে দে হামার পিয়ারীকে । না ছোড়বিকতো – তুর বাহুক লিবেক হামি ।
তুর বাহুকে না ছাড়বেক হামি । তুর বাহুকে লিয়ে মাস্তি কারবেক হামি । মারাণপুরে সাভায়কে লিয়ে তুর বাহুক হামি মাস্তি কারবেকরে ? তুর বাহুর ইজ্জত না ছাড়বেক হামি । শালা শুয়োরকা বাচ্চা । তু যা কারেছিস । তুর বাহুকে লিয়ে হামি না কারবেক তো হামার নাম বুন্দা না আছে । তুর গুষ্টির পিন্ডিক না কারবেক তো হামার নাম বুন্দা না আছে । তুকে পিতা না বালবেক হামি । তু পিতা না আছিস তু আছিস সাইতানকা বাপ । তুর গুস্টির গাতরে মুতা দিবেক হামি । হামার নাম বুন্দা আছে – পিয়ারীকে ছোড়ে দে । পিয়ারীকে ছোড়ে দে । তু সুয়ার শালা —
গালি দিতে দিতে এক সময় কান্নাকাটি করে উঠলো বুন্দা । ও মাতাল অবস্থায় গালমন্দ করছিলো । গালমন্দ করতে করতে মড়লের সীমানা ছেড়ে টোলতে টোলতে চলে গেলো । দূরে তার কন্ঠ পাওয়া গেলো । খিস্তি করে গালমন্দ করতে করতে গেলো বুন্দা । মড়ল তখনো নির্বিকার ছিলো । চাল ছুঁড়ে দিচ্ছিলো মুখে । মড়লকে তার বাহিনী ঘিরে ধরলো মুহুর্তে । তার আশেপাশে থেকে অনেকেই তখন চলে যেতে লাগলো । মড়লের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো লাঠিয়ালদের দুজন । সামান্য পরিবর্তন যা লক্ষ করা গেলো । সেটা খুবিই সামান্য । বাক রুদ্ধ হটা – নড়া চলাফেরার মধ্যে দেখা গেলো সবাইকে ।
দলে দলে সড়ে যেতে লাগলো যে যার মতো । বিশেষ করে কিশোরীদের চলে যেতে দেখা গেছে বুন্দার গালমন্দর সময় । এখন দ্রুত পুরুষেরা মিলে জোট বেঁধে চলে যাচ্ছে । মুহুর্তের মধ্যে মড়লের গোলা ঘরের সামনেটা ফাঁকা হয়ে গেলো । মড়ল তার বাহিনীকে বলল ,
– তুরাও চালে যা ।
এক কথায় প্রত্যেকে চলে গেলো । কয়েক জন মিলে হ‍্যাঁচাক কটাকে একত্রে জমা করলো । চারিদিক আলোয় আলোময় হয়েছিলো । মড়লের লাঠিয়ালদের মাথা নুয়ে নত মাথায় চলে যেতে দেখা গেলো । সে মুহুর্তে পরাণকে লক্ষ করলো সিপু । সিপুর প্রতি পরাণের বিন্দু মাত্র আগ্রহ ছিলোনা চোখাচোখি হয়ে কিছু বলে । মড়ল দেখেছিলো তার গোলা ঘরের শেষ সীমানার দিকে । আমির আলী চোরের মতো এলো । পরাণের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো । ওর মুখ দিয়ে ইন্ডিয়ান পাতার বিড়ির গন্ধ পেলো পরাণ । ওর দিকে এমনভাবে লক্ষ করলো তাতেই বুঝা গেলো ভীষণ বিরক্তিকর মনে হয়েছে তাকে । পরক্ষনে হাসি মুখ নিয়ে আমির আলীকে দেখলো । আমির আলী অপদার্থ না । যথার্থ কাজের কাজ করেছে ও আজকে । সিপু নিজের কাছে কেমন যেনো ছোট হয়ে গেলো । পরাণের হঠাত্‍ মনে হলো স্টক রিচার্জিবুল ব্যাটারি গুলো শেষের মধ্যে । আজকের মধ্যে ওয়েব সাইটে গুরুত্ব পূর্ণ অনেক কটা পোষ্ট দিতে হবে । ষোল ডিসেম্বরে রহণপুরে বিরুদের ভুমিকা ছিলো শহীদ মিনার পর্যন্ত তার অবদি না । এরপর শহীদদের স্মরণে প্রামান্য চিত্র প্রদর্শন ও আলোচনা সভায় কিছু সামান্য আলোচনা । সেখানেই সেই সুযোগে স্কুলের ব্যাপারে ওরা কিছু কিছু কথা উত্থাপন করেছিলো । যা রহণপুরের মানুষের মুখে মুখে এখন গুঞ্জন সে বিষয়কে ঘিরে । মনে করছিলো রহণপুরের স্কুল প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাল-মন্দ সম্পর্কে একটু আগেও ভেবে ঠিক করছিলো । কি কি গুরুত্বপূর্ণ লিখা ছিলো ? মনে পড়লো । শুধু পোষ্ট দিলেই হবে ? আজকের মধ্যেই সেই নির্দেশনা গুলো তমালদের জানানো প্রয়োজন । এই কারণে মড়লের কাছে বিদায় নিয়ে দ্রুত ভিতরে চলে গেলো । যাবার সময় সিপু কিংবা আমির আলীকে না লক্ষ করেই চলে গেলো । আমির আলী ও সিপু চোখা চোখী হলো মাত্র । মড়লের কাছে সিপুও বিদায় নিয়ে চলে গেলো । আমির আলী বিড়ি ফুকতে আড়াল খুঁজছিলো । চোরের মতো বোঁ-বোঁ করছিলো সেখানেই । শেষ পর্যন্ত বিড়ি ধরিয়ে সাইড করে বেশ কয়েক দম দিয়ে ভিতরে গেলো । সিপুকে একটিবার লক্ষও করলোনা আমির আলী । সেও নিরবে হাঁটছিলো । এমন সময় মুখে চাল ছুঁড়ে দিয়ে মড়ল সিপুর হাত ধরে টান দিলো । মুখে মিষ্টি প্রেমের হাসি ফুটেছিলো ।
– তু কায়েলের বাহুকে না ছাড়বিক আইজ । নবান্নের আনান্দে হামি তুর লিগে ছাড়বেক উকে । যা চালে যা । খাব সুন্দর কালাবাতি রাণী । উকে লিয়ে ঘুমা তু । না ছাড়বিক আইজ উকে । যা চালে যা —
সিপু নিরুত্তর হাঁটছিলো । তাঁর শরীরে জ্বর আসার উপক্রম মনে হলো । এতোক্ষণে তাঁর হুশ ফিরলো । ভিতরের মনশক্তি শুণ্য কোঠায় । কথা কটা শুণবার পর পা চলছিলোনা আর
একটুও । বোবা মুখটাকে কিছুই বলাতে পারলোনা তাঁর মন । নাঃ কিছুই না —-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *